শোক শ্রদ্ধা ভালোবাসায় অন্তিম শয়ানে খান সারওয়ার মুরশিদ

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২৩
সর্বস্তরের মানুষের গভীর শোক, অসীম শ্রদ্ধা আর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন মুক্তবুদ্ধির প্রবক্তা, শিক্ষাবিদ খান সারওয়ার মুরশিদ। গতকাল রবিবার মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয় বাঙালির শিক্ষা-সংস্কৃতি আর চিন্তনের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব, প্রগতিশীলতার সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণ এই ব্যক্তিত্বকে। এর আগে গুলশানের আজাদ মসজিদে বাদ জোহর তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ আছর দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় খান সারওয়ার মুরশিদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সর্বত্রই ছিল শ্রদ্ধা আর আবেগঘন এক পরিবেশ। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খান সারওয়ার মুরশিদের মরদেহ অ্যাপোলো হাসপাতাল থেকে গুলশান আজাদ মসজিদে এনে কাফন পরানো হয়। এরপর দুপুর পর্যন্ত রাখা হয় গুলশানে মরহুমের ১২১ নম্বর রোডের বাসভবনে। খান সারওয়ার মুরশিদকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে দুপুর সাড়ে ১২টায় গুলশানের বাসায় যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে ফাতেহা পাঠ করেন এবং মোনাজাত করেন। এরপর শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী। শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দুপুর সোয়া দুইটায় খান সারওয়ার মুরশিদের মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে আনা হয়। ইংরেজি বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ইংরেজি বিভাগের ইমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ ছিলেন সবার অনুপ্রেরণার উত্স। প্রথমে শিক্ষক এবং পরে সহকর্মী হিসেবে পেয়ে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। তিনি লিখতেন কম; কিন্তু বলতেন বেশি। যা বলতেন তা চিন্তার গভীরতাসহ সংযতভাবে বলতেন।’ এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দীন আহমেদ, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক সদরুল আমিন, শিক্ষক নেতা অধ্যাপক আখতারুজ্জামানসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। কলাভবনে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ পৌনে তিনটায় নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। মরদেহ শহীদ মিনারে নেয়ার পর ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘গার্ড অব অনার’ দেয়া হয়। এ সয়ম বিউগলে বাজানো হয় করুণ সুর। এখানে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে খান সারওয়ার মুরশিদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ এমপি, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম প্রমুখ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম, সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষে ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, আতাউর রহমান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর এমপি, ওয়াকার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, অধ্যাপক আনিসুর রহমান, সৈয়দ হাসান ইমাম, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক ম. হামিদ, লায়লা হাসান, শিল্পী রফিকুন নবী, হাশেম খান, শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনী প্রমুখ। রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন অতিরিক্ত সচিব ফজলুল হক। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, ছাত্রলীগ, আওয়ামী যুবলীগ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, সিপিবি, বাসদ, গণসংহতি আন্দোলন, গণফোরাম, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ, পেন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের মহাসচিব সৈয়দা আইরিন জামান, গণঐক্য কমিটি, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জাসদ ছাত্রলীগ, ব্রতী সংগঠন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ, সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত অধিকার আন্দোলন, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, ছায়ানট, স্টেপ স্টুয়ার্ড ডেভেলপমেন্টস, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, দেশ টিভিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বক্তব্য রাখেন তোফায়েল আহমেদ, আসাদুজ্জামান নূর, শামসুজ্জামান খান, রামেন্দু মজুমদার, সৈয়দ হাসান ইমাম প্রমুখ। তোফায়েল আহমেদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু যাদের কাছ থেকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে পরামর্শ নিতেন, খান সারওয়ার মুরশিদ ছিলেন তাদের অন্যতম। বঙ্গবন্ধুর নিত্যদিনের সঙ্গী ছিলেন তিনি। সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, তার বিদায় বাংলাদেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। বুদ্ধিভিত্তিক ও চিন্তার আন্দোলনে অগ্রগামী ছিলেন তিনি। যখন পূর্ববাংলায় রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল তখন রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন করতে গঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক খান সারওয়ার। অপরদিকে, আসাদুজ্জামান নূর বলেন, যে কোনো মৃত্যু শোকের। এই মৃত্যুও আমাকে শোকাহত করেছে। