বিজয়ের মাস

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৪৯
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে “স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র” নামে এক নতুন অধ্যায় শুরু করেন তত্কালিন পাকিস্তান বেতারের তিনজন পথপ্রদর্শক শব্দসৈনিক বেলাল মোহাম্মদ, আবদুল্লাহ্ আল ফারুক এবং প্রয়াত আবুল কাশেম সন্দীপ। এই বেতার কেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধে অন্ধকারে থাকা দেশের মানুষকে পথ দেখিয়েছে। দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার প্রেরণা ও যুদ্ধে শত্রুর দিকে হাসিমুখে এগিয়ে যাবার দৃপ্ত সাহস। একদিকে সম্মুখ সমরের যুদ্ধ চলছে এদিকে দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি ও সাংবাদিকরা এই স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের যুগিয়েছেন প্রেরণা। সেইসাথে গোটা বিশ্বাসীকে জানিয়েছেন বাংলাদেশের মানুষের প্রতি পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের কথা। জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের অপ্রতিরোধ্য এগিয়ে চলার কথা। ২৬ মার্চ ১৯৭১ সন্ধ্যাবেলায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে ৮৭০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার থেকে এই বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ ও ২৫ শে মার্চ ১৯৭১’এ তার পাঠানো স্বাধীনতার ঘোষণাভিত্তিক তারবার্তার আদলে স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কিত অনুষ্ঠান ২৬ শে মার্চ ১৯৭১ কালুরঘাট থেকে সমপ্রচার করেন এম এ হান্নান, সুলতানুল আলম, বেলাল মোহাম্মদ, আবদুল্লাহ আল ফারুক, আবুল কাশেম সন্দীপ, কবি আবদুস্ সালাম এবং মাহমুদ হাসান। ২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে শব্দসৈনিকদের অনুরোধে পটিয়া থেকে শ’দেড়েক সৈন্য নিয়ে কালুরঘাটে অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেন তত্কালীন মেজর জিয়াউর রহমান এবং তিনি বেলাল মোহাম্মদের তাত্ক্ষণিক প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে সেদিন সন্ধ্যায় জাতীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর ২৮ ও ২৯ মার্চ ১৯৭১ তারিখে সামরিক বাহিনীর প্রহরায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচার চলতে থাকে। ইতিমধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিকদের সংখ্যা দশজনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল যারা প্রচারের শেষ দিনটি পর্যন্ত একসাথে ছিলেন। প্রতিষ্ঠাতা ১০ শব্দ সৈনিক হলেন: বেলাল মোহাম্মদ, আবদুল্লাহ আল ফারুক, আবুল কাশেম সন্দীপ, কাজি হাবিব উদ্দিন মনি, আমিনুর রহমান, রাশেদুল হাসান, সারফুজ্জামান, সৈয়দ আবদুস শাকের এবং রেজাউল করিম চৌধুরী। প্রতিষ্ঠাতা ১০ জনের ৪ জনই আজ আমাদের মাঝে নেই, বাকীদের স্বাস্থ্যগত অবস্থাও ঝুঁকিপূর্ণ। ৩০ মার্চ ১৯৭১ দুপুরে পাকিস্তানের দুটি বিমান কালুরঘাট বেতার ভবন বোমা বর্ষণ করে গুড়িয়ে দেয়। অক্ষত থাকা একটি ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার বিচ্ছিন্ন করে তরুণ শব্দসৈনিকেরা ট্রাকে করে অনেক দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে রামগড় সীমান্তে নিয়ে যান। এরপর দশজনের মধ্যে পাঁচজন ভারতের বাগাফা বেলুনিয়াতে ভারতীয় ট্রান্সমিটার থেকে এবং অপর পাঁচজন রামগড় সীমান্তে ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান প্রচার করেন। অল্প কদিন পরেই পুরো দলটি আগরতলায় এসে অনুষ্ঠান তৈরি শুরু করেন। ২৫ মে ১৯৭১ সালে “স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র” পূর্ণাঙ্গ অবয়বে কার্যক্রম শুরু করে কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ৫৭/৮ নম্বর বাড়ি থেকে। বহু সাংবাদিক, কবি, কথা সাহিত্যিক, সুরকার, সংগীত শিল্পীদের দ্বারা সমৃদ্ধ হয় “স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র”। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সকল কার্যক্রম চলতো অত্যন্ত গোপনীয়তায়। সম্পৃক্ত কয়েকশ বেতারকর্মী এই ভবনে এসে অনুষ্ঠান করতেন। ৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১। এইদিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. হেনরি কিসিঞ্জার তাকে পরামর্শ দিলেন বঙ্গোপসাগরের দিকে সপ্তম নৌবহরকে যাত্রা শুরু করবার জন্য নির্দেশ দিতে। ইয়াহিয়া খান ও তাদের পশ্চিমা মিত্ররা ভেবেছিল এই সপ্তম নৌবহর আসার কথা শুনে যৌথবাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে যাবে। সেই সুযোগে একবারে শেষ লগ্নে চরম আঘাত হেনে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামকে তছনছ করে দেওয়া। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে উল্টোটা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে এই কথা জেনে মুক্তিযোদ্ধারা আরো বিপুল উত্সাহে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। সেদিন বাঙ্গালীর মুক্তিযুদ্ধের আরেক পরীক্ষিত মিত্র, তত্কালীন পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকার সপ্তম নৌবহর পাঠানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায় এবং এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেয়। ফলে সপ্তম নৌবহরের যাত্রা শুরু হওয়ার পরই থেমে যায়। এদিনে, জাতিসংঘের অধিবেশনে প্রতিনিধিত্বকারী পাকিস্তানী দলের নেতা মাহমুদ আলী দেশে ফিরে এসে আজকের দিনে দেখা করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের উচিত বিশ্ব শান্তির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ভারতের পাশ থেকে সরে দাঁড়ানো। চীন ও আমেরিকার সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান তাদের নির্ভীক ও ঐতিহাসিক সমর্থনের জন্য অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।’ মুক্তিযুদ্ধের এই দিনেই মুক্ত হয় কুমিল্লার দাউদকান্দি। আর দাউদকান্দি মুক্ত হওয়ার ভিতর দিয়েই শুরু হয় মেঘনা তীরের অঞ্চলগুলো মুক্তির প্রক্রিয়া। দিন না পার হতেই মেঘনার পুরো পূর্বাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। একই দিনে স্বাধীন দেশের পতাকা ওড়ে গাইবান্ধা, গাজীপুরের শ্রীপুর, ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ ও নেত্রকোনায়। মুক্তিযুদ্ধের এ সময় দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কার্যত বন্ধই ছিল। আজকের দিনের এক সরকারি ঘোষণায় বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভারতীয় হামলার অজুহাতে বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নেওয়া হয় চরম দুরভিসন্ধিমূলক এক সিদ্ধান্ত। দেশের শিক্ষকদের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কাজে নিয়োজিত হতে হবে।