শহীদ বুদ্ধিজীবী

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শ্রদ্ধা ও দায়িত্ব

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৫৫
যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশে বাঙালি জাতিকে যারা অনায়াসে চিন্তা-মেধা-জ্ঞানে শক্তিশালী করে তুলতে পারতেন, তাদের নৃশংস হত্যা জাতির ভিতকেই এলোমেলো করে দিল। ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নির্দিষ্ট তারিখকে পালন করা হলেও এই শোক কেবল একটি দিনে সীমাবদ্ধ নয়। নয় মাস ধরে চলা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সময় বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে, তবে যুদ্ধের শেষপ্রান্তে তালিকাবদ্ধভাবে হত্যার ঘটনাটি চূড়ান্ত বেদনা নিয়ে উপস্থিত হয়। এই বুদ্ধিজীবীগণ ছিলেন লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, গবেষকসহ দেশের সবচেয়ে মেধাবী মানুষ। ’৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হওয়া বুদ্ধিজীবীরা হলেন:আবুল খায়ের, আনোয়ার পাশা, ড. আলীম চৌধুরী, এস.এম. এ. রাশীদুল হাসান, কামিনীকুমার ঘোষ, খন্দকার আবু তালেব, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, জহির রায়হান, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, নিজামুদ্দীন আহমেদ, ড. ফয়জুল মাহি, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, শহীদুল্লা কায়সার, সিরাজুল হক খান, সিরাজুদ্দীন হোসেন, সেলিনা পারভীন, সৈয়দ নাজমুল হক প্রমুখ। পেরিয়ে গেল স্বাধীনতার একচল্লিশটি বছর। কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের হারিয়ে বাংলাদেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, জাতি আজও তার যাতনা থেকে মুক্ত হতে পারেনি; যেন অনেকগুলো প্রদীপ হঠাত্ নিভে গেছে, আর চারদিকে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। এ আঁধারে জাতি যেমন দিশেহারা হয়েছে, তেমনি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারে নেমে এসেছে বেদনাকাতর ছায়া। সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের পৌত্রী সনকা রেজা ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে তার চামেলীবাগের বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্যরা। এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় তিনি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ সময় তিনি দুঃসাহসিক সম্পাদকীয় লেখেন, মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করেন এবং মুজিবনগর সরকারের কাছে নিয়মিত এদেশের সংবাদ সংগ্রহ করে পাঠান। তার পৌত্রী সনকা রেজা বলেন, পিতামহের জন্য খুবই গর্ববোধ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সনকা পরিবারের কাছ থেকেই পিতামহের সম্পর্কে জানেন। তার ভেতরেও দায়বদ্ধতা তৈরি হয়, যাতে জাতি ও রাষ্ট্রের প্রতি তিনিও যথাযথ কর্তব্য পালন করতে পারেন। অধ্যাপক রাশীদুল হাসানের দৌহিত্রী অর্চি হাসান ’৭১-এর অন্যতম শহীদ বুদ্ধিজীবী এস. এম. এ. রাশীদুল হাসান। ১৪ ডিসেম্বর আনোয়ার পাশা এবং তাকে একসাথে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশ স্বাধীন হবার পর বধ্যভূমিতে তাদের লাশ পাওয়া যায়। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তার দৌহিত্রী অর্চি হাসান বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি বলেন, মাতামহের জন্য একদিকে যেমন গর্ববোধ করেন, তেমনি জাতি যে এমন মহান একজন মানুষকে হারিয়েছে, সে বেদনা তাকে তাড়িত করে। নিজের কর্ম দিয়ে মাতামহের জীবনের অসমাপ্ত কর্তব্য সম্পাদন করতে চান তিনি। তিনি চান, অন্তত তার মাতামহীর জীবিতাবস্থায় যেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়। অর্চি হাসান বলেন, প্রতিটি বাবা-মা যেন তাদের সন্তানকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দান করেন, যাতে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম দেশকে ভালোবেসে সঠিক কর্তব্যের দিকে ধাবিত হন। শুধু অর্চি হাসান নন, আমাদের প্রত্যেকেরই কাম্য, বহু মানুষের আত্মত্যাগে অর্জিত এ বাংলার সুনাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুক। শহীদ বুদ্ধিজীবী তথা মুক্তিযুদ্ধে বলিদানকৃত ব্যক্তিবর্গের সম্মান আমরা যেন সবসময় অক্ষুণ্ন রাখতে পারি।