আমদানি পণ্যের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রাক জাহাজীকরণ পরিদর্শন (পিএসআই) কোম্পানি না রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক কর্মকর্তারা। তারা মনে করছেন, এনবিআরের শুল্ক বিভাগ এখন আমদানি পণ্যের মূল্যায়নে সক্ষমতা অর্জন করেছেন। এছাড়া পিএসআই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নানামুখী অভিযোগ থাকা এবং এই প্রথা বাদ দেয়ার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার থাকায় নতুন করে পিএসআই কোম্পানির সাথে আর চুক্তি না করার পক্ষেও মত দিয়েছেন তারা। গতকাল রবিবার এনবিআরে এ বিষয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ অভিমত প্রকাশ করেন তারা। এনবিআর চেয়ারম্যান গোলাম হোসেনের সভাপতিত্বে এ সভায় এনবিআর সদস্য ফিরোজ শাহ আলম, প্রথম সচিব মোস্তবা আলী ও এ এফ এম আব্দুল্লাহ খানসহ বিভিন্ন কাস্টম হাউজের কমিশনাররা উপস্থিত ছিলেন। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এর আগে চট্টগ্রামে এক সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান পিএসআই বাতিল হওয়ার পর এই কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য শুল্ক বিভাগ কতটুকু সক্ষম তা নিয়ে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেন, পণ্যের মূল্যায়ন নিয়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সবচেয়ে বেশি দ্বন্দ্ব হয়। পিএসআইয়ের পরিবর্তে বিকল্প পদ্ধতি চালুর আগে অন্তর্বর্তী সময়ে পণ্যের মূল্যায়ন কী পদ্ধতিতে হবে তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। পিএসআই পদ্ধতি উঠে গেলে পণ্যের মূল্যায়নে শুল্ক বিভাগে এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড যুক্ত হবে। কিন্তু এই পদ্ধতির প্রস্তুতি নিয়েও পুরোপুরি অবগত নই। ইত্তেফাকের সাথে আলাপকালে তিনি বলেছিলেন, পিএসআই উঠে গেলে কিছু ঝুঁকি থাকবে। অবশ্য মূল্যায়ন ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে না পড়ে সে জন্য এনবিআর কাজ করছে।
তবে গতকালের বৈঠকে কর্মকর্তারা এনবিআর চেয়ারম্যনকে বলেছেন, যেহেতু এনবিআরের অনেক দিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং ঘুরে ফিরে প্রায় একই ধরনের পণ্য আমদানি করা হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে পিএসআই উঠে গেলেও পণ্য মূল্যায়ন করতে তাদের অসুবিধা হবে না।
বৈঠকে উপস্থিত একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ বিষয়ে ইত্তেফাককে বলেন, যেহেতু আগামী জানুয়ারি মাস থেকে পিএসআই প্রথা উঠে যাওয়ার কথা রয়েছে ফলে আমরা আমদানি পণ্যের মূল্যায়নের বিষয়ে নিজেদের সক্ষমতা তৈরি করেছি। কিন্তু পিএসআই রাখা না রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে নয়। এই সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে। অবশ্য ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মনে করেন, অন্যান্য দেশে পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য নির্ধারণে কাস্টমস বিভাগে যে ধরনের দক্ষতা ও যোগ্যতা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে তা অনুপস্থিত। এ অবস্থায় পিএসআই ব্যবস্থা তুলে দিলে কাস্টমস কর্মকর্তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়বেন ব্যবসায়ীরা। এতে করে তাদের ওপর হয়রানি বাড়বে।
বর্তমানে যে চারটি কোম্পানি পিএসআইয়ের দায়িত্ব পালন করছে সেগুলো হচ্ছে সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক কোম্পানি এসজিএস, ফ্রান্সভিত্তিক ব্যুরো ভেরিটাস ব্রিটিশভিত্তিক আইটিএস ও জাপানভিত্তিক কোম্পানি অমিক। প্রসঙ্গত, আমদানি করা পণ্যের পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করে পিএসআই কোম্পানি। এগুলো হলো পণ্যের গুণগত মান, পরিমাণ, মূল্য, এইচএস কোড (পণ্য পরিচিতি কোড) ও আমদানি যোগ্যতা। এই পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করে পিএসআই সংস্থা সিআরএফ (ক্লিন রিপোর্ট ফাইন্ডিংস) সার্টিফিকেট ইস্যু করে থাকে। এর ভিত্তিতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্যের শুল্কায়ন করে মালামাল খালাস করে। পিএসআই কোম্পানি যে সার্ভিস প্রদান করে তার বিপরীতে নির্ধারিত হারে চার্জ কেটে নেয়। এর পরিমাণ প্রতি চালানে আমদানি করা পণ্যের মোট মূল্যের দশমিক ৪২ থেকে ৫০ শতাংশ।
আমদানি পণ্যের মূল্য কম দেখানোয় সহায়তা করা, ভুয়া ব্যাংক ডকুমেন্ট দেখিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি, মানহীন পণ্যে সিআরএফ (ক্লিন রিপোর্ট ফাইন্ডিংস) বা প্রত্যয়নপত্র দেয়া, মিথ্যা এইচ এস কোড ব্যবহার, খাদ্য পণ্যের নামে বিলাস বহুল পণ্য আমদানিতে সহায়তাসহ নানাবিধ অভিযোগ রয়েছে পিএসআই কোম্পানির বিরুদ্ধে।
