আগামীকাল বুধবার ১২ ডিসেম্বর ২০১২ সাল। সংক্ষেপে ১২.১২.১২। এই তারিখটি নিয়ে চলছে নানা হিসাব, নানা নিকাশ, নানা গবেষণা আর নানা রকম জল্পনা-কল্পনা। সংখ্যা বিশারদ বা নিউমারেলজিস্ট, জ্যোতিষবিদ ও সামাজিক গবেষকদের নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ রয়েছে ১২.১২.১২ নিয়ে। তবে যতই জল্পনা-কল্পনা থাকুক না কেন, এই বিশেষ তারিখটিতে ব্যতিক্রমী কিছু ঘটছে না, এমনই আভাস দিয়েছেন গবেষক ও দর্শন শাস্ত্রিগণ।
তবে অনেকেই এই দিনটিকে শুভ মনে করে ব্যবসা-বাণিজ্যের সূচনা, নতুন সম্পর্ক গড়া এমনকি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার জন্য আগ্রহভরে অপেক্ষা করছেন। জুয়াড়িরাও বসে নেই। তারা ভাবছেন বিশেষ এই তারিখে তারা বিশেষ কিছু করে ফেলবেন। জ্যোতিষ বিজ্ঞানীরা খুঁজছেন রাশিফলের গরমিল, শুভ-অশুভ নানা বিষয়। তারিখটি নিয়ে এত টানাটানির কারণ, দৃশ্যপটে এটি ফিরে আসবে দীর্ঘ একশ বছর পর। কৌতূহল জাগানো এই তারিখটি নিয়ে একটি দর্শনশাস্ত্রীয় (মেটাফিজিক্স) আলোচনা তুলে ধরা হলো। যদিও মুসলিম বিশ্বে এই দিবসটির কোন বিশেষ তাত্পর্য নেই তবুও কৌতূহলী অনেকে অপেক্ষায় আছেন এই বিশেষ দিনটিতে কিছু হয় কিনা তা দেখার জন্য।
১২ ডিসেম্বর তারিখের লেখ্য রূপটি নিয়ে মেটাফিজিক্স এক্সপেরিমেন্ট নামে বিশ্বব্যাপী অনলাইনে নানা জরিপও চলছে। এমনই একটি জরিপের প্রশ্ন ছিলো, ১২ ডিসেম্বর ২০১২ তে কিছু ঘটবে বলে আপনি বিশ্বাস করেন কি। উত্তরের অপশন ছিলো তিনটি। এক: সামথিং গুড উইল হ্যাপেন অন এ গ্লোবাল স্কেল অর্থ্যাত্ ভালো কিছু ঘটবে। দুই: নাথিং গ্লোবালি সিগনিফিক্যান্ট উইল হ্যাপেন অর্থাত্ উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটবে না। তিন: সামথিং ব্যাড উইল হ্যাপেন অন এ গ্লোবাল স্কেল অর্থাত্ খারাপ কিছু ঘটবে। ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এই তিন প্রশ্নের উত্তরে ৫৪ ভাগ ভোট দিয়েছেন দিনটিতে ভালো কিছু ঘটার পক্ষে। ৪২ ভাগ মনে করেন উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটবে না এবং মাত্র ৫ ভাগ মনে করেন খারাপ কিছু ঘটবে। এই তারিখটি নিয়ে অপর একটি হ্যাঁ-না শ্রেণীর জরিপের প্রশ্ন ছিলো ডু ইউ ফিল লাকি টুডে? অর্থাত্, আজকের দিনটিকে কি আপনি শুভ মনে করেন? ৮১ ভাগ ভোট দিয়েছেন হ্যাঁ সূচক এবং ১৯ ভাগ দিয়েছেন উল্টো জবাব। অর্থাত্ জরিপে অংশ নেয়া শতকরা ৮১ ভাগ মানুষ মনে করেন ১২ ডিসেম্বর দিনটি শুভ হবে।
এদিকে, এই দিনটির একটি গাণিতিক ও সামাজিক মূল্যায়ন বেশ মজাদার। ১২ সংখ্যাটি একটি অনন্য, আকর্ষক ও উপযোগী নম্বর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গণিত শাস্ত্রবিদ, বিজ্ঞানী ও মেটাফিজিস্টগণও এই সংখ্যাটি মূল্যায়ন করে আসছেন মানব সভ্যতার ইতিহাস সংরক্ষণের শুরু থেকেই। সংখ্যাটিকে অর্ধেক, এক তৃতীয়াংশ, এক চতুর্থাংশ এমনকি ১২ ভাগেও ভাগ করা যায়। জুয়াড়িদেরও বিশেষ পছন্দ এই সংখ্যাটি। তথ্য মতে, মিসরীয়রাই প্রথমে ১২ মাসের পঞ্জিকার উদ্ভব ঘটান এবং পরবর্তীতে রোমানরা তা পরিমার্জন করলেও ১২ মাস অক্ষুণ্ন রাখা হয়। পরবর্তীতে চান্দ্রমাসও একইভাবে আসে। একইভাবে সারাদিন রাত্রিকেও ভাগ করা হয় ২৪ ঘন্টায় (২ দ্ধ ১২)। আবার ১২ এ.