রাজধানীর ফুটপাত দখল করে পুলিশ নির্মাণ করেছে অবৈধ বুথ। পুলিশ বুথগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যে পথচারীকে রাস্তায় নেমে চলাচল করতে হচ্ছে। এই বুথে আবার অবৈধভাবে লাগানো হয়েছে বিদ্যুত্ সংযোগ। এই বুথ তৈরির অনুমতি সিটি কর্পোরেশন থেকে নেয়া হয়নি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দফতরের অনুমতিতেই দেড় শতাধিক পুলিশ বক্স নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (দক্ষিণ) প্রধান প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম ইত্তেফাককে বলেন, রাজধানী জুড়ে যে পুলিশ বুথ তৈরি করা হয়েছে তার জন্য সিটি কর্পোরেশন থেকে কোন অনুমতি নেয়া হয়নি। বিষয়টি বারবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এরপরই কিছুদিন আগে কয়েকটি বুথ উচ্ছেদ করা হয়। সম্প্রতি সেই বুথগুলো আবার পুনর্নির্মাণ করে নিয়েছে পুলিশ। আইন অনুযায়ী সড়কদ্বীপ বা ফুটপাতে কোন ধরনের নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু পুলিশ এসবের তোয়াক্কা না করে নিজেদের মতই এগুলো নির্মাণ করে নিয়েছে।
বছর তিনেক আগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দফতর থেকে রাজধানীর বিভিন্নস্থানে দেড় শতাধিক পুলিশ বক্স স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয়। তত্কালীন উপ-কমিশনার (সদর) হাবিবুর রহমান এই অনুমোদন দেন। ওই অনুমোদনে অবশ্য এলাকার নাম উল্লেখ থাকলেও বুথ নির্মাণের জন্য নির্দিষ্ট করে জায়গার কথা উল্লেখ ছিল না। তাই সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের উপ-কমিশনাররা বুথগুলো নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে জায়গা নির্দিষ্ট করে দেন। তাদের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ফুটপাতের উপর এই বুথগুলো নির্মাণ করেছেন। আর প্যানাফ্লেক্সের তৈরি বিজ্ঞাপন দিয়ে বুথগুলোর কাঁচ ঢেকে দেয়া হয়েছে। আর এতে করে বাইরে থেকে ভেতরে বা ভেতর থেকে বাইরে কিছুই দেখা যায় না। অভিযোগ রয়েছে, ভেতরে অবৈধ লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি করতেই কাঁচগুলো প্যানাফ্লেক্সের তৈরি বিজ্ঞাপন দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার (সদর দফতরের দায়িত্বপালনকারী) আনোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, জনগণের চলাচল বিঘ্ন সৃষ্টি না করে বুথ নির্মাণের পক্ষে তিনি। তার মতে, রোদ-বৃষ্টিতে রাস্তার মধ্যে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই একটু বিশ্রামের জন্য বুথ থাকলে সেটি দোষের কিছু নয়। বিজ্ঞাপন দিয়ে বুথগুলো ঘিরে রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি ঠিক নয়, বুথগুলো স্বচ্ছ কাঁচ দিয়ে নির্মাণ করা দরকার এবং তাতে কোন বিজ্ঞাপন দেয়া যাবে না। সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান তিনি। আর অবৈধ বিদ্যুত্ সংযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, বিদ্যুত্ বিভাগ থেকে অনুমতি নিয়ে এটি ব্যবহার করার কথা তারা ভাবছেন।
গতকাল সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, শাহবাগে ফুলের দোকানের সামনে, বাংলা মোটর মোড়ে ইস্কাটন রোড ও কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ সংযোগ পয়েন্টে ফুটপাতের ওপর রয়েছে পুলিশ বুথ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক পয়েন্টের সড়কদ্বীপে ও ফুটপাতে ডিএমপি দেড় শতাধিক পুলিশ বুথ স্থাপন করেছে। এদের মধ্যে সার্ক ফোয়ারা মোড়, বাংলা মোটর, টেকনিক্যাল মোড়, শাহবাগ, পান্থপথ, রাসেল স্কোয়ার, আড়ং ক্রসিং, গণভবন ক্রসিং, কাকরাইল তাবলীগ মসজিদ মোড়, নীলক্ষেত, গুলশান-১, গুলশান-২ ও বনানী কাকলী ক্রসিং উল্লেখযোগ্য। অধিকাংশ বুথেই অবৈধ বিদ্যুত্ সংযোগ দিয়ে লাগানো হয়েছে বৈদ্যুতিক পাখা। শ্যামলী সিনেমা হল ভেঙে সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল ভবন। পুরো ফুটপাতটি দখল করে টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। আর তার মধ্যে উঁকি দিচ্ছে একটি পুলিশ বুথ। যদিও সেটি পুলিশ বুথ কি-না তা দেখে বোঝার উপায় নেই। কারণ বুথের কাঁচের উপর প্যানাফ্লেক্সের তৈরি মীর রিয়েল এস্টেটের বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। কোথাও পুলিশ বুথ শব্দটিই লেখা নেই। রাজধানীর অনেক জায়গায় পত্রিকা, সংবাদ সংস্থা বা টিভি চ্যানেলের বিজ্ঞাপনও এসব বুথে শোভা পাচ্ছে। বিভিন্ন বুথের নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিএমপি সদর দফতর থেকে অনুমতি নিয়ে তারা বুথগুলো নির্মাণ করেছেন। শুধু নির্মাণ নয়, বিদ্যুত্ সংযোগ, চেয়ার-টেবিল, ফ্যান সবকিছুই তারা কিনে দিয়েছেন। আর পুলিশ সদস্যদের খেদমত করার জন্য একজন বেয়ারাও রাখতে হয় বুথগুলোতে। একটি বুথ নির্মাণ করতে অন্তত দুই লাখ টাকা খরচ করতে হয়। তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা সেই টাকা তুলছেন। পুলিশের মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ট্রাফিক পুলিশকে অনেক সময় ২৪ ঘন্টা ডিউটি করতে হয়। এতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। অনেক সময় বৃষ্টি ও প্রচণ্ড রোদে ডিউটি করার সময় তারা অসুস্থ হয়ে যান। এ কারণে তাদের সাময়িক একটু প্রশান্তির জন্য পুলিশ বুথগুলো স্থাপন করা হয়েছে।
