আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বালুভরা আরবি উচ্চ বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারটি ১০৪ বছর ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আসছে। গ্রন্থাগারটি একদিকে বিদ্যালয়ের খ্যাতি যেমন বৃদ্ধি করেছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ প্রসারিত করেছে।
১০৪ বছর বয়সের প্রাচীন এই বিদ্যালয়টি এলাকার শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রছাত্রী চিকিত্সক, প্রকৌশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে জাতির নিরবিচ্ছিন্ন সেবা করে যাচ্ছেন। লাইব্রেরিতে প্রদর্শিত বাংলাদেশসহ বিশ্বের বরেণ্য মনীষীদের ছবি এক অনন্য দৃষ্টান্ত। স্কুল পর্যায়ে এমন সমৃদ্ধ এবং দর্শনীয় লাইব্রেরি বিরল ঘটনা। এর পাশাপাশি নিজ বিদ্যালয়টির উন্নয়ন, জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন অনেকেই। তাদেরই একজন সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। বর্তমানে তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব পদে নিয়োজিত রয়েছেন। তারই প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সক্রিয় উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে সবিতা চক্রবর্তী স্মৃতি গ্রন্থাগার। মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়ে এমন সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার কোথাও আছে বলে প্রতীয়মান হয়নি।
এই গ্রন্থাগারে মোট ৩ হাজার ৭২৬টি বই রয়েছে। বইয়ের তালিকায় রয়েছে স্থানীয়, জাতীয় এবং বিশ্বখ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের জীবনী, শিল্পী-সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ক্রীড়াবিদ, রাজনীতিবিদ, চলচ্চিত্রকার, চলচ্চিত্রশিল্পী, ইতিহাসবিদদের জীবনী, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীসহ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন লেখা, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, কাব্যগ্রন্থ, রবীন্দ্র রচনাবলী, নজরুল রচনাবলী, ধর্মীয় গ্রন্থসামগ্রী, গবেষণামূলক লেখা, শিশুতোষ লেখাসহ সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যম এই গ্রন্থাগারটিকে করেছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই গ্রন্থাগারের সহকারী গ্রন্থাগারিক মাসুদা আক্তার জানান, ছাত্রছাত্রীদের গ্রন্থাগারে এসে বই পড়ার আগ্রহ বেশ। সপ্তাহে ৫ দিন প্রতিদিন ১টি করে ৫টি ক্লাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ক্লাস রুটিনে। রুটিন মাফিক ক্লাসে এসে তাঁরা তাদের চাহিদামতো বই নিয়ে পড়াশোনা করতে পারে। এখানে বইপড়া শেষে পুনরায় বইটি ফেরত দিয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের বই এবং শিশুতোষ বই পড়তে বেশি আগ্রহী বলে মনে হয়। এই গ্রন্থাগারের উল্লেখযোগ্য এবং বিরল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের ছবি টানিয়ে রাখা। সংগৃহীত বইগুলোর মতোই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ক্রীড়া, রাজনীতি, শিল্পী, দার্শনিক, চলচ্চিত্রশিল্পী, চলচ্চিত্রকার, নাট্যকার, ঔপন্যাশিক, বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রনায়কদের দুঃষ্প্রাপ্য সব ছবি এখানে চারদিকের দেয়ালে সারিবদ্ধভাবে টানানো রয়েছে। এসব ছবির মধ্যে বঙ্গবন্ধু থেকে মাওসেতুঙ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে সেক্সপিয়ার, হাছনরাজা থেকে লালন ফকির, কোনোটাই বাদ পড়েনি। দুঃষ্প্রাপ্য এই সংগ্রহ সত্যিই যেকোনো মানুষকে অভিভূত করে। ছবির এই গ্যালারিতে মোট ৩ শতাধিক ছবি ঠাঁই পেয়েছে। ছবির তালিকা আরো বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্র প্রীতম কুমার চক্রবর্তী ও ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী যুথি আক্তার এই লাইব্রেরির নিয়মিত পাঠক। তাঁরা বেশিরভাগ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই পড়ে থাকে। তাঁরা জানায়, তাঁরা এই গ্রন্থাগরে বই পড়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সঠিক এবং বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোত্তালেব হোসেন বলেন, ‘বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে অত্যন্ত আন্তরিক। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জন থেকে শুরু করে সব দিকে তাঁর গঠনমূলক ভূমিকা অতুলনীয়। তাঁর নজরদারি এবং উদ্যোগে এই বিদ্যালয়টি একটি আদর্শ বিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। এ রকম একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে আমি নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করি।’
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সুকমল কর্মকার বলেন, ‘এই বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। একটি লাইব্রেরি এলাকার শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনে যথেষ্ঠ সহায়ক। কেবলমাত্র পুঁথিগত বিদ্যা মানুষকে জ্ঞানী করে না। জ্ঞান অর্জনে বইপড়ার কোনো বিকল্প নেই। বালুভরা আরবি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র বর্তমানে সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সচিব বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নসহ লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠা করেছেন।
বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘আমার পূর্বপুরুষরাও এলাকার মানুষের কল্যাণমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। আমার দাদু বালুভরা আরবি উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি তারও আগে বর্তমান জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুরে অনুরূপ আরেকটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। যেখানে আমার কিছু করার সুযোগ বা সাধ্য রয়েছে সেখানে কিছু করতে পারা গর্বের ব্যাপার। সৃষ্টিকর্তা আমাকে যে সুযোগ ও যোগ্যতা দিয়েছেন তার দায়বদ্ধতা থেকেই এলাকা এবং এলাকার মানুষের জন্য কিছু করতে পারা গৌরবের মনে করি। সেই চেতনাবোধ থেকেই আমি আমার গ্রাম, আমার এলাকা এবং আমার স্কুলের জন্য এসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।’
