ঘন কুয়াশার কবলেফেরি ও লঞ্চ, চলাচলে বিঘ্ন

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৮
অব্যাহত ঘন কুয়াশায় পদ্মা-যমুনার আরিচা সেক্টরের দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুট এবং পদ্মায় মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে বরিবার-সোমবারও ফেরি সার্ভিস মারাত্মক ব্যাহত হয়েছে। গত কদিন দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে পড়ছে তীব্র ঘন কুয়াশা। সারাদিনের কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ রাতে আরো ঘন ও গাঢ় হয়ে উঠছে। স্বাভাবিক প্রাকৃতিক কারণেই স্থলভাগের চাইতে নদীপথে কুয়াশার ঘনত্ব তীব্রতা ও স্থায়িত্ব অনেক বেশি হয়ে থাকে। পদ্মা-যমুনার বিশাল বিস্তৃত বুকে ব্যতিক্রমহীনভাবে কুয়াশার প্রগাঢ় আচরণ ঢেকে দিচ্ছে নদীপথ। আর এরই কবলে পড়ে বিপর্যস্ত লঞ্চ ফেরিসহ পুরো নৌ-চলাচল ব্যবস্থা আগেরদিন শনিবারের পর রবিবার রাতেও ঘন কুয়াশার একই প্রতিবন্ধকের সামনে মাওয়া-কাওড়াকান্দি এবং দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে ১২ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে। রবিবার রাত ১০টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল ১০টা পর্যন্ত এই অচলাবস্থা বিস্তৃত হয়। ফেরিঘাটে সৃষ্টি হয় কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট। সীমাহীন দুর্ভোগ-যাতনার শিকার হন সড়কপথের হাজারো নারী-শিশু-পুরুষ যাত্রী। কুয়াশাচ্ছন্ন তীব্র অন্ধকার রাতে এমনকি দিনের প্রথমদিকেও ফেরি মাস্টাররা খুবই ঝুঁকি নিয়ে ফেরি চালাচ্ছেন। বাধ্য হয়েই নদীর মাঝপথে নোঙ্গর ফেলে ঠাঁয় দাঁড় করিয়ে রাখছেন বহু যানবাহন ও হাজারো যাত্রী বোঝাই ফেরি ও লঞ্চ। দিনের বাকী সময় চলছে খুবই সতর্ক-সাবধানতার সাথে। গোয়ালন্দ সংবাদদাতা আব্দুল আউয়াল জানান, ঘন কুয়াশার কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাথে রাজধানীর সড়ক যোগাযোগ পথে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুটে রবিবার রাত সাড়ে দশটা থেকে গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে দশটা পর্যন্ত প্রায় ১২ ঘণ্টা ফেরি ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল। এ সময় কয়েকশ যানবাহন নদী পাড়ি দিতে না পারায় দুই প্রান্তে চার কিলোমিটারের উপর যানজট দেখা দেয়। শত শত যাত্রী দুর্ভোগের শিকার হন। বিআইডব্লিউটিসি সূত্র ও সরেজমিনে জানা গেছে, রবিবার সন্ধ্যার পর থেকে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে কুয়াশা পড়তে থাকলে তার মধ্যেই ঝুঁকি নিয়ে মাস্টারগণ ফেরি চালান। রাত দশটার পর কুয়াশার মাত্রা আরো বেড়ে গেলে সাড়ে দশটার পর ফেরি ও লঞ্চ চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এসময় দৌলতদিয়া ঘাটে দুটি, পাটুরিয়ায় আটটি ও মাঝনদীতে একটি ফেরি যাত্রীসহ নোঙ্গর করে থাকতে বাধ্য হয়। উভয় পাড়ে আটকা পড়ে কয়েক’শ দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসসহ পণ্যবাহী গাড়ি। এ সময় শীত ও কুয়াশায় শত শত যাত্রী ও চালক চরম দুর্ভোগের শিকার হন। গতকাল সোমবার সকাল দশটার পর কুয়াশার মাত্রা কমে আসলে সাড়ে দশটা থেকে পুনরায় ফেরি চলাচল শুরু হয়। গতকাল সকালে দৌলতদিয়া ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঘাট থেকে ৪ কিলোমিটারের উপর লম্বা তিন/চার সারি যানবাহনের দীর্ঘ জট। সাত শতাধিক গাড়ি আটকে থাকতে দেখা যায়। সাতক্ষীরা থেকে ছেড়ে আসা বলাকা বাস চালক আব্দুল জলিল বলেন, রবিবার দশটার দিকে বাস নিয়ে দৌলতদিয়ায় এসে আটকা পড়ি। সোমবার সকাল এগারোটা পর্যন্ত ঘাটেই বসে আছি। বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া অফিসের ম্যানেজার খন্দকার মোহাম্মদ তানভির আহাম্মেদ জানান, ঘন কুয়াশাজনিত কারণে ফেরি চলাচল প্রায় ১২ ঘণ্টা বন্ধ থাকায় যানবাহনের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঘন কুয়াশার কারণে মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে ১২ ঘন্টা ফেরি সার্ভিস বন্ধ ছিল। রবিবার রাত ১০টা থেকে সোমবার সকাল ১০টা পর্যন্ত সার্ভিস বন্ধ থাকায় উভয় পাড়ে যানজট সৃষ্টি হয়েছে। কনকনে শীতের মধ্যে মাঝ পদ্মায় আটকা পড়ে রো রো ফেরি ‘বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন’ ও ‘লেন্টিন’। কনকনে শীতের