আহাদ আদনান
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে প্রতিদিন ছুটে আসে হাজার হাজার দর্শনার্থী। সাগরের তীরে বসে গা ভেজানো, সাঁতার, ডাইভিংসহ আরো অনেক আয়োজনে মেতে ওঠে সমুদ্রবিলাসী লোকজন। আচ্ছা, কখনো ভেবে দেখেছেন, এই সাগরের গভীরে, অনেক গভীরে, আরো একটি জগত্ আছে। সেটাই বরং বিশালতর, অদ্ভুত আর চমকপ্রদ স্থান। কী আছে সেখানে? কারা বিচরণ করে সেই জগতে? টিভি, অন্তর্জালের সময়ে কিছুই অজানা নেই আজ। কিন্তু একটা আস্ত সামুদ্রিক আবহে যদি সেই জগতটা অনুভব করা যায়, কেমন হয়?
ঠিক এই ভাবনা থেকে বাংলাদেশে প্রথম বিশ্বমানের সি অ্যাকুরিয়াম ‘রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড কক্সবাজার’ গড়ে উঠেছে। কলাতলি মোড় থেকে অটোগাড়িতে মাত্র ২০ মিনিটের পথ দূরে ঝাউতলাতে চারতলা ভবন নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান। ‘সাগরতলের রহস্য’ দেখার জন্য ভবনে প্রবেশ করার সাথে সাথে আপনাকে অভ্যর্থনা জানানো হবে, সাথে থাকবে ছবি তোলা, যেটি আপনি প্রিন্ট করে নিতে পারবেন। যেকোনো জাদুঘরের মতো চক্রাকারে শুরু হলো আপনার যাত্রা। ছোট-বড় নানা অ্যাকুরিয়াম, রঙের খেলা, পাশে প্রাণীটির জীব-বৈজ্ঞানিক পরিচিতি—এসবই পাবেন এখানে। চাইলে মাছকে খাবারও খাওয়াতে পারবেন।
এখানে শতাধিক প্রজাতির জীবন্ত সামুদ্রিক প্রাণীর সমাহার রয়েছে। বিভিন্ন মাছ, সাপ, আট-পা বিশিষ্ট প্রাণী (আর্থ্রোপড)সহ প্রজাতি নির্ধারণ না হওয়া প্রাণী পর্যন্ত রয়েছে অ্যাকুরিয়ামগুলোতে। চোখে পড়ার মতো কয়েকটি নাম হলো পিরানহা, জায়ান্ট ক্যাটফিস, থাই পাঙ্গাস, ভূত ছুরি, স্কিপার, লবস্টার, মহাশোল, অ্যাঞ্জেল ফিস, ফলি, সোনালি /নীল /শ্বেত সাইক্লিড, গার, চিত্রা-গৌরামি, পাবদা, আফ্রিকান/ গাং মাগুর, ব্লাড প্যারোট, বুল কোরাল, বারগুনি, চাক, কালো কার্প, আর্চার ফিস, হাউস পাতা, বাইলা, টেংরা, কামিলা, সাথাইট্টা, সরপুটি, ঈল, সাকার ফিসসহ আরো অসংখ্য প্রজাতি। অধিকাংশের সাথে আছে বৈজ্ঞানিক নামকরণ বৃত্তান্ত (রাজ্য থেকে শুরু করে প্রজাতি)। জীববিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য এটি যেন সাক্ষাত্ ক্রিকেটের লর্ডস জাদুঘর। আর সাধারণ দর্শকদের জন্য অপার বিস্ময়।
দু-দিকে অ্যাকুরিয়াম দেখতে দেখতে যদি দেখেন মাথার ওপরে পানিতে মাছ সাঁতার কাটছে কেমন লাগবে? ‘হাঙরের মুখ’ দিয়ে ঢুকলে পাবেন এই মজার অ্যাকুরিয়াম। যেন আপনি সাগরের একেবারে নিচে আর আপনার চারদিকে শুধু নীল জল আর অদেখা প্রাণী। এছাড়া সীমিত সাধ্যের মাঝে তৈরি করা হয়েছে কিছু কৃত্রিম আবহ। ওয়াটার ফল জোন, রিভার স্ট্রিম ভিউ, ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, সি সাইড জঙ্গল ভিউ, ডলফিন সেলফি জোন, শার্ক গ্যালারি, ডিপ ওশ্যান ক্যাইভ, অক্টোপাস ওয়ার্ল্ড ইত্যাদি। শুধু বিনোদন নয়, শিক্ষার উপকরণও আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। অ্যাকুরিয়াম গবেষণাগার, বাগদা চিংড়ির জীবনচক্র, সাগরতলের দূষণ এসব নিয়ে সচিত্র লেখা আছে দেয়ালে দেয়ালে। ডকুমেন্টারি শো হাউজ, থ্রিডি মুভি হাউজ, নাইন ডি-ভিআরএফ আপনাকে দেবে বাড়তি উত্তেজনা। বাচ্চাদের জন্য আছে বিশাল খেলার জায়গা। আর খাওয়া-দাওয়ার জন্য রয়েছে চমত্কার রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থা। চতুর্থ তলার রূপচান্দা কনফারেন্স হলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। রুফটপে বাগান আর বার-বি-কিউ’র উপকরণ রাখা আছে।
সবার মাঝে অ্যাকুরিয়াম, সমুদ্র, সামুদ্রিক সম্পদ ও পরিবেশ বিষয়ক জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে শিক্ষা ও গবেষণা উইং ‘রেডিয়েন্ট ওশান রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডুকেশন সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিভিন্ন ট্যুর, আউটডোর এবং ইনডোর প্যকেজ, দৈনিক বা সাপ্তাহিক প্যাকেজের মাধ্যমে আপনি পাবেন পারিবারিক বা দলগতভাবে হাতে-কলমে সমুদ্র, সামুদ্রিক প্রাণী, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ধারণা পাওয়ার চমকপ্রদ সুযোগ। আরো বেশি যারা সমুদ্রবিলাসী তারা বিভিন্ন দিবসে কর্তৃপক্ষের সাথে ফেসবুক আর ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতে পারেন নানা আয়োজনে সাথে থাকতে।
এই প্রতিষ্ঠানটির পরিচ্ছন্নতা, কর্মচারী আর শিক্ষা গবেষণা উইংয়ের আন্তরিকতা মুগ্ধ করেছে। অধিকাংশ দর্শনার্থী বের হয়েছেন তৃপ্তির হাসি নিয়েছে। দু-একজন অতি খুঁতখুঁতে লোক বলতে পারেন, বিদেশের তুলনায় এটি কিছুই নয়। কিন্তু বলা যায়, এখানে ঘুরতে আসা সিংহভাগের তো বাইরের পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়াই হয় না। সীমিত পরিসরে এ তো মাত্র শুরু। সামনে আরো উন্নতির সুযোগ তো রয়েছেই। কক্সবাজারে ঘুরতে আসা পর্যটকদের দর্শনীয় বিভিন্ন স্পটের মাঝে অবশ্যই থাকবে ‘রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড’।
মাতুয়াইল, ঢাকা