এম দিয়েই শুরু হয় দিন এবং ১২ পি.এম দিয়েই শুরু হয় মধ্যাহ্ন। জ্যোতিষ শাস্ত্রেও গ্রহ-নক্ষত্রের সঙ্গে হিসাব-নিকাশে এই ১২ সংখ্যাটি বেশ তাত্পর্যপূর্ণ।
এই সংখ্যাটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয়। গ্রেগরিয়ন ১৫০২-৮৫ অর্থাত্ পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি কর্তৃক প্রবর্তিত পঞ্জিকা এবং জুলিয়াস সিজার কর্তৃক ৪৬ খ্রীষ্টাব্দে যখন প্রচলনকৃত পঞ্জিকার ভিন্নতা স্পষ্ট তখনও ১২ ডিসেম্বর কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি এবং ১ হাজার বছর আগে অর্থাত্ ১০১২ সালেও দিনটি পার হয়েছিল বিশেষ কোনো ঘটনা ছাড়াই। এমনকি ২ হাজার বছর আগে ১২ সালের ১২ ডিসেম্বরেও আহামরি কিছু ঘটেনি। তবে অন্ধকার যুগ হিসেবে বিবেচিত ৫ম থেকে ১৫তম সেঞ্চুরির (৪৫০-১৪৫০) আরো ৫ হাজার ১২৬ বছর পূর্বে মায়ান পঞ্জিকা শুরু হয়। এই পঞ্জিকার শেষ ধরা হয় ১২ ডিসেম্বর ২০১২। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে আরো উল্লেখ করা হয়, ২৬ হাজার বছর পূর্বে সূর্য একবার সৌরমন্ডলের (গ্যালাক্সি) মাঝখানে চলে আসে এবং ডিসেম্বর ২০১২ তে আবার সূর্য আবর্তিত হয়ে পুনরায় গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থান করবে। তবে কোন একটি সময় থেকে ৫ হাজার বছর পরে ২১ ডিসেম্বর যে মহাপ্রলয়ের ধারণা পোষণ করা হয়েছিল তাকে বিজ্ঞানীরা এখন একটি গাণিতিক ভুল হিসেবে দেখছেন। আর ১২ ডিসেম্বর থেকে ২১ ডিসেম্বরের ব্যবধান মাত্র ৯ দিন। তবে মায়ান পঞ্জিকার শুরু থেকে ১২ সংখ্যাটির নানা ব্যাখ্যা করা হলেও এসব ব্যাখ্যা বিজ্ঞানী ও জ্যোতিষীদের কাছে কোন বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। বরং এধরনের ভাবনাকে কল্পনাপ্রসূত বলে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তবে মহাপ্রলয় সম্পর্কে মায়ান অনুমানকে অনেকে সঠিক ভাবলেও এর কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখা কিংবা ভিত্তি খুঁজে পাননি তারা।
এ ব্যাপারে উত্সুখ অনেকে লিখেছেন তাদের জল্পনা-কল্পনা, আশার-উদ্বেগের কথা নিয়ে। ১৩ মাস আগে জেনিস নামে একজন লিখেছেন, সম্ভবত: ১২ ডিসেম্বর একটি ভাল দিন হবে এবং এ কারণে তিনি তার ভালবাসার মানুষটির সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন। জেনিসের মতো এই তারিখে বিয়ের পিঁড়িতে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনেকেই। অপরদিকে, জ্যাকি মারি লিখেছেন, ১২.১২.১২ তার ৪০তম জন্মদিন হবে এবং এটা তার জন্য দারুণ আনন্দদায়ক ব্যাপার হবে। এমনই হরেক রকম আশার কথা আছে দিনটিকে নিয়ে।
