একটা সময় ছিল, যখন ছয়-সাত বছর বয়সের আগে সন্তানের স্কুলে যাবার কথা কোনো অভিভাবক চিন্তাও করতেন না। ছয় বছর বয়স হলে শিশু প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হবে, এটাই ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু দিনে দিনে অন্য অনেক কিছুর মতো শিক্ষা ব্যবস্থা যেমন পাল্টেছে, তেমনি বিস্তৃত হয়েছে মানুষের চিন্তাজগত্। বেড়েছে শিক্ষিতের এবং শিক্ষার হার। সন্তানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের প্রারম্ভটা আর বাবা-মায়ের কাছে নেহায়েত কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়। বিশেষ করে সন্তানের মায়েরা রীতিমতো উদ্বিগ্ন থাকেন শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক হাতেখড়ি নিয়ে। শুধু তাই নয়, এর সাথে যুক্ত হয় ভালো প্রতিষ্ঠানে শিশুর ভর্তি নিয়ে প্রতিযোগিতা।
সন্তানের মঙ্গলার্থে বাবা-মা যথাসম্ভব অল্প বয়স থেকেই তার শিক্ষাপ্রক্রিয়া শুরু করতে চান। উপরন্তু নামকরা বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন বাড়তি লেখাপড়ার প্রতি। বেশিরভাগ পরিবারেই শিশুকে বিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তুতকরণের এই দায়িত্বটি মায়ের উপরে বর্তায়। প্রায় ক্ষেত্রেই মা এবং সন্তান, যুগল শিক্ষার্থী হয়ে ওঠেন। দেখা যায়, লেখাপড়ার চাপটা সন্তানের জন্য যতখানি, মায়ের জন্য তার চেয়ে একবিন্দু কম নয়। এতে একদিকে যেমন মায়ের মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুর সহজাত বেড়ে ওঠা।
বিশেষজ্ঞগণ বলেন, শিশুর ভাষাজ্ঞান লাভের পর থেকে পরবর্তী কয়েক বছর পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগিক ও সামাজিক বিকাশ ব্যাপকভাবে ঘটে থাকে। এ সময়ে শিশুর উপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তার এই স্বাভাবিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিপুল পরিমাণ বইয়ের ভার শিশুর কাছে বোঝার মতো হয়ে দাঁড়ায়। ফলশ্রুতিতে লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে তারা। কখনো কখনো তাদের মনে জন্ম নেয় বিদ্যালয়ভীতি।
শিশুকে প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিলে আহত হয় তার সরল সত্তা; স্বত:স্ফূর্ত জ্ঞানার্জনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে সে হয়ে পড়ে যন্ত্রমানবের মতো। শিশু হারায় তার সৃজনশীলতা, যা একদিন সমগ্র জাতির জন্যই দুর্ভোগ বয়ে আনবে। আজকের শিশু প্রজন্ম, তথা আগামীর জাতিকে দুর্দশার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য পরিবার এবং সমাজের প্রতিটি মানুষেরই বিশেষভাবে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