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। নাগরিক শোকাঞ্জলি শেষ হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দীন ইউসুফের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। তিনি বলেন, খান সাওয়ার মুরশিদ সব সময় ছিলেন যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে। যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ হচ্ছে তখনই তার মৃত্যু হয়েছে। তিনি তা দেখে যেতে পারলেন না। এর আগে প্রয়াত পিতার রুহের মাহফেতার কামনা করে বক্তব্য রাখেন মরহুমের জ্যেষ্ঠ সন্তান খান সাঈদ আহমেদ মুরশিদ। নাগরিক শোকাঞ্জলি পরিচালনা করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। গত শনিবার রাজধানী একটি হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। স্বাধীনতা পদক দেয়ার দাবি মুক্তিযুদ্ধে এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিভিন্ন আন্দোলনে অবদানের জন্য অধ্যাপক খান সারওয়ারকে আগামী বছরের স্বাধীনতা পদক দেয়ার দাবি জানিয়েছেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক ড. শামসুজ্জামান খান। তিনি বলেন, দেশের জন্য তিনি যা করে গেছেন, সেজন্য তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করা উচিত। শোক শ্রদ্ধা ভালোবাসায় অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরিশদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠন। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। তিনি এক শোকবার্তায় বলেন, অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ আজীবন একজন সংগ্রামী মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে। জনগণের বৃহত্তর স্বার্থকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার প্রশ্নে তিনি কখনও রাজনৈতিক বিভক্তিকে সমর্থন করেননি। তার মৃত্যুতে জাতি একজন ধীর, শান্ত ও অভিজাত কিন্তু সাহসী মানুষকে হারালো, যিনি সব সময় খারাপ ও নিচতার বিরোধী ছিলেন এবং নিগৃহীত মানুষের পক্ষে দাঁড়াতেন। জাতীয় পার্টি (জেপি) বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদের ইন্তেকালে জাতীয় পার্টি-জেপি’র চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। গতকাল এক বিবৃতিতে জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, খান সারওয়ার মুরশিদের ইন্তেকালে দেশ একজন শিক্ষানুরাগীকে হারালো। বিবৃতিতে নেতৃদ্বয় মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. খান সারওয়ার মুরশিদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে রবিবার বলা হয়, বিশিষ্ট এ বুদ্ধিজীবী ১৯৪৭ থেকে বাংলাদেশের সমস্ত গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক প্রগতিশীল আন্দোলনে শুধু যুক্ত ছিলেন না, নেতৃত্বও দিয়েছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রীয় পদে থেকে শুধু যোগ্যতা নয় সৃজনশীলতারও পরিচয় দিয়েছেন। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের দুষ্কর্ম অনুসন্ধানের জন্য প্রয়াত কবি বেগম সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে গঠিত ‘জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের’ একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। বিশিষ্ট এ শিক্ষাবিদ পরিণত বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তার মৃত্যু আমাদের অভিভাবকহীন করেছে, তার মৃত্যুতে নির্মূল কমিটি গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছে এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছে। আইজিপি বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল হাসান মাহমুদ খন্দকার বরেণ্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর খান সারওয়ার মুরশিদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক শোক বার্তায় বলেন, ‘প্রফেসর খান সারওয়ার মুরশিদ শুধু একজন শিক্ষাবিদই ছিলেন না, তিনি একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবেও সমধিক পরিচিতি অর্জন করেছিলেন। তার মৃত্যুতে আমরা অত্যন্ত প্রাজ্ঞ, মননশীল ও আধুনিক মানসিকতা সম্পন্ন এক অনুকরণীয় ব্যক্তিকে হারিয়েছি।’ আইজিপি মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।