সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশি টাকার মান বেড়েছে

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:০৫
বাংলাদেশের চেকপোস্টগুলোর ওপারে বেসরকারি মানিচেঞ্জার মার্কেটগুলোতে ভারতীয় রুপির সাথে বাংলাদেশের টাকার বিনিময় হার বেড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের একশ’ টাকার বিনিময়ে ভারতের ৬৫/৬৬ রুপি দেয়া হচ্ছে বলে সীমান্তের ওপার থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে রুপির সাথে বাংলাদেশের টাকার বিনিময় হার হ্রাস পেয়েছিল। বাংলাদেশের একশ’ টাকার বিনিময়ে ওপারের মানিচেঞ্জাররা ভারতীয় ৫৫/৫৬ রুপি দিচ্ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকে তত্কালীন পূর্ববঙ্গের বিপরীতে ভারত সীমান্তবর্তী হাট-বাজারে টাকা বদলের ব্যবসা গড়ে উঠে। সীমান্তের ওপারের স্টেশন ও চেকপোস্টগুলোতে টাকা বদলের ডাক শোনা যেত হকারদের কণ্ঠে। সেই থেকে দু’ দেশের মধ্যে টাকা বদলের ব্যবসা শুরু। আজও এ ব্যবসা চলছে। চেকপোস্টগুলোতে নোটের বান্ডিল হাতে দাঁড়িয়ে থাকে টাকা বদলের কারবারিরা। বর্তমানে এটা অনেকের পেশা। জানা যায় বাংলাদেশি টাকা বদলের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা । তারা প্রতিদিন বাংলাদেশি টাকার সাথে রুপির বিনিময় হার নির্ধারণ করে দেয় কলকাতা থেকে। আর লাভ রেখে টাকা বদলকারিরা সীমান্ত এলাকায় টাকা বদল করে থাকে। ’৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত মুদ্রার পৃথকীকরণের জন্য এক অদ্ভুত পন্থা অবলম্বন করে। পাকিস্তান ব্রিটিশ প্রবর্তিত মুদ্রার উপর হুকুমতে পাকিস্তান সিল দিয়ে বৈধ মুদ্রা হিসাবে চালু করে। আর ভারত নিজস্ব মুদ্রা চালুর আগ পর্যন্ত ব্রিটিশ প্রবর্তিত মুদ্রা চালু বাখে। ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান নিজস্ব মুদ্রা চালু করে। তখন পাকিস্তানের একশ’ টাকার বদলে ভারতীয় ১৪০/১৪২ রুপি দেয়া হত বলে প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়। আস্তে আস্তে টাকা অদল বদলের বিনিময় হারে উঠানামা চলতে থাকে। ১৯৬০-৬২ সালের দিকে ভারতীয় রুপির মূল্য বেড়ে যায়। পাকিস্তানের একশ’ টাকার বদলে ভারতের ৭০/৭২ রুপি দেয়া হত। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে এ টাকার ব্যবসা বলতে গেলে বন্ধ হয়ে যায়। ’৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে লোক চলাচল বেড়ে যায়। টাকা বদলের ব্যবসাও চাঙ্গা হয়। এক কোটির বেশি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে বাংলাদেশের একশ’ টাকার বিনিময়ে ভারতের ৯০/৯২ রুপি করে দেয়া হত। পাকিস্তান বাংলাদেশে তাদের প্রবর্তিত একশ’ টাকার নোট অচল ঘোষণা করে। আগস্ট মাসে টাকার বিনিময় হার বেড়ে যায়। একশ’ টাকার বদলে ১১০/ ১১৫ রুপি দেওয়া হত। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ নিজস্ব মুদ্রা চালু করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল ছিল না। তখন ভারতীয় রুপির দাম চড়ে যায়। এক সময় বাংলাদেশের একশ’ টাকার বদলে ভারতীয় ৩৫/৪০ রুপি দেয়া হত। ১৯৭৬ সালের পর রুপির সাথে টাকার বিনিময় হার একটু একটু করে বাড়তে থাকে। তবে কোনদিন সমান সমান হয়নি। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত টাকার মান বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের একশ’ টাকার বিনিময়ে ভারতের ৯০ রুপি পর্যন্ত দেয়া হত। এরপর রুপির সাথে টাকার দর পতন ঘটে। বিগত শতকের ’৯০ এর দশকে একশ’ টাকার বদলে ৮০ রুপি করে দেয়া হত। ২০০০ সালের পর টাকার আরো দর পতন হয়। একশ’ টাকার বদলে ভারতের ৭০/৭২ রুপিতে নেমে আসে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে আরো দর পতন হয়। সমপ্রতি ডলারের সাথে ভারতীয় রুপির দর পতনের পর রুপির সাথে টাকার বিনিময় হার চাঙ্গা হয়েছে। রবিবার বেনাপোল সীমান্তের বিপরীতে বাংলাদেশের একশ’ টাকার বদলে ভারতের ৬৬ রুপি দেয়া হয়। দর্শনার সীমান্তের ওপারে টাকার সাথে রুপির বিনিময় হার একই রকম ছিল বলে জানা যায়। আগে সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশি কারেন্সির বদলের বৈধতা ছিল না। এরপর ভারত সরকার মানিচেঞ্জার লাইসেন্স প্রদান করে। অনেক পরে বাংলাদেশ সরকারও সীমান্তের চেকপোস্ট এলাকায় মারিচেঞ্জার লাইসেন্স প্রদান করে। তবে পাশের মানিচেঞ্জারদের ব্যবসা খুবই মন্দা। যারা বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায় তারা সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া টাকা ওপারের মানিচেঞ্জারদের কাছ থেকে ভাঙ্গিয়ে থাকে। আবার আসার সময় ওপারের মানিচেঞ্জারদের কাছ থেকে বাংলাদেশি টাকা বদলীয়ে নিয়ে আসে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যারা ডলার নিয়ে যায় তারা ওপারে গিয়ে বদলে নেয়। ভারতীয়রা সঙ্গে করে আনা রুপি ওপারের চেকপোস্ট থেকে বদল করে আনে। আমাদের দেশে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যাপারে কড়াকড়ি থাকলেও ভারতে নেই। সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশি টাকায় পণ্য কেনাবেচা চলে বলে জানা যায়। টাকা দিলে রুপির হিসাব ধরে পণ্য দেয়া হয়। এপারের কোন দোকানে রুপির বিনিময়ে কোন পণ্য কেনা যায় না। চোরাচালানীরা বেশি পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রা ওপারে পাচার করে থাকে। ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীদের পাচার করা গরুর দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় পরিশোধ করা হয়ে থাকে। তবে প্রশ্ন প্রতিদিন বাংলাদেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা ভারতে যায় তা দিয়ে তারা কি করে? বৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে কোন পণ্য কিনতে ব্যয় করে না। বৈধভাবে পণ্য আমদানি করতে হলে ব্যাংকে এলসি খুলে ডলারের মাধ্যমে করতে হয়। সহজ উত্তর অবৈধভাবে এ টাকার আদান প্রদান হয়ে থাকে।