সাউদার্ন মেথোডিস্ট ইউনিভার্সিটি সমাবর্তন ২০১২

কন্ডোলিত্সা রাইস

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:০৩
আমি ধন্যবাদ জানাই আমাকে আজকের এই উদযাপনে সঙ্গী করার জন্য। আজকের দিনটি আমাকে আমার সমাবর্তনের দিনটির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ে উদযাপিত সেই দিনটির পর কত বছর কেটে গেছে তবু ঐদিনটি পুরোপুরি মনে গেঁথে আছে আমার। আমার মনে আছে বাবা-মা কত গর্বিত ছিলেন, মনে আছে কতটা কাছাকাছি ছিলাম সহপাঠী ও বন্ধুদের। আমার মনে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ এই লক্ষ্যটি অর্জনের উত্তেজনার কথা। সেদিনের সমাবর্তন বক্তার বক্তব্যের কিছুই আমার মনে নেই, তাই আমিও কিছু মনে করব না যদি তোমরা আমার বক্তব্য এক সময় ভুলে যাও! কারণ আজকের দিনে একটুখানি অস্থির, একটুখানি গর্বিত হওয়াকে ক্ষমা করে দেয়া যায়। আশা করছি, আজকের এই অর্জন তোমাদের জীবনের শেষ অর্জন হয়ে রইবে না। তোমরা আমার বক্তব্যের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান কিছু স্মৃতি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়ে বের হবে। তবে এই প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া জিনিসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে এখান থেকে পাওয়া শিক্ষা। তোমরা দেখেছ, শিক্ষা আক্ষরিক অর্থেই জীবনকে পরিবর্তন করে দেয়। এজন্যই মানুষ এত কষ্ট করে শিক্ষিত হবার জন্য। আর একারণেই এটা মানুষের সকল সম্ভাবনার চাবিকাঠি হয়েছে আজীবন, হয়েছে এমন একটা শক্তি যা জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতির ভেদাভেদ মুছে দিয়ে প্রত্যেকটি মানুষের সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করে। আমি আমার নিজের জীবনে জেনেছি শিক্ষার জীবন বদলে দেবার ক্ষমতাকে। আমার দাদু জন ওইজলি রাইস সিনিয়র একজন বর্গাচাষীর সন্তান ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন শিক্ষা তাকে এমন একজন মানুষে পরিণত করবে যা শিক্ষা ছাড়া কল্পনাতীত ছিল। তিনি জানতেন এই শিক্ষা ভবিষ্যত্ প্রজন্মকেও সমৃদ্ধ করবে এবং তার চিন্তা ভুল ছিল না। তিনি যে ধারা শুরু করে গিয়েছিলেন সেই ধারা অনুসারে পরের প্রজন্মগুলো শিক্ষার আলোয় বদলে যাওয়া জীবনে বাঁচার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার দাদু এবং তার পূর্বপুরুষেরা, যারা দারিদ্র্য ও বিচ্ছিন্নতার মাঝে বড় হয়েছিলেন তাদের জীবনধারা আমূল বদলে দিয়েছিল এই শিক্ষা। আমার দাদু বুঝেছিলেন শিক্ষা অধিকার নয়, এটি একটি সুবিধা। এবং আমি তোমাদের বলতে চাই, যে শিক্ষার সুবিধা তোমরা পেয়েছ তার সাথে তোমাদের উপর বর্তেছে কিছু দায়িত্ব এবং কর্তব্য। তোমাদের প্রথম দায় হল নিজেদের কাছে, আর তা হল নিজের স্বপ্নকে খুঁজে বের করা ও তাকে অনুসরণ করা। আমি তোমাদের গত্বাধা কর্মক্ষেত্রের কথা বলছি না, এমন কিছুর কথা বলছি যেটা তোমার কাছে একান্তই অনন্য এক তাড়না বলে মনে হয়। একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে তোমার সুযোগ রয়েছে এমন কিছু একটা করে জীবন