মুক্তিযুদ্ধের সময় দৈনিক ইত্তেফাককে সরকারের নির্দেশ মেনে সংবাদ প্রকাশ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। সেই অবরুদ্ধ ও কণ্ঠরোধ করা দিনগুলোতেও কিছু ব্যক্তি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সতর্কতার সঙ্গে সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন এমন একজন সাংবাদিক যিনি সুকৌশলে, নির্ভীকভাবে সরকারের নানা দিক উন্মোচন করেছেন। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সরকারি প্রচারণার জবাব দিয়েছিলেন সাংবাদিকের ভাষায়। লিখেছিলেন ‘ঠগ বাছিতে গাঁ উজাড়’, ‘অধুনা রাজনীতির এক অধ্যায়’, ‘নেতা জনতা ও পাঠক’ শিরোনামে বেশকিছু লেখা। এ লেখায় তিনি বলেছিলেন যে, আওয়ামী লীগ নয়, দেশের পরিস্থিতির জন্য দায়ী ইয়াহিয়া খানের পদলেহন করা রাজনৈতিক দলগুলো।
১০ ডিসেম্বর ১৯৭১। রাত প্রায় তিনটা। ৫ চামেলীবাগ, শান্তিনগর, ঢাকা। দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেনের বাসা। সেই গভীর রাতে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়। বাড়িওয়ালা ডা. শামসুল হুদার কণ্ঠস্বর শোনা গেল ‘শাহীন দরজা খোল’। সিরাজুদ্দীন হোসেনের মেজ ছেলে শাহীন রেজা নূর দরজা খুলে দেন। দরজা খুলতেই চোখে পড়ে শামসুল হুদা ও তার দুই ছেলে বন্দুকের নলের মুখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তাদের পেছনে সশস্ত্র বেশ কয়েকজন ব্যক্তি। কেউ কিছু না বললেও তাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না এরা কেন এসেছে। সিরাজুদ্দীন হোসেন লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরে ছিলেন। ঘরের গামছা দিয়ে চোখ বাঁধা হলো তার। তাকে নিয়ে যাবার সময় স্ত্রী নূরজাহান সিরাজী ডুকরে কেঁদে ওঠেন। সেই যে গেলেন আর ফিরে আসেননি। লাশও পাওয়া যায়নি এই শহীদ সাংবাদিকের। পাকবাহিনীর দোসর আল বদর বাহিনীর সদস্যদের সিরাজুদ্দীন হোসেনকে ধরে নিয়ে যাবার মধ্য দিয়েই শুরু করে ঘৃণ্য এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বুদ্ধিজীবী হত্যা। এদিন রাতে পিপিআই-এর চিফ রিপোর্টার সৈয়দ নাজমুল হককেও তার বাসভবন থেকে অপহরণ করা হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাকিস্তান ও তাদের দোসর রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা চালাচ্ছিল। এতদিনে তারা বুঝে গেছে, এ যুদ্ধে জেতার সম্ভাবনা একদমই নেই। এ সময় তারা দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সপ্তাহ খানেকের বেশি সময় ধরে চলছিল এই তালিকা তৈরির কাজ। দেশের শিক্ষিত শ্রেণী অর্থাত্ শিক্ষক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চিকিত্সক, আইনজীবীদের রাখা হচ্ছিল এ তালিকায়।
একাত্তরের এইদিনে খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে দায়িত্ব পালন করছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমীন। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের মুখে মৃত্যুকে তোয়াক্কা না করে প্রতিরোধ গড়ে শহীদ হন এই যোদ্ধা।
