কোটি মানুষের লালিত স্বপ্ন

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:২৯
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন পদ্মা সেতু। দীর্ঘ চার দশকেও এ স্বপ্ন পূরণ হয়নি। পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গেও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। খুলে যাবে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত। বাস্তবায়িত হবে ট্রান্স-এশিয়ান রুট। মংলা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে পদ্মা সেতু বিশেষ ভূমিকা রাখবে। একটি সেতু নদীর দু’পাড়ের ভেতর বন্ধন গড়ে দেয়। এটি কেবল ভৌগোলিক বাস্তবতাই নয়, একটি সেতুর সঙ্গে কোটি মানুষের স্বস্তি ও সমৃদ্ধির বিষয়টিও যুক্ত হয়ে যায়। পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাবে সেটি আশা করা হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুটি বিভাগ খুলনা ও বরিশাল এবং ঢাকা বিভাগের ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ীর মানুষের দীর্ঘদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে। একটি সেতু কতটা প্রয়োজন তা যমুনা নদীর ওপর ‘বঙ্গবন্ধু সেত’ু নির্মাণের আগে-পরের পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি সেতু কতখানি ইতিবাচক ভূমিকা রাখে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বঙ্গবন্ধু সেতু। রাজধানী ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের জেলা রংপুর-দিনাজপুর সড়কপথে যাতায়াতে যেখানে আগে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটি দিন ব্যয় হয়ে যেতো, বর্তমানে সেখানে লাগছে মাত্র ৪-৫ ঘণ্টা। সময় সাশ্রয়ের সঙ্গে অর্থনীতির হিসাব ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। একটি সেতু জাতীয় অর্থনীতির প্রাণসঞ্চারেও জোরালো অবদান রাখতে সক্ষম। দক্ষিণবঙ্গ তথা দেশবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পদ্মা নদীর ওপর একদিন সেতু নির্মিত হবে। এ সেতু রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের দূরত্ব হ্রাস করবে। এর ফলে কেবল দক্ষিণবঙ্গের মানুষেরই নয়, পুরো দেশেরই অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুঃখজনক ও আলোচিত সংবাদ হচ্ছে—দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অবশেষে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছেন। এক সাবেক মন্ত্রীকে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত করা না করার প্রশ্নে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দুদকের আলোচনা কার্যত ভেঙে যাওয়ার মতো অবস্থায় উপনীত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক চায় যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হোক। দুদক এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে এগুতে চান। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তে পাকড়াও করার মতো অভিযোগ না থাকায় মামলা করার ব্যাপারে আপত্তি জানাচ্ছেন তাঁরা। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক এ ব্যাপারে তাদের পুরনো অবস্থানে অটল রয়েছে। দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে তাঁদের তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দেশের আইন অনুযায়ীই এগোবেন তাঁরা। তাতে বিশ্বব্যাংক কী ভাবলো না ভাবলো তা দেখা তাদের কাজ নয়। দুদক ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংককে জানিয়েছে, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দালিলিক প্রমাণ না থাকায় বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে তাঁকে আসামি করা সমীচীন হবে না। অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০ (খ) ধারায় মামলা করা যায়। দুদক বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুসরণ করবে এ প্রত্যয়ের সঙ্গে আমরাও একমত। তবে একজন মন্ত্রীকে অভিযোগ থেকে দূরে রাখতে দুদক অন্য কারো দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন কিনা, এ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের লক্ষ্যচ্যুত করার চেষ্টা চলছে কিনা, তা কোনোভাবেই উপেক্ষার বিষয় নয়। দুদকের সুনামের স্বার্থেই বাইরের চাপ পরিহারের সামর্থ্য অর্জন করতে হবে। বিশেষত বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়লে তা দুদকই শুধু নয়, সরকারের জন্যও বিড়ম্বনা ডেকে আনবে। পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন নিয়ে পানি এতটাই ঘোলা করা হয়েছে, যা সত্যিকার অর্থেই উদ্বেগজনক। যে সেতুর বাস্তবায়ন হতে পারতো সরকারের সুকীর্তির পরিচায়ক, তা কাজ শুরুর আগেই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ গলার কাঁটা তোলার মধ্যে রয়েছে সরকারের মঙ্গল। এ উদ্দেশে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতাই হবে শ্রেয় পথ। দুদক পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির আলামত খুঁজে পাওয়ায় বিশ্বব্যাংকের অভিযোগই ঠিক বলে প্রমাণিত হলো। পদ্মা সেতু প্রকল্পের কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনকে পরামর্শক হিসেবে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে কিছু কর্তাব্যক্তি ঘুষ লেনদেনের অপচেষ্টায় জড়িত ছিল বলে বিশ্বব্যাংক অভিযোগ করে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণে গত জুলাই মাসে জড়িত ব্যক্তিদের নামের তালিকা দুদকের কাছে পাঠায় বিশ্বব্যাংক। দুদক বিশ্বব্যাংক ও গণমাধ্যমের অভিযোগ পেয়ে গত বছরের সেপ্টেম্বরে তদন্ত চালিয়ে অভিযোগের কোনো সত্যতাই পায়নি। বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে দুদক ও সরকারের টনক নড়ে। তারপর শুরু হয় তাদের নতুন তোড়জোড়। তদন্তের স্বার্থে বিশ্বব্যাংকের দাবির মুখে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টাকে পাঠানো হয় ছুটিতে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের আরো কিছু কর্তাব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সরকারের সুমতির কারণে বিশ্বব্যাংক শর্ত সাপেক্ষে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ফিরে আসার ঘোষণা দিলেও দুদকের তদন্তের ফলাফলের ওপর প্রকল্পের অর্থায়ন অনেকাংশে নির্ভরশীল। স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত কাজ কে না চায়। বিশ্বব্যাংকসহ সহযোগীরাও তা চেয়েছে। বর্তমান সরকারেরও রয়েছে দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান ও অঙ্গীকার। আমি চাই সরকার দুর্নীতিমুক্ত-স্বচ্ছ অবস্থান প্রমাণে সফল হোন। তাঁরা নিজেদের স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রমাণ করতে পারলে অবশ্যই আবার আশার আলো দেখা দেবে। দুর্নীতির অভিযোগের ফয়সালার পর অর্থায়নের ইঙ্গিত রয়েছে বিশ্বব্যাংকের ঘোষণার মধ্যেই। কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নকে কিছুতেই ধুলিস্যাত্ হতে দেয়া যায় না। পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি সড়ক সংযোগ যেমন গড়ে উঠবে তেমনি উন্নয়ন ক্ষেত্রে ওই এলাকার পিছিয়ে পড়ার দুর্গতি রোধ হবে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হবে ইতিবাচক পরিবেশ। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মংলা বন্দরের ব্যবহারও বাড়বে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপও কমানো সম্ভব হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণে সরকার যেহেতু প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সেহেতু প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সম্মিলিত মেধা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এমন একটি সেতু তৈরি করতে হবে যা বর্তমানই শুধু নয়, দীর্ঘমেয়াদি চাহিদাও পূরণ করতে পারে। ঢাকা