মেহেদী হাসান গালিব
বেশ কয়েকদিন থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চোখে পড়ছিল আলপনা গ্রামের কথা। যেখানে নাকি গ্রামবাসীরা তাঁদের মাটির বাড়ির দেওয়ালকে পরিণত করেছেন নিজেদের কল্পনার ক্যানভাসে। গ্রামবাসীরা সেই ক্যানভাসের বুকে রঙ আর তুলির আঁচড়ে আঁকছেন নানা নকশা ও জীবনের গল্প। একটা সময় রঙ-তুলির ব্যবহার বলতে আমরা কেবল চারুকলার শিক্ষার্থীদের রঙ-তুলি বুঝতাম। পাশাপাশি যাঁরা শখের বশে ছবি আঁকতেন তাঁদের নাম স্থান পেত সেই তালিকায়। কিন্তু বর্তমানে রঙ-তুলির ব্যবহার চারুকলার শিক্ষার্থী ও শখের আঁকিয়েদের হাত থেকে ছড়িয়ে পড়েছে আপামর বাঙালির হাতে। এখন উত্সব মানেই আমরা এক হাতে রঙ, আর অন্য হাতে তুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি সবকিছু রাঙিয়ে দিতে। এইতো কয়েকদিন আগে পালিত হয়ে যাওয়া বাংলা নববর্ষের কথাই বলা যাক। বাড়ির উঠোন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, এমনকি পিচঢালা রাস্তা কোনোকিছুই যেন রেহাই পায়নি রঙের ছোঁয়া থেকে।
শিল্প-সংস্কৃতি ও উত্সবকে কেন্দ্র করে বাঙালি মনে এই উচ্ছ্বাসটুকু বেঁচে আছে বলেই হয়তো আমাদের বেঁচে থাকা এতটা আনন্দের। কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের পাল্লাটা কী সবখানেই সমান? আর্থসামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে এখানেও দেখা মেলে পার্থক্য। শহরের তুলনায় গ্রামে যেন এসব উত্সব কিংবা বাঙালিয়ানার উচ্ছ্বাস খুব একটা আবেদনের ছাপ ফেলতে পারে না গ্রামবাসীদের মাঝে। ফেলবেই বা কী করে, দু-বেলা দু-মুঠো খাবার জোগানোর জন্য যাদের নিত্যদিনের সংগ্রাম তাঁদের কাছে বেঁচে থাকাটা যে ছোট্ট একটা বৃত্তের মাঝে বন্দি। কিন্তু আলপনা গ্রামে নাকি দেখা মেলে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক চিত্রের।
তাই তো আলপনা গ্রামের কথা শুনতেই ভেতরে জন্ম নিয়েছিল এক কৌতুহল। তখন থেকেই মনটা উসখুস করছিল! কবে নিজ চোখে দেখতে পারবো মাটির দেয়ালে আঁকা গ্রামবাসীর নিজেদের গল্প। অতঃপর সিদ্ধান্ত নিলাম, পরীক্ষা শেষ হলেই দৌড় দেবো আলপনা গ্রামের উদ্দেশ্যে।
যথারীতি শেষ হলো পরীক্ষা। আর আমিও পেয়ে গেলাম দু’জন বন্ধু ও দু’জন বড় ভাইয়াকে, যারা কি-না আমার মতোই উত্সুক হয়ে অপেক্ষা করছিলেন আলপনা গ্রামে পা ফেলার জন্য। তাহলে আর দেরি কিসের? সকাল সকাল ৫ জন মিলে বেড়িয়ে পড়লাম আলপনা গ্রামের উদ্দেশ্যে। রাজশাহী শহরের রেলগেট থেকে সবাই উঠে পড়লাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটা বাসে। গন্তব্যস্থল চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডাইংপাড়া। প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট পর বাস আমাদের নামিয়ে দিলো ডাইংপাড়ায়। সেখান থেকে লেগুনায় করে আমরা রওনা দিলাম আমনুরার উদ্দেশ্যে। ডাইংপাড়া থেকে প্রায় আধাঘণ্টা পর আমরা পৌঁছে গেলাম আমনুরায়। কিন্তু এবার বাঁধলো বিপত্তি! যাকেই জিজ্ঞেস করি সে-ই মাথা চুলকে জবাব দেয়, ‘এ আবার কোন গ্রাম? নাম শুনিনি তো আগে।’ তখন নিজেকে শুধরে নিয়ে বললাম, ‘টিকোইল চেনেন?’ তখনও সবার মুখে একই অভিব্যক্তি।