কাটানো যা তুমি ভালবাসো। তুমি যদি তোমার অন্তরের তাড়নাকে খুঁজতে থাকো তাহলে তুমি তাকে খুঁজে না পেলেও সেটি তোমাকে ঠিকই খুঁজে নেবে। আমি কলেজ শুরু করেছিলাম সঙ্গীতকে মূল বিষয় হিসেবে নিয়ে, এরপর একে একে তা বদলে হয়েছে ইংরেজি সাহিত্য, স্থানীয় ও রাষ্ট্রীয় সরকার ইত্যাদি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়টি পড়তে গিয়ে সোভিয়েত বিশেষজ্ঞ শিক্ষক জোসেফ করবেলের একটি ক্লাস করেই অভিভূত হই আমি, বুঝতে পারি এটিই আমার আগ্রহের বিষয়- আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি। নিজের অন্তরের এই তাড়নাকে খুঁজে বের করা তোমার প্রথম দায়িত্ব। আর একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে তোমার দ্বিতীয় দায়িত্ব হচ্ছে যৌক্তিকতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা। এখানে তোমাদের শেখানো হয়েছে যৌক্তিকতার চর্চা কিভাবে করতে হয়, সেটাই নিজের জীবনে প্রতিফলিত করবে। যৌক্তিকতার জীবন খুব সহজ নয়, বরং অনেক সাহস ও সততার ব্যাপার। বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরিণত হবার উপায় হচ্ছে প্রতিনিয়ত নিজের মতামতের যৌক্তিকতা বিচার কয়া, প্রথাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং যৌক্তিকতার পথে ভ্রমণ সম্পন্ন করা। আজকের পৃথিবীতে নিজের মতামতকে নির্ভুল ধরা ও তাকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেবার সুযোগ ও সম্ভাবনা অনেক বেশি। শিক্ষিত মানুষকে এইসব প্রলোভনকে দূরে ঠেলতে শিখতে হবে। নিজের মতামতকে জোরালোভাবে তুলে ধরা কোন দোষ নয়, কিন্তু যারা অসম্মতি প্রকাশ করছে তাদের কথাও শোনো। যদি এমন সংসর্গে থাকো যারা বিচারবিবেচনা ছাড়াই তোমার মতামতকে মেনে নেয় তাহলে নতুন সঙ্গ খুঁজে বের করো। যুক্তির কাছে সমর্পণ একজন শিক্ষিত মানুষকে তৃতীয় যে দায়ে আবদ্ধ করে তা হল মিথ্যে অহঙ্কারকে প্রত্যাখ্যান করতে শেখা, বিশেষ করে আজকের দুনিয়ায় যেখানে সবাই নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব দেয় নিজ মেধা, পরিশ্রম ও সুবিবেচনাকে। অথচ একথাও কম সত্য নয় যারা তোমাদের সহায়তা করেছে চলার পথে তাদের ছাড়া এককভাবে মেধা এতটা সাফল্য আনতে পারে না। তাই সাফল্যের কৃতিত্বে বাবা-মা, পরিবার ও বন্ধুদেরও কৃতিত্বের অংশ দেবে যারা তোমাকে নানাভাবে সহায়তা করেছে। মনে রাখবে পৃথিবীতে একই মেধার, একই যোগ্যতার মানুষ আছে যারা হয়ত দারিদ্র্য, পারিবারিক সমস্যা ও সহায়তার অভাব অথবা শুধুই দুর্ভাগ্যের কারণে তোমার মত সফল অবস্থানে আসতে পারেনি। তাই ভাগ্য যাদের সহায়ক হয়নি এমন মানুষের সহায়তা করা তোমার কর্তব্য। আজ এখান থেকে যাবার সময় তোমরা নিজেদের দায়িত্বগুলো মাথায় রাখবে- নিজের অন্তরের তাড়নাকে খুঁজে বের করা, তোমার ভালবাসার কাজটি করা, জীবনে বিনয়ের বীজ বপন করা এবং সর্বোপরি তোমার কাজের মধ্যে ইতিবাচকতাকে তুলে ধরা। এখান থেকে যা শিখেছ তা নিয়ে তোমরা সামনে এগিয়ে যাও, তোমাদের অর্জনকে উদযাপন করো আনন্দে এবং ভবিষ্যতে এ অর্জনকে অর্থপূর্ণ করে তোলার প্রতিজ্ঞা করো। সূত্র: ইন্টারনেট