কুয়াশায় বাউন্ডারির একপাশ থেকে আরেক পাশই দেখা যায় না! মাঠের পরে গ্যালারির হাজার হাজার দর্শকের মুখ দেখার তো ‘প্রশ্নই আসে না’। বাংলাদেশের জয় দেখতে আসা দর্শকদের মুখগুলো বলতে গেলে ঢাকা ঘন কুয়াশার চাদরে। বোঝার উপায় নেই, স্টেডিয়াম ভর্তি মানুষ আর মানুষ। ব্যাটে বলে ‘খটাস্’ শব্দ শুনে অনুমান করতে হচ্ছিল রান হলো নাকি আউট হলো! কিন্তু সেই ‘খটাস্’ শব্দটাই যেন ‘বাঘের গর্জন’ হিসেবে ভেসে যাচ্ছিল বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। পাল্লা দিয়ে গর্জন করেছে গোটা গ্যালারিও। মানুষের নয়, যেন সত্যিকারের বাঘের গর্জন ভেসে আসছিল কুয়াশার আড়াল থেকে। কিছুটা নাটকীয়তা, কিছুটা অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে বাঘের গর্জন সার্থক হল। দুই ম্যাচ ধরে প্রতীক্ষার পর অবশেষে খুলনায় শুরু হওয়া স্বপ্নযাত্রার ফল মিললো ঢাকায়। সিরিজ জুড়ে দূরন্ত পারফর্ম করা মাহমুদউল্লাহর আরেকটি অলরাউন্ড পারফরম্যান্স, তরুন মোমিনুলের দোর্দন্ড প্রতাপ এবং সর্বোপরি নাসির হোসেনের দারুন দায়িত্বপূর্ন এক ইনিং বাংলাদেশকে এনে দিল স্বপ্নের সিরিজ জয়। পাঁচ ম্যাচ সিরিজের পঞ্চম ম্যাচে অনেকটা বিপাকে পড়েই ঘুরে দাঁড়িয়ে ২ উইকেটের জয় পেল বাংলাদেশ। ৩-২ ব্যবধানে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ।
অথচ ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২১৮ রানের লক্ষ্যে পৌঁছাতে কয়েকবার ধাক্কা খায় টাইগাররা। শেষ পর্যন্ত ৪৪ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে সাফল্যের মুখ দেখল মুশফিকুর রহিমের দল। এই ম্যাচে নিশ্চিত হওয়া সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচেই আসলে বাংলাদেশ চুড়ান্ত সাফল্যের বীজ বুনে রেখেছিল। খুলনায় সেই দুই বড় জয়ের পর ঢাকায় পর পর দুই হারে একটু ফিকে হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের স্বপ্ন। অবশেষে স্বপ্নকে মিরপুরের মাঠে নামিয়ে আনল বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের শুরুটা অবশ্য একদমই ভালো হয়নি। আগেরদিনের ম্যাচে ২১১ রান তাড়া করতে গিয়ে যেভাবে ধ্বসে পড়েছিল, ঠিক একইভাবে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। ৯ রানে দুই ওপেনার তামিম ইকবাল ও এনামুল হক ফিরে গেলেন; দলীয় ৩০ রানে পড়ল তৃতীয় উইকেট। মনে হচ্ছিল, আরেকটি হতাশা উপহার দিতে চলেছে মিরপুর স্টেডিয়াম। চতুর্থ উইকেটে মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকুর রহিম এসে সেই ভয় তো দূর করলেনই; সঙ্গে জয়ের স্বপ্নটা জাগিয়ে তুললেন। দীর্ঘদিন ধরে মাহমুদউল্লাহর অনেক নিচে খেলা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছিল। অবশেষে সমালোচনার জবাবেই যেন পাঁচ নাম্বরে ব্যাট করতে এলেন মাহমুদউল্লাহ। এসে নিজের দূরন্ত ফর্মটা ধরে রেখে আরেকটা ফিফটির দিকে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
মাত্র ৪৫ বলে ৭টি চারে সাজানো ৪৭ রানের ইনিংস খেলে ফেললেন। যেমন খেলছিলেন, তাতে খেলা শেষ করে ফিরলেও অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। কিন্তু নারিনের অফ স্ট্যাম্পের বল একটু পিছিয়ে খেলতে গিয়ে প্লেইড অন হয়ে ফিরলেন।
মাহমুদউল্লাহ ফিফটিবঞ্চিত রইলেন এবং ভেঙে গেল ১২.৪ ওভারে ৭.১৮ গড়ে ওভার প্রতি রান ওঠা রিয়াদ-মুশফিকুরের ৯১ রানের জুটি। দলীয় ১২ রান পরই মুশফিকুরও ফিরে আসায় আবার বিপদে পড়ে যায় বাংলাদেশ। সেখান থেকেই দলকে জয়ের বন্দরে নিয়ে গেলেন নাসির হোসেন। মোমিনুল ও সোহাগ গাজীর সঙ্গে কার্যকর দুই জুটিতে এনে দিলেন জয়। নাসির নিজে ৫২ বলে ৩৯ রানের ইনিংস খেলে অপরাজিত রইলেন।
এর আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের শুরুটা তাদের পুরো সিরিজের মতোই হয়েছিল। মাত্র ১৭ রানের মধ্যে তিন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানকে খুইয়ে বসে ক্যারিবিয়রা। সফরে নবম বারের মতো নিজেকে মেলে ধরতে ব্যর্থ হন ক্রিস গেইল। সফরের শুরুতে তার ঘাতক হয়েছিলেন সোহাগ গাজী। পরে মাশরাফির শিকার হলেন দু’ বার। আর এবার ১৯ বল খেলে ২ রান করে আউট হলেন মাশরাফির বিকল্প হিসেবে মাঠে নামা শফিউলের বলে।
ক্যারিবিয়দের সামনে তখন আরেকটি লজ্জার শঙ্কা। এই শঙ্কা থেকে তাদের টেনে তুলে পাল্টা আক্রমনের পথ দেখাচ্ছিলেন কিরন পোলার্ড ও ডোয়াইন ব্র্যাভো জুটি। এই জুটির প্রতিআক্রমনে ৩ উইকেটেই ১৪৯ রান তুলে ফেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ৪র্থ উইকেটে ২৪.৩ ওভারে ১৩২ রান যোগ করেন পোলার্ড-ব্র্যাভো জুটি।
খুলনায় বসে পোলার্ড বলেছিলেন, তিনি বাংলাদেশী বোলারদের বল খুলনা থেকে ঢাকায় পাঠাতে পারেন। এ কথা বলে নিজেকে হাস্যকর করে তোলা পোলার্ড প্রথম চার ওয়ানডেতে ছক্কাই মারতে পারেননি। কাল মারলেন। একটি নয়, আটটি ছক্কা ও ৫টি চারে সাজানো ৭৪ বলে ৮৫ রানের এক ইনিংস খেলে আউট হয়েছেন। মনে হচ্ছিল, নিজের সেঞ্চুরি তো বটেই; দলকেই বড় সংগ্রহ এনে দিয়ে তারপর যাবেন।
