১৬ ডিসেম্বর আমাদের জাতীয় জীবনে একটি উজ্জ্বল দিন। ১৯৭১ সালের এ মহান দিনটিতে আমরা হানাদার পাকিস্তানি সৈন্য বাহিনীকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করি। এ কারণেই ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। বাংলাদেশের মাটি থেকে হানাদার বাহিনী নির্মূল করার জন্য এ দিবসটির গুরুত্ব আমাদের কাছে অত্যন্ত তাত্পর্যবহ।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পূর্বে এ দেশটি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর এ দেশের শাসকরা ছিল অবাঙালি। ১৯৪৭ সালে পূর্ববাংলা স্বাধীনতা লাভ করলেও এ অঞ্চলের মানুষ ছিল নিগৃহীত ও নির্যাতিত। পাকিস্তানের শাসকরা পূর্ববাংলার মানুষকে ভাল চোখে দেখতো না। এমনকি তারা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে কেড়ে নেবার একবার ফন্দি এঁটেছিল। কিন্তু বাংলার দামাল ছেলেদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা যথাযথ মর্যাদা লাভ করে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালির বিপুল বিজয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ আরো সুগম হয়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালির কাছে শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করে। এ অবস্থায় ’৭১-এর ৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক মহাসমাবেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান জানান। তিনি তাঁর সেই ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। পাকিস্তানিরাও তাদের দমননীতির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। গোটা দেশে শুরু হয় অকথ্য নির্যাতন।
২৫ মার্চ মধ্যরাত্রিতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে করাচীতে নিয়ে যায়। বন্দী হবার পূর্বে বঙ্গবন্ধু মধ্যরাত্রির পর অর্থাত্ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণা দেন ইপিআরের ওয়ারলেসের মাধ্যমে। যা প্রথমে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র এবং পরে বেশ ক’বার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত হয়, আর পাকিস্তানি স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনী তখন ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালি জাতির ওপর। তাদের এই সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি হত্যা ও নির্যাতন করে তাদের মুক্তি ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে বিনষ্ট করা। পাকিস্তান বাহিনীর সৈন্যরা প্রথম আঘাত হানে ছাত্র-শিক্ষক, রাজনীতিক, শ্রমিক, পুলিশ, আনসার, ইপিআর ও সেনাবাহিনীর বাঙালি জোয়ানসহ সর্বসাধারণের ওপর। প্রথম দিনের হামলায় তারা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত বাঙালিকে হত্যা করে এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে সহায়-সম্পদ লুট করে নেয়। সে এক অমানবিক বর্বরতার কাহিনী।
৭১-এর ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রাম সেন্টার এবং ঐ দিনই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুর প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণা বিশ্ববাসীকে প্রথম পাঠ করে শোনান চট্টগ্রামের তত্কালীন আওয়ামী লীগ নেতা এম.এ হান্নান। শুরু হয়ে যায় সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধ। ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে গঠিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি (অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) ও তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। দেশকে স্বাধীন করা এবং মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার নিমিত্তে কর্নেল (অব.) আতাউল গনি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি ও কর্নেল (অব.) এম. এ রবকে চিফ অব স্টাফ নিয়োগ করা হয়। তারা দুজনই আওয়ামী লীগের এম এন এ ছিলেন। শত্রুকবলিত এলাকাকে ১১টি অঞ্চলে ভাগ করে নৌ অঞ্চল বাদে বাকি ১০টি অঞ্চলের দায়িত্ব দেয়া হয় এক একজন অধিনায়কের ওপর। এ ছাড়া জেড ফোর্স, এস ফোর্স, কে ফোর্স নামে তিনটি ফোর্স গঠন করা হয়। টাঙ্গাইলের কাদের সিদ্দিকীর বাহিনী ও গোপালগঞ্জের হেমায়েত বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারাও এ যুদ্ধে কৃতিত্ব প্রদর্শন করে।
পুরো ৯টি মাস যুদ্ধ চলে। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি নরঘাতকরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আমাদের সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করে পরাজয়বরণ করে নেয়। আমরা হই বিজয়ী। এই মহান বিজয়ের পেছনে ছিল ভারত, রাশিয়া, পোল্যান্ডসহ মানবতাবাদী দেশসমূহের সমর্থন ও সহযোগিতা।
১৬ ডিসেম্বর বিজয়, আনন্দ ও উল্লাসের দিন হলেও স্বজনহারা মানুষের কাছে এ দিনটি শোকেরও বটে। ৯টি মাসের যুদ্ধে আমরা লাখো লাখো স্বজন হারিয়েছি। দখলদার বাহিনী অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে সে সময়। বিজয় দিবসের দু’দিন পূর্বে অর্থাত্ ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এ দেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদররা দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের হত্যা করে। আল-বদরদের এ হত্যা ও নির্যাতন কোনভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়। এ সবই হলো যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ড।
অনেক রক্ত দিয়ে আমরা এদেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছি। রক্তে ভেজা এ মাটির বিরুদ্ধে কেউ ষড়যন্ত্র করলে আমরা আবার নিশ্চয়ই রুখে দাঁড়াব। আমাদের সকল কর্মকাণ্ডে বিজয় দিবসের এই দৃপ্ত ঘোষণা উদ্দীপনা সৃষ্টি করুক—এই হোক আজকের শপথ।
