“আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।” বাংলাদেশ আমাদের সর্বোচ্চ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় মাথানত করার পবিত্রভূমি। ৩০ লাখ শহীদের তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এ স্বাধীনতা। প্রাচীনকালে বাংলাদেশ ছিল স্বাধীন ভূ-খণ্ড। এদেশের রাজা মহারাজারা স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করতেন। তখন হাতিশালে হাতি ছিল- ঘোড়াশালে ছিল ঘোড়া। গোলা ভরা ধান আর গোয়াল ভরা গরু। পুকুর আর নদীতে ছিল মাছ আর মাছ। হঠাত্ করেই বাংলার সুখের ঘরে ইংরেজদের অশুভ আক্রমণ। ১৯৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা পরাজিত হন। মীর জাফর, রাজবল্লভ ও উর্মীচাঁদদের ষড়যন্ত্রে আর ইংরেজদের আগ্রাসনে বাংলা হারায় স্বাধীনতা। বাঙালি জাতির ললাটে লেপন হয় দুশ’ বছরের পরাধীনতা। ইংরেজরা বাংলাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। এদেশের দামাল ছেলেরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্র সংগ্রাম করেছে অনবরত। তারই ফলশ্রুতি ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ। শত শত বাঙালি সৈন্য নিহত হলেও থেমে থাকেনি আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। কিন্তু ১৯৪৮ সাল থেকেই পাকিস্তানীরা বাংলার এ অঞ্চলের মানুষের সাথে বিমাতা সুলভ আচরণ করতে থাকে। আমাদের মাতৃভাষা বাংলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ঊর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা ঘোষণা করে। শুরু হয় আবার অসহযোগ আন্দোলন। পাকিস্তানিরা আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে আঘাত করতে থাকে। তাই এ সকল কিছুর বহি:প্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে। এ দিন ভাষার জন্য শহীদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, শফিকসহ আরো অনেকে। পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র বাঙালিরাই শুধু মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন করে শহীদ হন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচন, ১৯৬৯ গণঅভ্যুথান ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন বাংলার মানুষ তাদের স্বাধীকার এর পক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু সেখানেও অধিকার বঞ্চিত হয় বাঙালি জাতি। তাই ১৯৭১ সালে অধিকার আদায় ও স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলার মুক্তি সেনারা। ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো “এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম... তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা কর...।” এ মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েই ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হতে ১৬ ডিসেম্বর। দীর্ঘ ৯ মাস বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। ত্রিশ লাখ বাঙালি শহীদ হয়। বাংলার স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বন্দী দশা থেকে ফিরে এলেন । দেশ গড়ার কাজে হাত দিলেন। সেই সাথে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের প্রথম বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করেন নবীনগর এলাকায়। স্মৃতিসৌধের স্থপতি ছিলেন সৈয়দ মঈনুল হোসেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ৭টি পটভূমির ভিত্তিতে স্মৃতিসৌধে ৭ জোড়া ত্রিভূজ আকৃতির দেয়াল ছোট থেকে ধাপে ধাপে উপরে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের ৭টি পটভূমি হলো ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৫৬, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯ এবং ১৯৭১ সালের ঘটনাকে প্রতীক ধরে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। স্মৃতিসৌধের সর্বোচ্চ চূড়াটি ১৫০ ফুট উঁচু। ১৯৮২ সালে দীর্ঘ দশ বছরে স্মৃতিসৌধের নির্মাণ কাজ শেষ হয়।
স্মৃতিসৌধের চারপাশে মনোরম বাগান সাজানো হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন ফুলের গাছ রয়েছে স্মৃতিসৌধের চারপাশে। বিভিন্ন সময় আগত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান যারা বাংলাদেশে এসেছেন তাদের লাগানো গাছ শোভা পাচ্ছে এখানে। রয়েছে সুদৃশ্য লেক। এখানে আছে নাম না জানা কয়েকটি গণকবর। ঢাকা থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে সাভারে কোলাহল মুক্ত পরিবেশে জাতীয় স্মৃতিসৌধের অবস্থান।