উল্লেখ্য, আলপনা গ্রামের আসল নাম হলো টিকোইল। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রামটিকে নিয়ে এত কথা হলেও মাত্র ২০ মিনিট অটোপথ দূরত্বে অবস্থিত আমনুরার তেমন কেউই জানেন না গ্রামটির সঠিক অবস্থান। বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করার পরও যখন গ্রামটির সঠিক অবস্থান পাওয়া গেল না তখন খানিকটা বিরক্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম হাট বাকইল পর্যন্তই আগে যাওয়া যাক। আমনুরা থেকে অটোতে করে হাট বাকইল যেতে সময় লাগলো প্রায় ১৫ মিনিটের মতো। এরপর অবশেষে পথচারীদের জিজ্ঞেস করে পাওয়া গেল টিকোইলের অবস্থান। অতঃপর মিনিট পাঁচেক পর আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের বহুল আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্যস্থল টিকোইলে।
টিকোইলের অধিকাংশ গ্রামবাসীই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তাঁদের প্রত্যেকের বাড়ির কোনো না কোনো অংশে আলপনা আঁকা। তবে কিছু মুসলিম পরিবারও বাস করেন এখানে। মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা বাড়ির দেওয়ালে আলপনা না করলেও বাড়ির সৌন্দর্যে তারা বেশ সচেতন।
গ্রামটিতে ঢুকতেই আরেকটি যে বিষয় চোখে পড়ল, তা হলো গুটিকয়েক মাটির তৈরি দোতলা ঘর। কী সুন্দর দেখতে প্রতিটি ঘর। চাল ও বিভিন্ন শস্য রাখার পাশাপাশি শোবার ঘর হিসেবেও ব্যবহার করা হয় এসব দোতলা ঘরকে। খানিকক্ষণ পর চোখে পড়ল, প্রতিটি বাড়ির বাইরের দেয়ালের গা ঘেঁষে ঝোলানো রয়েছে মাটির হাঁড়ি। প্রথমে ভেবেছিলাম বৃষ্টির পানি জমানোর জন্য কিংবা সে পানি যাতে নিচে না পড়ে সেজন্য এই ব্যবস্থা। কিন্তু ভুল ভাঙলো যখন দেখলাম হুট করেই সেসব মাটির হাঁড়ি থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতর উড়ে দখল করে ফেললো টিকাইলের পুরো আকাশ। কী চমত্কার সে দৃশ্য!
বাড়ি বাড়ি আলপনা দেখতে গিয়ে পরিচয় হলো ধীরেন বর্মণের সঙ্গে। ভদ্রলোক গোসল করার জন্য বের হচ্ছিলেন। আমাদের দেখে থমকে দাঁড়ালেন। এরপর হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আলপনা দেখতে এসেছেন বুঝি?’ আমরা হ্যাঁসূচক মাথা নাড়লাম। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম, তিনি একজন কীর্তনশিল্পী। আগে যাত্রাপালা করতেন। এখন দলবেঁধে দেশের আনাচে-কানাচে কীর্তন গান। আমরা ছবি তুলতে চাইলে ধীরেনদা লাজুক হেসে বললেন, ‘একটু দাঁড়ান, কীর্তনের পোশাকটা পরে আসি।’ তিনি ঘরের ভেতরে গিয়ে কীর্তনের পোশাক পরে আসেন। ছবি তোলা শেষে আমরা পা বাড়ালাম অন্য বাড়ির উদ্দেশ্যে। ঠিক তখনই ধীরেনদা ডেকে বললেন, ‘দাদারা, দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা হয়েছে তো? আপনারা চাইলে আমার এখানে দু-মুঠো খেতে পারেন।’ অনাকাঙ্ক্ষিত এই আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমরা সকলেই। কিন্তু খানিকটা অপ্রস্তুতও হলাম বটে। ধীরেনদার সঙ্গে হাসি বিনিময় করে হাঁটা ধরলাম অন্য বাড়ির উদ্দেশ্যে।