মধ্যে চরম দুর্ভোগে পড়ে শত শত যাত্রী। ১০টা ফেরি মাওয়া কাওড়াকান্দি ঘাটে নোঙ্গর করে থাকে। বিআইডবি¬উটিসির ম্যানেজার সিরাজুল হক সোমবার সকালে জানান, কুয়াশার তীব্রতা এত বেশি যে কাছের কিছুও দেখা যাচ্ছে না। দুর্ঘটনা এড়াতে ফেরি পদ্মায় নোঙ্গর করতে বাধ্য হচ্ছে। তবে ফেরিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। পুরোপুরি কুয়াশা না কাটায় ফেরি চলছে ধীরগতিতে। ১২ ঘন্টা ফেরি সার্ভিস বন্ধ থাকায় উভয় পাড়ে আটকা পড়েছে নাইটকোচসহ শত শত যানবাহন। এছাড়া মুন্সীগঞ্জের পদ্মা, মেঘনা ও ধলেশ্বরী নদীতে ১০টি বড় যাত্রীবাহী লঞ্চসহ অন্তত ২’শ নৌযান ঘন কুয়াশায় আটকা পড়ে। ঢাকায় আবহাওয়া অফিস জানায়, আরও দুই থেকে তিনদিন মাঝারি থেকে ভারি কুয়াশা অব্যাহত থাকতে পারে। তারপর একদফা হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই তাপমাত্রা কমতে থাকবে। তবে যদি বৃষ্টি না হয় তাহলে তাপমাত্রা দ্রুত নামার সম্ভাবনা কম। কী জন্য এতো ভারি কুয়াশা হচ্ছে সে প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়াবিদ জানান, এখন বাতাসের গতিবেগ কম, জলীয়বাষ্প বেশি। সেজন্য কুয়াশা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। উত্তরদিক প্রবাহিত শীতল বায়ু পরিস্থিতি নাজুক করে তুলছে। বরিশাল অফিস থেকে লিটন বাশার জানান, রবিবার রাতে ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকা-বরিশালসহ বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী লঞ্চ ও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। দক্ষিণাঞ্চলের উদ্দেশে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাত্রীবাহী নৌযানগুলো নির্ধারিত সময়ের ১১/১২ ঘন্টা পরে গন্তব্যে পৌছেছে। যাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে এ বছর এই প্রথম ঘন কুয়াশায় নৌ-যান চলাচল ব্যাহাত হওয়ার কথা জানিয়ে লঞ্চ চালকরা বলেন , রাত ১০ টার পরই কুয়াশার ঘনত্ব বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নৌযান গুলো মেঘনার চাঁদপুর ও শরীয়তপুর অঞ্চলে নোঙ্গর করে রাখা হয়। রবিবার সন্ধ্যায় ঢাকার সদরঘাট থেকে যাত্রী নিয়ে বরিশালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় সুরভী-৭, কীর্তণখোলা ও পারাবাত কোম্পানির দু’টি লঞ্চ। ঝালকাঠীর উদ্দেশে রওয়ানা হয় সুন্দরবন-২ লঞ্চটি। এ রকম আরো ৩৮ টি রুটে যাত্রী নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার পর লঞ্চগুলো চাদপুর অতিক্রম করার পরই কুয়াশার কবলে আটকে পড়ে। রাত সাড়ে ৮টায় ছেড়ে আসা লঞ্চ গুলো চাঁদপুরের আগেই আটকা পরে। সুরভী -৭ লঞ্চের সুপারভাইজার সফিকুর রহমান জানান, তারা বুড়িগঙ্গা পার হওয়ার পরই কুয়াশায় আটকা পড়েছিলেন। সেখান থেকে গতকাল সকাল সাড়ে ৭ টায় বরিশালের উদ্দেশে রওয়ানা রওয়ানা হন। ঘাটে পৌঁছেছে বিকাল ৩ টায়। একইভাবে পারাবাত ও কীর্তণখোলা বিকাল ৩ থেকে ৪ টার মধ্যে বরিশালের ঘাটে পৌছে। ঝালকাঠীগামী সুন্দরবন-২ বরিশালের ঘাটে পৌছে বিকাল ৫ টায়। এ লঞ্চটি সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় ঢাকা সদরঘাট থেকে ছেড়ে এসে শরীয়তপুরে ১০ ঘন্টা নোঙ্গর করেছিল। ঐ লঞ্চটি গতকাল সন্ধ্যা ৬ টায় ঝালকাঠী পৌছার কথা রয়েছে। গতকাল সাড়ে ৬ টায় লঞ্চটির যাত্রী নিয়ে ঢাকা যাওয়ার কথা থাকলেও কুয়াশা কারণে ঢাকায় যাবে না বলে জানিয়েছে সুন্দরবন নেভিগেশনের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু। এ ভাবে কিছু লঞ্চের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। লঞ্চচালক ও যাত্রীরা জানান, রবিবার রাত ১০টা থেকে ঘন-কুয়াশা পড়তে শুরু করে। রাত যত বাড়তে থাকে কুয়াশার ঘনত্ব ততই তীব্র হয়ে উঠে। প্রতি বছর শীত মৌসুমে নৌ-যাত্রীদের এ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সাধারণত জানুয়ারি মাসে এ রকম কুয়াশা পরে। এ বছর ডিসেম্বরের শুরুতেই কুয়াশার কারনে রাত ১১টার পর দক্ষিণাঞ্চলের ২৩টি ফেরিঘাটে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী নৌযান মেঘনায় নোঙ্গর করে রাখা হয়েছিলো। জাতীয় সংবাদপত্র বহনকারী গাড়িগুলো পৌছেছে নির্ধারিত সময়ের ৮/৯ ঘন্টা পর। দুপুরের পর জাতীয় পত্রিকা বরিশালে পৌছার কারণে তা দক্ষিনাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সরবারহ করা সম্ভব হয়নি।