ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যানের স্কাইপি সংলাপ অসদাচরণ :বার কাউন্সিল

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৪২
বার কাউন্সিল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অবিলম্বে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেয়ার দাবি জানিয়ে বলা হয়েছে, বিচার কার্যক্রম ও রায় নিয়ে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যানের স্ক্যাইপির সংলাপ সম্পূর্ণ অসদাচরণ। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এমন কলঙ্কজনক অবস্থা অতীতে আর কখনো সৃষ্টি হয়নি। পত্রিকায় প্রকাশিত সংলাপ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, বিচারপতি নিজামুল হক বিচারকের আচরণবিধি, সংবিধান, আইন এবং নৈতিকতার সমস্ত বিধানকে পদদলিত করেছেন। গতকাল সোমবার বার কাউন্সিল মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, বার কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান সাবেক এটর্নি জেনারেল এডভোকেট এজে মোহাম্মদ আলী, এনরোলমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মাহবুব উদ্দিন খোকন এমপি, সদস্য গোলাম মোস্তফা প্রমুখ ও আসামি পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক উপস্থিত ছিলেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, গণমাধ্যমে যে তথ্য বেরিয়েছে তারপর এই ট্রাইব্যুনালের আর কোন গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তা জাতিকে বিস্মিত লজ্জিত এবং হতভম্ব করেছে। এই সংলাপ প্রকাশের পর কি ধরনের বিচার হচ্ছে তা আজ সারা জাতি জেনে গেছে। সরকার, ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এবং বাদি পক্ষের যোগসাজশে যে বিচার কার্য পরিচালনা করা হচ্ছে তা এখন প্রহসনে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, আদালত এবং বিচারকদের সম্মান, মর্যাদা এবং ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য শুধু নৈতিক কারণেই নয়, সাংবিধানিক কারণে বিচারপতি নিজামুল হকের অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত। আর তা না হলে সরকারের উচিত হবে এই ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেয়া। খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিচারক হিসেবে শপথ নিয়ে কোনো প্রকার অনুরাগ, বিরাগ, প্রলোভন বা ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষভাবে বিচার কার্য পরিচালনা করার কথা থাকলেও বিচারপতি নিজামুল হক সম্পূর্ণ নির্লজ্জভাবে আদালতের কার্যক্রমের সমস্ত ব্যাপারে অন্যজনের পরামর্শ এবং নির্দেশনা নিয়েছেন এমনকি আদালতের বিভিন্ন আদেশ এবং রায়সমূহ বাইরে থেকে তৈরি করে পাঠানো হয়েছে বলে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, বিচারপতি নিজামুলকে আপিল বিভাগে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন, প্রসিকিউটরদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদি থেকে এটা সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধের চলমান প্রক্রিয়াটি এখন একটি সাজানো নাটক ছাড়া আর কিছু নয়। বাংলাদেশের আইনজীবী সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিচারপতি নিজামুল হকের বিচারক পদে অধিষ্ঠিত থাকার আর কোনো নৈতিক অধিকার নেই। আমরা প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করবো, তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে তদন্ত পূর্বক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ৮ ডিসেম্বর ব্রিটিশ সাময়িকী দি ইকনোমিস্ট যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিজামুল হক নাসিম সম্পর্কে যে তথ্য প্রকাশ করেছে তা বিশ্বের আইনজীবী সমপ্রদায়কে স্তম্ভিত করেছে। পরবর্তীতে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বিচারপতি নাসিম বিচার কার্য সম্পর্কে বিদেশে অবস্থানরত তৃতীয় একজন ব্যক্তির সাথে আলোচনা করেছেন। তার আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল : কোন মামলার শুনানি কখন হবে, কোনটা আগে হবে, কোনটা পরে হবে, কোন ট্রাইব্যুনালে কোন মামলায় কতজন সাক্ষী আসামি পক্ষকে আনতে দেয়া হবে, রায়ের কাঠামো কি হবে, কোন মামলায় কখন রায় প্রদান করা হবে। তাছাড়াও তিনি আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন ট্রাইব্যুনালের আরেকজন সদস্য বিচারপতি সম্পর্কে। একজন প্রসিকিউটরের সাথে তার খাস কামরায় আসামি পক্ষের অনুপস্থিতিতে মামলার কার্যক্রম সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এরপর এই ট্রাইব্যুনালের আর কোন গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। আপিল বিভাগের বিচারকসহ দুই বিচারকের পদত্যাগ দাবি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. নিজামুল হকসহ সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতিকে পদত্যাগের জন্য আল্টিমেটাম দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট জয়নুল আবেদীন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে গতকাল সরকার বিরোধী আইনজীবীদের এক প্রতিবাদ সভায় তিনি আগামী সাত দিনের মধ্যে পদত্যাগ দাবি করে আল্টিমেটাম দেন। এডভোকেট জয়নুল বলেন, শুধু ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নয়, বিচারকে প্রভাবিত করার জন্যে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নামও এসেছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে পদত্যাগ না করলে আমরা সকলে মিলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে যাবো। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিগত দিনের মতো যেনতেনভাবে হবে না। কার্যকরিভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিঞা, ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল প্রমুখ। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের আসামি পক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে এডভোকেট এম তাজুল ইসলাম গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মামলার বিষয়বস্তু এবং পরিণতির বিষয় একজন বাইরের লোকের সংগে আলোচনা করেন এবং তার নিকট মামলার বিষয়ে সাহায্য নেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ডঃ জিয়াউদ্দিনকে বলেন, সরকার একটি রায় ডিসেম্বরের মধ্যে চান এবং তিনি বলেন, সাঈদীর রায় এ সময়ের মধ্যে প্রদান করতে তিনি পারবেন। ডঃ জিয়াউদ্দিন যুক্তিতর্কের আগেই সাঈদীর রায়ের একটি খসড়া ট্রাইব্যুনালের জন্য তৈরি করে দিবেন, ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান তার সহকর্মী বিচারপতি সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন এবং তাকে আপত্তিকর নামে সম্বোধন করেছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই আলোচনা চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ পরিস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের একমাত্র সম্মানজনক পথ হচ্ছে পদত্যাগ করা।