কিন্তু সেটা করতে দিলেন না মোমিনুল হক। হ্যাঁ, ব্যাটসম্যন হিসেবে দলে ঠাঁই পাওয়া মোমিনুল কাল বল হাতে তুলে নিলেন। আর ভয়ানক সব টার্ন নেওয়া বল করলেন। তাতেই ক্যারিবিয়রা পথ হারিয়ে ফেললো। ২ ওভারে মোমিনুল তুলে নিলেন পোলার্ড ও স্যামির উইকেট; ভাঙল জুটি। আরেক প্রান্ত থেকে মাহমুদউল্লাহ এসে শেষ করে দিলেন ধীরগতিতে চলতে থাকা ব্র্যাভোর ৫১ রানের ইনিংস।
ক্যারিবিয়দের বাকী ইনিংসটুকু স্রেফ আসা-যাওয়া আসার গল্প। ৬৮ রানে শেষ ৭ উইকেট হারিয়ে ফেললো ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এর মধ্যে শফিউল ইসলাম নিজের নবম ওভারের শেষ দুই বলে ডেভন থমাস ও কেমার রোচকে আউট করে ৪৮ ওভারে ২১৭ রানে শেষ করে দিলেন ক্যারিবিয়দের ইনিংস।
স্কোরকার্ড:
ওয়েস্ট ইন্ডিজ
পাওয়েল স্টা মুশফিকুর ব সোহাগ গাজী ১১
গেইল ক নাসির ব শফিউল ২
স্যামুয়েলস রানআউট (মাহমুদুল্লা) ১
ব্রাভো ক মোমিনুল হক ব মাহমুদুল্লা ৫১
পোলার্ড ব মোমিনুল হক ৮৫
স্যামি ক জহুরুল ব মোমিনুল ২
থমাস ক মুশফিকুর ব শফিউল ২৫
রাসেল এলবিডব্লিউ ব মাহমুদুল্লা ০
পারমল রান আউট (তামিম/সোহাগ) ১০
নারিন অপরাজিত ৭
রোচ এলবিডব্লিউ ব শফিউল ০
অতি:(লেগবাই ৫, ওয়াইড ১৮) ২৩
মোট: (৪৮ ওভারে অলআউট) ২১৭
উইকেট পতন: ১/১৬ (পাওয়েল,২.৩), ২/১৭ (স্যামুয়েলস, ৫.২), ৩/১৭ (গেইল, ৭.২), ৪/১৪৯ (পোলার্ড, ৩১.৫), ৫/১৫১ (স্যামি,৩৩.১), ৬/১৮৮ (ব্রেভো, ৪০.১), ৭/১৮৮ (রাসেল, ৪০.৫), ৮/২০৪ (পারমল, ৪৪.৬), ৯/২১৭ (থমাস, ৪৭.৪)।
বোলিং বিশ্লেষন: সোহাগ ১০-২-৩২-১, শফিউল ৯-৪-৩১-৩, সানি ৮-০-৫৮-০, রাজ্জাক ৯-১-৩৯-০, মাহমুদুল্লা রিয়াদ ১০-১-৩৮-২, মোমিনুল হক ২-০-১৪-২।
বাংলাদেশ
তামিম ব রোচ ৮
এনামুল ক পোলার্ড ব রোচ ০
জহুরুল ক থমাস ব রোচ ১০
মুশফিক ব নারিন ৪৪
মাহমুদুল্লা ব নারিন ৪৮
নাসির অপরাজিত ৩৯
মোমিনুল হক এলবিডব্লিউ ব নারিন ২৫
সোহাগ গাজী ক থমাস ব রোচ ১৯
রাজ্জাক এলবিডব্লিউ ব রোচ ০
ইলিয়াস সানি অপরাজিত ১
অতি (বাই৩, লেগবাই৪, ওয়াইড ১৮, নোবল২) ২৭
মোট: (৪৩.৬ ওভারে অলআউট) ২২১
উইকেট পতন: ১/৮ (তামিম,২.২), ২/৯ (এনামুল, ২.৬), ৩/৩০ (জহুরুল, ৮.১), ৪/১২১ (মাহমুদুল্লা, ২০.৫), ৫/১৩৩ (মুশফিক, ২৪.১), ৬/১৮৬ (মোমিনুল, ৩৮.১), ৭/২১৪ (সোহাগ, ৪২.৪), ৮/২১৫ (রাজ্জাক, ৪২.৫), ।
বোলিং: রোচ ৯-০-৫৬-৩, স্যামি ৫-১-২৩-০, রাসেল ৯.৬-০-৫১-০, নারিন ১০-১-৩৮-৩, পারমল ৯-০-৩৯-০, স্যামুয়েলস ১-০-৭-০।
ফল: বাংলাদেশ ২ উইকেটে জয়ী
