সংঘাত ও সংঘর্ষময় হয়ে উঠেছে রাজনীতি, রক্তাক্ত রাজপথ। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের আন্দোলন কর্মসূচি এবং তা প্রতিরোধ-প্রতিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন ধরেই চলছে রাজপথে নির্বিচারে যানবাহন পোড়ানো ও ভাংচুর, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চোরাগোপ্তা আক্রমণ এবং সরকারি দল ও বিরোধী দলের কর্মী-সমথর্কদের বেপরোয়া সংঘর্ষ। প্রকাশ্যে পিস্তল, রাম দা, চাপাতি, রড, লাঠি ও ইট-পাথর নিয়ে সংঘাত করছে কোনো কোনো পক্ষ। আর এসব কিছুকেই ছাড়িয়ে গেছে রবিবার ১৮ দলের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে পুরনো ঢাকায় নিরীহ পথচারী বিশ্বজিত্ দাসকে নির্মম, নৃসংশভাবে পিটিয়ে-কুপিয়ে হত্যার ঘটনা। যখন-তখন যানবাহনে আগুন ও ভাংচুর, চাপাতি-রামদা-রডের আঘাত কিংবা উপর্যুপরি বোমা-ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় উদ্বিগ্ন, উত্কণ্ঠিত ও শঙ্কিত সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এ কিসের আলামত?
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, যেসব ঘটনা দেখছি এগুলো কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, এগুলো স্রেফ সন্ত্রাসী কার্যকলাপ। সরকারি ও বিরোধী পক্ষ উভয়েই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে। দেশের জন্য এটি খুব খারাপ ইঙ্গিত। তিনি বলেন, সন্ত্রাস দিয়ে কখনো সন্ত্রাস বন্ধ করা যায় না। সন্ত্রাসকে অন্যভাবে মোকাবিলা করতে হয়। কিন্তু তা না করে দু’পক্ষই যা করছে, পাল্টাপাল্টি যে সন্ত্রাস করছে, সেটি যদি চলতেই থাকে তাহলে আমাদের ভবিষ্যত্ অন্ধকার। রাজনীতির সঙ্গে যার এতটুকু সম্পর্ক নেই, সেই খেটে খাওয়া নিরীহ নাগরিক বিশ্বজিেক যেভাবে হত্যা করা হলো তা কোনো অবস্থায়ই রাজনীতি হতে পারে না। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে
এগুলো এখনই ভেবে দেখতে হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনীতির এই ভয়ঙ্কর রূপ বা সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয়নি। বাড়তে-বাড়তেই আজ এরকম ভীতিকর রূপ ধারণ করেছে। বিশেষত ’৯০ এর পর থেকে এ পর্যন্ত রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিক ঘটনাবলী পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি সব সরকারের আমলেই হয়েছে। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিরোধী দলের হরতালসহ আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচির আগে-পরে সাধারণত বোমাবাজি, কর্মসূচি চলাকালে রিকশাসহ যানবাহনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও ভাংচুর, রাস্তায় পুরনো টায়ার পোড়ানো এবং পুলিশ ও কর্মসূচির সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা দেখা যেত। ২০০০ সালের পর শুরু হয়েছে যাত্রীবাহী বাসে কিংবা সাধারণ যানবাহনে আগুন দেয়ার ঘটনা। বর্তমানে শুধু আগুন দেয়াই নয়, আগুনের ভয়াবহতা সৃষ্টির জন্য গান পাউডার ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত রাজনীতিতে যুক্ত হয় গ্রেনেড হামলার ঘটনা। যেসব ঘটনায় বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জনকে, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এম এস কিবরিয়া, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আহসান উল্যাহ মাস্টারকে প্রাণ দিতে হয়েছে। ২০০৬ সালে রাজনীতির সংস্কৃতিতে যোগ হয় রাজপথে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনা। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টন মোড়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে পিটিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনা এখনো দগদগে ক্ষতের মতো। পেটানোর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে চাপাতি, রাম দা ও রড দিয়ে কুপিয়ে মানুষ খুনের সংস্কৃতি। রবিবার যে সংস্কৃতির বলি হতে হয়েছে বিশ্বজিত্ দাসকে। এর আগে, বর্তমান সরকারের আমলেই নাটোরে পিটিয়ে মারা হয়েছে উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল্যাহ নূর বাবুকে। পিটিয়ে-কুপিয়ে হত্যার সঙ্গে এবার রাজনীতিতে আরেক সংস্কৃতির সংযুক্তি ঘটেছে, তা হলো গুম। যে সংস্কৃতির শিকার হয়েছেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলম ছাড়াও অৃরাজনৈতিক অনেক লোককেও। আর রাজনীতির সর্বশেষ সংস্করণ যেটি চলছে তা হচ্ছে- আন্দোলনের নামে নির্বিচারে যানবাহন ভাংচুর ও আগুনে পুড়িয়ে দেয়া। এমনকি নিরাপদ স্থানে আগে থেকে পার্কিং করা যানবাহনও ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বর্তমানে।
রাজনীতির এই সংস্কৃতি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুল ইত্তেফাককে বলেন, বিরোধী দল আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি দেয়, এটা আমাদের রাজনীতির সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু বিরোধী দলের আন্দোলনকে সরকার পক্ষ এবার যেভাবে প্রতিহত-প্রতিরোধ করছে তা অত্যন্ত জঘন্য, ন্যক্কারজনক ও নিন্দনীয়। এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে বিশ্বজিেক যেভাবে মারা হল, এরকম পাশবিক, নির্মম ও নিষ্ঠুর রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমরা অতীতে কখনো দেখিনি। এভাবে পাশবিকভাবে হত্যার সাহস ছাত্রলীগ কিভাবে পেল? এ সাহস তারা সরকারের শীর্ষমহল থেকেই পেয়েছে। কারণ অতীতেও ছাত্রলীগ-যুবলীগ অনেক ভয়াবহ ঘটনা ঘটিয়ে দায়মুক্তি পেয়েছে। এবার দেখা গেছে, বিরোধী দলকে প্রতিহত করার জন্য সরকারের দায়িত্বশীল স্থান থেকেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে, উস্কানি দেয়া হয়েছে। সুতরাং বিশ্বজিতের মৃত্যুসহ এসব ঘটনার দায় আওয়ামী লীগ সরকার কোনভাবেই এড়াতে পারে না।
আসিফ নজরুল আরো বলেন, রবিবার অবরোধের বিভিন্ন ঘটনার পর আমরা কী দেখলাম? পরোক্ষভাবে বিভিন্ন আহ্বান-নির্দেশ দেয়ার কারণে বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও রিজভী আহমদের বিরুদ্ধে মামলা হলো, কিন্তু সবচে ভয়ঙ্কর ও গা শিউরে ওঠার মতো ঘটনা-বিশ্বজিেক হত্যার ঘটনায় কোনো মামলা পর্যন্ত হল না। এটা সরকারের কোন ধরনের নীতি আমি জানি না।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক পিয়াস করিম বলেন, রাজনীতির নামে এখন যা ঘটছে তা কোনভাবেই রাজনীতি হতে পারে না। রাজনীতির নামে সন্ত্রাসী ও মানবতা বিরোধী ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। তিনি বলেন, আসলে আমরা সাধারণ নাগরিকরা রাজনীতির এই অপসংস্কৃতির কাছে, বিশেষ করে দুটি বড় দলের কাছে জিম্মি হয়ে গেছি।
