তখন সকাল ৯টা। লক্ষ্মীবাজারের ঋষিকেশ দাস রোডের বাসা থেকে শাখারীবাজারে নিজের টেইলার্সে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন বিশ্বজিত্ দাস। প্রতিদিনের মতো পায়ে হেঁটেই পথ এগোতে থাকেন ২৫ বছরের এই যুবক। তিনি লক্ষ্মীবাজার বাহাদুর শাহ পার্কের পূর্ব পাশে পৌঁছালে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষের মাঝখানে পড়ে যান। এসময় বিকট শব্দে তার নিকটে বিস্ফোরণ হয় একটি বোমা। জান বাঁচানোর জন্য দৌঁড়ে বিশ্বজিত্ পার্শ্ববর্তী দোতলা ভবনের টমাস ডেন্টাল ক্লিনিকে আশ্রয় নেন। তার পেছনে ধেয়ে আসে একদল তরুণ। তারা দোতলায় উঠেই বিশ্বজিেক মারধর শুরু করে। কেউ মারে কিল ঘুষি, কেউ বা লাঠির বাড়ি। আবার কেউ বসায় চাপাতির কোপ। আক্রমনের কারণ বুঝতে পারেন না হতভম্ব বিশ্বজিত্।
প্রাণ বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি বার বার বলতে থাকেন, ‘ভাইরে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নই। কোনও দলের সমর্থকও নই। আমি গরীব মানুষ, টেইলার্সে কাজ করি’। কিন্তু কথা শেষ করতে না করতেই চাপাতির কোপে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।
গতকাল রবিবার ১৮ দলের অবরোধের সময় যে দুই নিরীহ যুবক রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তার একজনের গল্প এটি। দলবাজির সঙ্গে নূন্যতম সম্পর্ক না থাকা সত্বেও রাজনৈতিক সহিংসতার বলির পাঠা হতে হয়েছে তাদের। তারা জীবিকার তাগিদে সাড়া দিতেই ঘর থেকে বের হয়েছিলেন। ফিরে গেছেন লাশ হয়ে।
প্রতিদিনের মতো গতকালও শাহ জালাল (রা.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সামনে গোল চক্করের পূর্বপাশে কাজের সন্ধানে যান দিনমজুর মংলা প্রমাণিক (২৫)। মাটি কাটার শ্রমিক মংলা সকাল সাড়ে ৮টার দিকে গোলচক্করের পাশে এসে বসেন। আকস্মিকভাবে ইট পাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় খেই হারিয়ে প্রাণে বাঁচতে মংলা রাস্তা পার হয়ে ওপারে যাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার সেই বাঁচার চেষ্টাকে যেন উপহাস করে বিআরটিসির একটি দোতলা বাস তাকে চাপা দেয়। রাস্তার ওপারে যাবার পরিবর্তে মংলা চলে যান দুনিয়ার ওপারে!
জানা গেছে, পিকেটার দ্বারা আক্রান্ত হওয়ায় ড্রাইভার তার বাস রক্ষার জন্য সেটি বেপেরোয়াভাবে চালাচ্ছিলেন। তাই মংলাকে রক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। হতভাগ্য এই দিনমজুরের লাশ ময়না তদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়। ময়না তদন্ত শেষে লাশ দাফন করার জন্য গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকালে মর্গে গিয়ে তার ভাবী ইসারুন বিবি ও ভাগ্নি জামাই আমিরুল ইসলাম বলেন, মংলা নওগাঁ জেলার রাণীনগর উপজেলার নয়া হরিসপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত জখিন প্রামাণিকের পুত্র। ৬ মাস পূর্বে গ্রামের বাড়ি থেকে তিনি ঢাকায় আসেন। টঙ্গী আরিচপুর এলাকায় থাকতেন তিনি। অবরোধের কারণে মাটি কাটার কাজ না থাকায় গতকাল বিমান বন্দর গোল চক্কর এলাকায় গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এখন পরিবারটির সদস্যদের মুখে আহার কে জোগাবে তা জানা নেই কারো।
