পশ্চিম আকাশে তখন অস্তমিত সূর্যটা হেলে পড়ছিল। বিজয় মেলার মাঠ থেকে তাদের বাড়ির দিকে আসছিল। দাদাজানের কাশিটা সে বাড়িতে ঢুকতেই শুনতে পায়। তার দাদাজানের নাম করিম গাজী। করিম গাজী একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। বিজয় এবার ক্লাস ফোর থেকে ফাইভে উঠবে। তার দাদাজানের বয়স এখন সত্তর ছুঁই ছুঁই। অবশ্য ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার দাদাজান ছিল একজন স্কুল শিক্ষক। সেই সাথে টুকটাক পত্রিকায় লেখালেখি করত। বিজয় তার দাদাজানের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের অনেক কথা শুনেছে। পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর নেতৃত্বে এ দেশের আপামর জনতা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। বিজয় এর নামটা রাখে তার দাদা। আর বিজয় তার দাদাকে দাদাজান বলে ডাকে। বিজয়ের ক্লাস রোল কিন্তু এক। সে খুব ভাল অভিনয় করতে পারে। প্রতিবছর স্কুলে একক অভিনয়ে বিজয় প্রথম হয়ে আসছে। এ ছাড়াও জেলা পর্যায়েও বিজয় অভিনয় করে কাপ পেয়েছে। আর প্রতিবার বিজয় যে অভিনয়টা করে প্রথম হয় তা তার দাদাজান তাকে শিখিয়ে দেয়। তার দাদা হাতিরদিয়া হাইস্কুলের একজন শিক্ষক ছিলেন। স্কুলটা দেখতে স্বপ্নপুরীর মত ছিল। মনোহরদী খানাতে এমন মনোহরময় বিদ্যালয় একটিও ছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন আগে সময়টা তার দাদার স্পষ্ট মনে আছে ৭ই ডিম্বের ১৯৭১ সালে। খুব ভোরে তার দাদাজানের বাড়িতে একটা পাক হানাদার বাহিনীর জলপাই রঙের জীপ আসে।
মন্টু নামের এক রাজাকার ঐ পাক হায়নাদের নিয়ে আসে করিম গাজীর বাড়িতে। ঠিক এ সময়টায় তার দাদাজান বৈঠকখানায় একটা লেখা লিখছিলেন হায়নাদের কুকীর্তি সম্পর্কে। মন্টু রাজাকার দেখিয়ে দেয় যে তার দাদা পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে লিখছে। সাথে সাথে ঐ জায়গায় দাঁড়িয়ে তার দাদাজানের ডানহাতটা কেটে ফেলে। আর সেই হাত দিয়ে রক্তের ধারা বইয়ে যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র নদে। এ ঘটনাটা বলতে গিয়ে তার দাদাজান কান্নায়, ব্যথায় বারবার আর্তনাদ করে ওঠে। তবুও বঙ্গবন্ধুর কথায় যেভাবে যুদ্ধ করে এদেশের মানুষ এ দেশটাকে পাক হায়নাদের থেকে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে তা ইতিহাসে বিরল। তার দাদাজান আরো কত গল্প শুনিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। কিন্তু কেন জানি বিজয়ের এ গল্পটাই বেশ ভাল লাগে। আর ভাল লাগে বলেইতো প্রতিবার দাদাজানের চোখের পানি মুছে দিয়ে সে এ ঘটনাটা অভিনয় করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। গত বছর সে এ অভিনয়টা করে নরসিংদী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট-এর কাছ থেকে তিন হাজার টাকার চেক উপহার পায়। দাদাজানের সাথে সেই ক্লাস টু-তে থাকতে একবার বিজয় ঢাকা সেগুনবাগিচায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আসে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ঢুকেই প্রথমে একটা শিখা চিরন্তনী দেখতে পায় বিজয়। দাদু আর তার নাতি মিলে সেদিন সারাদিন ছিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। এখানে এসে বিজয় মুক্তিযুদ্ধ কী, কাদের মুক্তিযোদ্ধা বলে, বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ শোনে সে ভিডিও-তে। ওর মত একটা ছোট্ট শিশু মিছিলের আগে শ্লোগান দিচ্ছে এ ছবিটা দেখে বিজয় তার দাদাজানকে প্রশ্ন করে— ছেলেটা কে? মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র-শস্ত্র ছবি, আরো কত কী সে বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখে। দোতলায় একটা কক্ষে এসে যখন তার দাদাজান বলছে যে, ‘এইডা হলো ছয়মাসের একটা শিশুর পোশাক, শয়তান পাক সেনারা হেরে পায়ের তলায় বুটে পিষ্ট করে মাইরা ফালায়’। বিজয় একথা ও পোশাকটা দেখে হু হু করে কেঁদে ওঠে। এমনি করে ওরা সারাটি দিন ছিল জাদুঘরে। ওর দাদাজান ওকে একটা বই কিনে দেয় যার নাম ‘বঙ্গবন্ধুর সহজ পাঠ’ বইটি লিখেছেন ড. আতিউর রহমান, বাসে আসতে আসতে তার দাদাজান মুক্তিযুদ্ধের আরো অনেক গল্প শোনায়। সন্ধ্যায় বিজয় তার দাদাজানের কাছে এসে বসে। দাদাজান আগামী কাইল ঢাকা যাইতাছি নতুন কুঁড়িতে আমার একটা একক অভিনয় আছে, তুমি দোয়া কইর’। বিজয়ের জন্য তো তার দাদাজানের আশীর্বাদ সব সময় থাকে। কিন্তু বিজয় এবার বিশেষভাবে দোয়া চেয়েছে। কারণ নতুন কুঁড়িতে অনেক ভাল ভাল প্রতিযোগী আসবে, সারা বাংলাদেশ থেকে, বিজয় আগেই ঠিক করে রেখেছিল এবার যদি সে প্রথম হয়ে সোনার মেডেল পায় তবে তা তার দাদাজানের গলায় পরিয়ে দেবে। পরদিন বিজয় আর তার বাবা মনোহরদী বাসস্টপ থেকে ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা করে। শীতের সকাল বলে চারিদিকে বেশ ঘন কুয়াশা পড়েছে। বিজয় এটা রঙিন সোয়েটার পরে। আর আগামীকাল হচ্ছে বিজয় দিবস অর্থাত্ ১৬ই ডিসেম্বর। বিজয় বিটিভির নতুন কুঁড়ি প্রোগ্রামে তার দাদাজানের হাতকাটা ঘটনাটা অভিনয় করে দেখাবে। পরদিন অভিনয়ের অনুষ্ঠানে বিজয় ফার্স্ব হয়। আর প্রধানমন্ত্রী নিজে তার গলায় সোনার মেডেল পরিয়ে দেয়। আনন্দে বিজয়ের চোখে জল চলে আসে। আজ এ স্বর্ণের মেডেলটা তার দাদাজানের গলায় সে পরিয়ে দেবে। এ সারপ্রাইজটা সে তার দাদাজানকে দেবে বলে মনস্থির করে। সন্ধ্যার একটু পর ওরা বাড়িতে চলে আসে। বাড়িতে ঢুকতেই বিজয় আতরের গন্ধ পায়। তার হাতের সোনার মেডেলটা দুলতে থাকে। বিজয় তার সোনার মেডেলটা দাদাজানের গলায় আর পরাতে পারেনি। স্বর্ণের মেডেলটা পড়ে রইল খাটের কোণে।
অলঙ্করণ :অনিরুদ্ধ কর
