উত্সবের দিন রাত্রি

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০১
ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। ফাঁকা হয়ে গেছে গ্যালারি। একে একে নিভে যাচ্ছে ফ্লাড লাইট। কুয়াশা আর অন্ধকারে ঢাকা স্টেডিয়ামটা ভেতর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীই বোধহয় নীরব হয়ে গেছে। কিন্তু স্টেডিয়ামের গেটে আসতেই ভুভুজেলা, ঢোল, বাশি আর পটকার আওয়াজে ভুল ভাঙল। মিরপুরের উত্সব তখনও শেষ হয়নি। কোথাও আগুন জ্বেলে, কোথাও গান গেয়ে-নেচে আবার কোথাও মোটর সাইকেল মিছিল করে চলছিল উত্সব; ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের উত্সব। এ চিত্র শুধু মিরপুরের ছিল ভাবলে ভুল হবে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই সিরিজের পঞ্চম ম্যাচটি জয়ের রাতে আসলে এমন উত্সব করে জেগেছে সারা ঢাকা নগরী। আসলে ঢাকা নগরীই বা বলি কেন; বলা ভালো, এমন উত্সবে রাত কাটিয়েছে সারা বাংলাদেশ। উত্সবের শুরু মাঠেই হয়েছিল। প্রথমবার ভুল করে এক রান না নিয়েই জয়ের উত্সব শুরু করে দিয়েছিলেন দুই ব্যাটসম্যান নাসির হোসেন ও ইলিয়াস সানি। তাদের দেখা দেখি মাঠে ঢুকে পড়েছিলেন বাকি সবাই। পরে সব শান্ত করে আবার এক বল খেলা হল; তাতে চার মেরে শুরু হল সত্যিকারের উত্সব। মাঠেই হয়ে গেল এক পশলা গ্যাংনাম স্টাইল নাচ। এরপর ড্রেসিংরুমে যথারীতি ‘আমরা করব জয়’ নাচ। ম্যাচ শেষের আধাঘন্টা পর সংবাদ সম্মেলনে আসা অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম নিজেই বললেন, ‘সময়টা তো উপভোগেরই। আমরা সবাই গ্যাংনাম ভালো নাচি; রিয়াদ ভাই বেস্ট।’ মুশফিকরা কেন; গ্যাংনাম নেচেছে কাল সারাদেশে। শীতের রাত, কুয়াশায় সবকিছু ঢেকে ছিল। এরপর আবার ছিল পরের দিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার ভয়। এর কোনো কিছুই শনিবার রাতে বাঙালিকে ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। মিরপুর স্টেডিয়াম থেকে যতোগুলো রাস্তা নগরীর যতোদিকে গেছে, সবগুলোর মোড়ে মোড়ে চোখে পড়েছে উত্সব। আর সব উত্সবের নদী যেন মিশেছে গিয়ে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের সাগরে। সবসময়ের মতো দেশের এই সাফল্যে ঢাকার উত্সবের প্রাণকেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি বা শিক্ষক-ছাত্র সম্মেলন কেন্দ্রের গোল চত্বর। রাজু ভাস্কর্যের চারপাশে যেন শুরু হয়েছিল লাতিন কোনো দেশের উত্সব রজনী। এই উত্সবে যোগ দিতে নগরীর নানা প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ মোটর সাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ছুটে এসেছিলেন। ছুটে এসেছিলেন চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, মঞ্চ থেকে শুরু করে সঙ্গীত জগতের নানা তারকারা। তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে উত্সব করেছেন, উদযাপন করেছেন। এর সঙ্গে নগরী জুড়ে ছোটখাটো আতশবাজির খেলা আর পটকা ফোটানোর পর্ব তো ছিলই। থেকে থেকেই দূর থেকে ভেসে আসছিল এসব বাজি-পটকার আওয়াজ। প্রধানমন্ত্রী রাতেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, গতকাল দিনে সারা দেশে আনন্দ মিছিল হবে। রাতেই আনন্দ মিছিলের সূচনা হয়ে যায় নগরীতে। ঢাকাসহ সারাদেশেই কাল রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি এসব আনন্দ মিছিল চলেছে দিনভর। সারাদিনই আমাদের বিভিন্ন জেলা প্রতিনিধি ফোনে জানাচ্ছিলেন, সেই জেলায় আনন্দ মিছিলের খবর। আমাদের মৌলভীবাজার সংবাদদাতা জানাচ্ছেন, সেখানকার আনন্দ মিছিলে জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এবং আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। একইরকম ইত্তেফাকের নোয়াখালী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সেখানে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতৃত্বে বড় বিজয় মিছিল হয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানা যাচ্ছে, গতকাল সকালে ১১টায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ থেকে এক বিশাল বিজয় মিছিল বের হয়ে পল্টন-প্রেসক্লাব-কাকরাইল পরিভ্রমণ করে। জাতীয় দলের এই বিজয়ে যেমন আনন্দে-উত্সবে দেশবাসী ভেসে যাচ্ছেন; তেমনই দেশের নেতা-নেত্রীবৃন্দও আনন্দিত। রাতেই দলকে বিজয়ের অভিনন্দন জানিয়েছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়ে খেলা দেখেছেন; বিজয়ের সাক্ষী হয়েছেন। সারাদিন বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার পক্ষ থেকেও অভিনন্দন জানানো হয়েছে। অভিনন্দন জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, সম্মিলিত ক্রীড়া পরিবারও। এ সবকিছু থেকে একটা ধারণা অন্তত পাওয়া যায়, জাতীয় ক্রিকেট দলের একটি জয় অন্তত ঘুচিয়ে দেয় সব মত ও আদর্শের পার্থক্য। এটা হয়ে ওঠে শুধু বাংলাদেশের জয়।