বিশ্বজিত্-মংলারা জীবন বাঁচানোর সংগ্রামে নিত্য লড়াই করে আসছিলেন। তারা কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে দাবি স্বজনদের। তারা ক্ষমতায় আসা যাওয়ার জন্য কারো পক্ষে কিংবা বিপক্ষে নয়, শুধু পরিজনের মুখে দু’মুঠো ভাত যোগানোর আশায় নিত্য দিন শ্রম দিয়ে যাচ্ছিলেন। দুই জন কর্মক্ষম যুবকের জীবন প্রদীপ অকালে নিভে যাওয়ায় তাদের পরিবার নিদারুণ আর্থিক সংকটে পড়বে। একথা বলে স্বজনহারাদের মর্গে বিলাপ করতে দেখা যায়। এদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা উপস্থিত ব্যক্তিরা খুঁজে পাননি। চোখের পানি ছেড়ে সমবেদনায় শরিক হন কেবল। স্বজনরা বলেন, এসব নিরীহ মানুষের রক্তের ওপর পা রেখে ক্ষমতার পালাবদল হয়। তাদের পরিবারের ভাগ্যে পরিবর্তন তো ঘটেনি, কিংবা খবর কেউ নেয়নি।
বিশ্বজিতের উপর যখন হামলা হয় তখন পুলিশ বাইরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত ছিল। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন ইত্তেফাককে বলেন, হামলাকারীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। তারা ভেবেছিল বিশ্বজিত্ই বোমা নিক্ষেপ করেছেন। এটা ভেবে তারা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। বাঁচার জন্য তিনি বেশ কয়েকবার হাত জোড় করে নিজের পরিচয় দিয়ে প্রাণরক্ষার বেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু হামলাকারীরা তার আবেদন নিবেদনে সাড়া দেয়নি। তাদের সামনেই তরতাজা যুবকটির জীবন প্রদীপ নিভে গেল। এই দৃশ্য দেখে প্রত্যক্ষদর্শীরা হতভম্ব হয়ে পড়ে। খবর পেয়ে লক্ষ্মীবাজারের বাসা থেকে ভাই-ভাবীসহ স্বজনরা ছুটে যান ঘটনাস্থলে। রক্তাক্ত অবস্থায় বিশ্বজিেক নিয়ে যান মিটফোর্ড হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিত্সক বিশ্বজিেক মৃত বলে ঘোষণা করেন। লাশ ময়না তদন্তের জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। মর্গে বিশ্বজিতের লাশ জড়িয়ে ধরে ভাই উত্তম দাস, ভাবী, মামী ও ফুফুরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা জানান, শাখারী বাজারে ‘নিউ আমন্ত্রণ’ টেইলার্সটি পরিচালনা করে আসছিলেন বিশ্বজিত্। তিনি কখনো কোনও রাজনৈতিক দলকে সমর্থন কিংবা কারো কর্মী ছিল না। পরিবারের সদস্যদের আহার যোগাড়ে তিনি ব্যস্ত থাকতেন প্রতিদিন। তার পিতা অনন্ত দাস ও বৃদ্ধা মা শরীয়তপুর জেলার নরিয়া উপজেলার মশুরা গ্রামের বাড়িতে থাকেন। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে বিশ্বজিত্ সবার ছোট। বড় ভাই উত্তম দাস লক্ষ্মীবাজারে ‘অতিথি’ টেইলার্সের মালিক। বড় ভাইয়ের লক্ষ্মীবাজারের বাসাতেই থাকতেন বিশ্বজিত্। প্রতি মাসে গ্রামে টাকা পাঠাতেন। তার উপার্জনের টাকাতেই বামা-মায়ের মুখে ভাত উঠতো। সেই বিশ্বজিত্ আর নেই। তার অনুপস্থিতিতে কিভাবে জীবন চলবে ভাবতে পারছেন না সন্তানহারা মা-বাবা।
উপ-পুলিশ কমিশনার (ওয়ারী জোন) মোজাম্মেল হক বলেন, বিশ্বজিত্ দাসের হত্যাকান্ডের ঘটনায় থানা এখনও মামলা হয়নি। জড়িত যেই হোক, তাদের গ্রেফতার করা হবে বলে তিনি জানান। অপরদিকে, ছাত্রলীগ দাবি করেছে, তাদের সংগঠনের ব্যানারের আড়ালে ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরাই বিশ্বজিেক হত্যা করেছে। ছাত্রলীগের এই দাবি সত্য হোক আর মিথ্যা হোক, বিশ্বজিত্ আর ফিরে আসবে না, কিংবা সন্তানহারা বাবা-মা এক বিন্দু সান্ত্বনাও পাবেন না!
