যুদ্ধদিনের কথা

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৭
রেসকোর্সের ভাষণ শুনে বাসায় ফিরে দেখি বাবা ভয়ে কাঁপছেন। ঘরের ভেতরে তাঁর অস্থির পদচারণা। ছুটে এসে আমাকে বুকে টেনে নিলেন। হাত-পা পরখ করে সবখানে দেখে নিয়ে বললেন, আলহাম-দুল্লািহ! সুস্থ শরীরে ফিরে এসেছিস, কোনো গণ্ডগোল, গোলাগুলি হয়নি রে? না বাবা—আমরা তো গণ্ডগোল করতে যাইনি। বঙ্গবন্ধুর পথ নির্দেশনা আনতে গেছি—‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। শোনো বাবা, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত খুলবে না আমাদের স্বাধীনতা না আসা পর্যন্ত। চলো আমরা গাইবান্ধা চলে যাই মায়ের কাছে। আমার কলেজ, বাবার অফিস সীমাহীন সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ১২ মার্চ গাইবান্ধা চলে এলাম। মা-ভাই-বোন তখন গাইবান্ধায় থাকতেন। চলে আসার সময়ে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী কলেজের বান্ধবীদের জন্যে মনটা ব্যাকুল হয়েছিল। গাইবান্ধা—আমার আজন্ম ভূমিতে ফিরে এলে স্ব-উদ্যমে শুরু হল স্বাধীনতা আন্দোলনের কার্যক্রম। শহরের বিভিন্ন জনপথের দেয়ালে পত্রিকা লাগানো— মিটিং-মিছিল করতে করতে ২৫ মার্চ রাত ভোর হয়ে সকাল হল। জানলাম না—কী হয়ে গেল ঢাকা শহরে। বুঝতে পারলাম ২৬ মার্চ সকালে। ২৭ মার্চ ১৯৭১ সন্ধ্যায় বেতারে জানতে পারলাম হানাদার পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনীর বাঙালি-নিধন খেলা আর প্রতিবাদে বাঙালির সশস্ত্র স্বাধীনতা ঘোষণার কথা। পরদিন রোমেলাদের বাড়ির বাঁশের ঝাড় সাফ করে ফেললাম সবাই মিলে বাঁশের লাঠি আর গরম পানি পিচকারি বানানোর জন্য— হানাদার প্রতিহত করা আর মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং প্রস্তুতির জন্য। বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রতি সন্ধ্যায় নির্দেশ পাচ্ছি। আর পরদিন কার্যকর করার আপ্রাণ চেষ্টায় লেগে যাচ্ছি। এপ্রিলের ১৮ তারিখে আমাদের শহরের পতন হল। ছালুয়া বোয়ালী এসব গ্রামে কিছুদিন শঙ্কিত জীবনধারণের পর ফিরে এলাম নিজভূমে। শহরের মাঝখানে বাসা। মে মাসের শেষের দিকে হানাদার বাহিনী সেই বাড়ি আক্রান্ত হওয়ার পর আবার শুরু হল শরণার্থী জীবনযাপন। জুন মাসের ২ তারিখে বর্ষার ভয়াল যমুনা নদী নৌকায় পাড়ি দিয়ে বিপদ-সংকুল পথ অতিক্রম করে ঢাকা এলাম পুরো পরিবারসহ। ঢাকায় কয়েক দিন থাকার পর চলে গেলাম গ্রামের বাড়ি আড়াইহাজার থানায়। বর্ষার পর আগস্ট মাসে আমাদের থানার পতন হল মিলিটারির হাতে। ইলিয়াস আমাদের গ্রামের ভারত থেকে যুদ্ধবিদ্যার প্রথম ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছেলে। মধ্য সেপ্টেম্বরে আব্দুল লতিফ, ইলিয়াস, শামসুদ্দিন, বরুণ—এদের তত্ত্বাবধানে শুরু হল আমাদের সম্মুখযুদ্ধের ট্রেনিংগ্রহণ। এগারো জন ছেলে, আমি আর শিউলি দুইজন মেয়ে। কোনো শৃঙ্খলাবদ্ধ ট্রেনিং ছিল না। যেদিন ওরা আসত, অবসর পেত—সেদিন ট্রেনিং হত। এর আগে অবশ্য ১৪ মার্চ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত গাইবান্ধায় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ট্রেনিং নেয়া ছিল আমার। ক্রলিং আর গ্রেনেড নিক্ষেপ এতটুকু ট্রেনিং নিতে না নিতেই নভেম্বর মাসে খবর এল আরও কয়েক জিপবোঝাই মিলিটারি আসছে আড়াইহাজার থানায়। আমাদের সিদ্ধান্ত— এদের থানায় যেতে দেয়া হবে না। কালিবাড়ির পর বিনারচর গ্রামে ঢোকার ভাঙ্গা ব্রিজের মুখেই তাদের আক্রমণ করা হবে। বাঙ্কার করা হল ভোররাত থাকতে। ভোর থেকে বাঙ্কারের