শুধু ধীরেনদা নন, গ্রামের প্রত্যেকের ব্যবহার বেশ আন্তরিক ও বন্ধুসুলভ। তাঁদের ব্যবহার যেন তাঁদের বাড়ির দেওয়ালে আঁকা আলপনার মতোই সুন্দর। ঘুরতে ঘুরতে হঠাত্ করেই আমরা পেয়ে গেলাম ৯ থেকে ১২ বছরের একঝাঁক কিশোরের দল। তারাই পরবর্তীতে আমাদের ট্যুরিস্ট গাইডের ভূমিকা পালন করলো। কোন বাড়িতে আলপনা বেশি, কোন বাড়িতে আলপনা কম সব বর্ণনা করে দেখিয়ে দিতে লাগলো আমাদের।
শুধুমাত্র হিন্দু বাড়িতে আলপনা দেখে অনেকেই মনে করতে পারেন, এটি হয়তো তাদের ধর্মীয় কোনো উত্সব। কিন্তু না, স্থানীয় বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, এই আলপনার চর্চাটা একান্তই নিজেদের ভালোলাগা, নিজেদের বাসস্থানের সৌন্দর্য সচেতনতা থেকে করা। তবে হ্যাঁ, এসব আলপনা করা হয় মূলত পূজা-পার্বণের সময়েই। গ্রামের বধূরা সংসারের নিত্য-নৈমিত্তিক কাজের ফাঁকে রঙ-তুলি নিয়ে বসে পড়েন আলপনা আঁকতে। মাটির বুকে রঙের আঁচড় বসিয়ে একের পর এক ফুটিয়ে তুলতে থাকেন বিভিন্ন নকশা। নকশার পাশাপাশি বিভিন্ন দেওয়ালে স্থান পেয়েছে বেশকিছু জীবজন্তু, ঈশপের গল্পের বিভিন্ন খণ্ডচিত্র এমনকি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বৃহদাকার ডাইনোসরও।
আলপনা গ্রামের পুরোটা ঘুরে শেষ করতে আমাদের সময় লাগলো প্রায় পৌনে ১ ঘণ্টার মতো। এবার ফেরার পালা। কিন্তু আমাদের গাইডদের দিকে তাকিয়ে দেখি তাঁদের সকলের মন খারাপ। তাঁরা বারবার করে বলছে, ‘এরপর আবার আসবেন কিন্তু। এরপরের বার এলে অনেকগুলো চকোলেট নিয়ে আসবেন।’ আমরা হ্যাঁসূচক মাথা নেড়ে তাঁদের আশ্বস্ত করলাম। কিন্তু আবার কবে এই অজপাড়াগাঁয়ে পা পড়বে তা কে জানে? ততদিন যে তাঁদের অপেক্ষা করানোটা মোটেই ভালো হবে না। তাই গ্রামেরই একটি দোকান থেকে চকোলেট কিনে গুঁজে দিলাম তাদের হাতের মুঠোয়। তারা একগাল হেসে চকোলেট মুখে পুড়ে দৌড়াতে লাগলো আমাদের অটোর পেছন পেছন। কিছুদূর আসার পর মায়েদের বকুনিতে থেমে গেল সকলেই।
অটো যখন আমাদের আমনুরা জংশনে নামিয়ে দিলো, ঠিক তখনই দূরের বাঁকে দৃশ্যমান হলো ট্রেনের ইঞ্জিন। তড়িঘড়ি করে টিকেট কেটে আমরা উঠে পড়লাম ট্রেনে। আর এগিয়ে চললাম ফিরে যাওয়ার পথে।
সতর্কতা:
n সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর থেকে অনেকেই বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছেন টিকোইল গ্রামে। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো, টিকোইলের বাড়িগুলো মোটেই কোনো দর্শনীয় স্থান নয়, বরং এটি মানুষের বাসস্থান। তাই ঘুরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই এমন বন্ধু নিয়ে যাবেন না, যাতে করে তারা বিরক্তবোধ করেন।
n মনোমুগ্ধকর সব আলপনা দেখামাত্রই ছবি তোলা শুরু করে দেবেন না। ছবি তোলার আগে অবশ্যই গৃহকর্তার অনুমতি নিয়ে নেবেন।
n পরিশেষে, পরিবেশ দূষণ করতে পারে এমন কোনো বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে সৌন্দর্য নষ্ট করবেন না।
