১৯৯৯ সাল, ঈদের দিন সকাল! সকালের মিষ্টি রোদ পড়েছে সমুদ্র সৈকতে, ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে পায়ের উপর। নতুন জীবন শুরু করেছি কেবল! মনের ভেতর আছড়ে পড়া স্বপ্নের উচ্ছ্বাস বুকের মধ্যে পাথর হয়ে আছে। মা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, নিজেকে ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে প্রকাশ করেছেন। ...মায়ের জীবনের দুঃসহ স্মৃতির কথা অজানা ছিল না মোটেই। কারণ মা ছিলেন সবসময় অকপট, সহজ প্রকৃতি কন্যা! সত্যকে সুন্দরভাবে দেখাটাই তার জীবন-দর্শন। সত্যি কথা বলতে, বিষয়টি সেদিন আমি সহজভাবে নিতে পারিনি। কারণ আমি আমার শ্বশুরবাড়ি যেতে পারিনি! স্বাধীনতার কয়েক বছর পরে আমার জন্ম হলেও কতিপয় আত্মীয় আমাকে ‘যুদ্ধশিশু’ হিসেবে আঙুল তুলেছেন, শুনতে হয়েছে অজস্র নিষ্ঠুর মন্তব্য। অন্যদিকে নতুন সংসার! কোনকিছুই সমন্বয় করতে পারছিলাম না। দিনের পর দিন নিজের ভেতর গুটিয়ে থাকি! মায়ের ওপর একটু অভিমান ছিল, একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হবার পরও কিইবা প্রয়োজন ছিল এসবের। কিন্তু পরবর্তীতে আমি আমার স্বার্থপর চিন্তার মূর্খতা থেকে নিজেকে মুক্তি দেই। কারণ আমি শুধু আমার কথা, আমার শ্বশুরবাড়ি, পারিপার্শ্বিকতার কথাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলাম। একজন মানুষ হিসেবে মায়ের স্বাধীন সত্তার কথা ভাবিনি। একজন নারী হিসেবে যে কোন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আমার জীবনেও এমন হতে পারত! আমাকে গর্ভধারণ ছাড়াও মা একজন মানুষ, একজন নারী, একজন স্বাধীন সত্তার ভাস্কর। তার জীবনের সংগ্রাম, তার জীবনের অস্তিত্বের লড়াই, ৭১-এর দুঃসহ স্মৃতি, অতঃপর তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা— সবটুকুই তার। আমার জন্য, আমার শ্বশুরবাড়ির জন্য কেন তিনি তার নিজস্বতা হারাবেন? এতেই কি প্রমাণ হবে তিনি আমাদের কতটা ভালোবাসেন? নিজের অজান্তে মাকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। কষ্ট দিয়ে ফেলেছি আড়াই লক্ষ ‘মা’দেরও! মূর্খের মতন, স্বার্থপরের মতন শুধু নিজের কথাই ভেবেছি।
যতদিন গেছে নিজের ভেতর ‘নারী’র পূর্ণতা, মানুষের পূর্ণতা যত এসেছে ততই মাকে উপলব্ধি করেছি, করতে পেরেছি। নিজের মনে নিজেকেই বলেছি, ‘ক্ষমো হে মম দীনতা’! সারা পৃথিবীতে যুদ্ধ প্রক্রিয়ায় নারীর প্রতি সহিংসতা ঘটে আছে! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এর বর্বরচিত রূপ ছিল ইতিহাসের সবচাইতে কলঙ্কিত অধ্যায়। মনে পড়ে, মা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী বলতেন, ‘সত্য সে কঠিন, তবুও সত্যেরে ভালোবাসিলাম’। রবীন্দ্রনাথের গানে মা খুঁজেছেন জীবনের অমিত অন্বেষণ! আমি আমার জীবনে, কর্মজীবনে মায়ের নামটি ব্যবহার করতে খুবই দ্বিধান্বিত বোধ করি। ৩০ লাখ শহীদের সাথে নিপীড়িত হয় আড়াই লক্ষাধিক নারীর মূল্যবান জীবন, সম্মান, আত্মত্যাগ! জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এই নারীদের অত্যন্ত স্নেহের সুরেই, সম্মানের সাথেই ‘বীরাঙ্গনা’ বলে ডেকেছেন। বিজয়ের এই পরম মাসে সেই সমস্ত বীরাঙ্গনা মায়েদের, ‘স্যালুট’ জানাই।