ভেতর ওত পেতে বসে আছি। আমার কাছে ছিল তাজা দুটি হ্যান্ড গ্রেনেড। কমান্ডারের নির্দেশ ছিল—নির্দেশ পেলে অথবা বেশি বেগতিক দেখলেই ছুড়তে—নচেত্ নয়। আমার মানসিক প্রস্তুতি ছিল। ব্রিজে শত্রুর গাড়ি উঠামাত্র আল্লাহর নাম করে ছুড়ে দেব। কিন্তু মিলিটারিদের সংখ্যার বিপুলতা আর কালিবাড়িতে ওদের ধ্বংসের তাণ্ডব দেখে লতিফ দাদা দ্রুত এসে আমাদের গ্রামের ভেতর সরিয়ে নিয়ে গেলেন। সবাইকে নিয়েছিলেন কি না সেই মুহূর্তে জানতে পারিনি। সরিয়ে নিয়ে আসার সময়েই লতিফ দাদা হাত থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন গ্রেনেডের থলিটি। সকাল সাড়ে নয়টা থেকে প্রায় এগারোটা পর্যন্ত চলল প্রচণ্ড আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ। মুক্তিযুদ্ধের ছেলেদের বাধ্য হয়ে নদী পার হয়ে চলে গিয়ে থাকতে হল চরপাড়া গ্রামে—নিরাপদ স্থানে। তবে একদিনের এই যুদ্ধে শহীদ হয়ে গেল আমার গ্রাম থেকে তিনটি তাজা প্রাণ—মনুচাচা, আবু মৃধা, দুলাল। নভেম্বরের ২৫ তারিখে মুক্তিবাহিনী আমাদের থানায় পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণ করল। তারা তিন নম্বর সেক্টরের যোদ্ধা—কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিক থেকে এসেছে। তারা গ্রামের ভেতর দিয়ে পায়ে হেঁটে কাঁধে অস্ত্র বয়ে নিয়ে এসেছে। আমাদের থানার মুক্তিযোদ্ধারাও যোগ দিল ওদের সাথে। দুই রাত দুই দিন চলছে গোলাগুলি। ভোররাতে আমাদের থানা হানাদার মুক্ত হলো। আমি অবশ্য রাতের অপারেশনে থাকতাম না। গ্রাম থেকে থানার দূরত্ব দেড় মাইলের কিছু বেশি। সকালে ছুটে চললাম থানার দিকে। হানাদার বাহিনীর থানা পাহারায় থাকা অবশিষ্ট ১১ জন মারা পড়েছে। দুই জনকে জীবন্ত ধরা হয়েছে। আমাদের সহযোদ্ধা কটু দাদা একাই চেলাকাঠ দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে একজনকে। থানার বিল্ডিংয়ের পাশে জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল সে। সব শান্ত হওয়ার পর জীবন্ত দুটোকে গ্রামের পথ দিয়ে হাটিয়ে নিয়ে যাওয়া হল ঢাকার উদ্দেশ্যে। গ্রামে ছেলেরা কেউ ঢিল ছোড়ে, কেউ হাতের কঞ্চি দিয়ে লাগিয়ে দেয় দু’ঘা। যে ১১ জন মারা পড়েছে— মুক্তিযোদ্ধা ছেলেরা তাদের হানাদার বাহিনীর তৈরি বাংকারে ফেলে মাটি চাপা দিয়েছে। হানাদার বাহিনী এতো কাল যেমন মাটি চাপা দিয়েছে বাঙালি নিধন করে। থানা মুক্ত হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সাধারণ গ্রামবাসিও ছুটলো মুক্ত থানা দেখতে। আমরা একটা জিনিস দেখে অবাক হয়েছি কিছুটা—থানায় হানাদার বাহিনীর তাক করে রাখা কামানগুলো আসলে কলাগাছ! তাদের ভান্ডারে কোন কামানই ছিল না—কলাগাছে কালো কাপড় প্যাঁচিয়ে কামানের মতো করে তাক করে রেখেছিল। তাই দেখে আমরা কিছুটা প্রথম আক্রমণের সময়ে ঘাবরে গিয়েছিলাম । আমাদের থানা মুক্ত হলো। আমরা এখন মুক্ত অঞ্চলের মানুষ। এখন হানাদার বাহিনী যে কোন মুহূর্তে আত্মসমপর্ণ করতে বাধ্য হবে। প্রতি মুহূর্তে কাটছে আমাদের প্রচণ্ড উত্তেজনায় রেডিওয়ের কাছে। গ্রামের মানুষ অনেকেই রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঠের-ঠের-ঠের-ঠের গুরুম গুরুম শব্দে গ্রামের মানুষ জেগে উঠলো। প্রাণ কাঁপানো গুলির শব্দ আর কানে তালা লাগানো চিত্কার— জয় বাংলা, জ-য়....। আব্বা বললেন, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। আনন্দ উত্তেজনায় সারা রাতের পর ভোরের দিকে ঘুমাতে গেলাম। ঘুম ভাঙ্গলো স্বাধীন দেশে। বুক ভরে স্বাধীন বাংলাদেশে নিঃশ্বাস নিলাম। লেখক :আইনজীবী