গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:২৯
পিরোজপুর পাক হানাদার মুক্ত হয় ১৯৭১-এর ৮ ডিসেম্বর। সমাপ্তি ঘটে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের। ঘরে ঘরে উত্তোলিত হয় বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা। জন্মভূমির স্বাধীনতা অর্জনে আত্মোত্সর্গ করে মুক্তিযোদ্ধাসহ জেলার প্রায় ১৫ হাজার মুক্তিকামী নারী-পুরুষ। স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন, গণহত্যার করুণ ইতিহাস এবং হানাদারদের প্রতিরোধে পিরোজপুরবাসীর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন ইত্তেফাকের পিরোজপুর প্রতিনিধি— নাসিম আলী যুদ্ধের শুরু: স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে পিরোজপুরবাসী ২৬ মার্চ বিকালেই পুলিশের অস্ত্রাগার (ট্রেজারি) ভেঙ্গে রাইফেল, গুলি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। এ ঘটনায় ১৯ মে অস্ত্রাগারের রিজার্ভ সাব ইন্সপেক্টর গোলাম মাওলা ৫৫ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামিদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের মহকুমা সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় সংসদ সদস্য এডভোকেট এনায়েত হোসেন খান, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ডা. আব্দুল হাই, ডা. ক্ষিতিশ চন্দ্র মন্ডল, মোজাফফর ন্যাপ নেতা আলী হায়দার খান, ভাসানী পন্থি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ফজলুল হক খোকন (শহীদ মুক্তিযোদ্ধা), আওয়ামী লীগ নেতা ইয়াকুব আলী সিকদার, আজিজুর রহমান হামদু সিকদার, ছাত্রলীগ নেতা ওমর ফারুক (শহীদ) প্রমুখ। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অফিসার সেকেন্ড লেফটেনেন্ট জিয়াউদ্দিন ছুটিতে ২১ মার্চ পিরোজপুরে আসেন নিজ বাড়িতে। প্রগতিশীল রাজনীতি মনস্ক ২১ বছরের টগবগে তরুণ লেঃ জিয়া ২৭ মার্চ থেকে পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ছাত্র-তরুণ-যুবাদের জড়ো করে শুরু করেন মুক্তিযুদ্ধের অস্ত্র প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা দু’টি ক্যাম্পে অস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু করেন। পরবর্তীতে লেঃ জিয়ার নেতৃত্বে সুন্দরবনে বিশাল ঘাটি তৈরি করে ৯নং সেক্টরের একটি সাব সেক্টর সদর দপ্তর সেখানে স্থাপন করা হয়। ৩ মে বরিশাল থেকে এসে পাকসেনারা পিরোজপুর দখল করে নেয়। পাকবাহিনী তত্কালীন ভারপ্রাপ্ত মহকুমা প্রশাসক আব্দুর রাজ্জাক, মহকুমা পুলিশ প্রধান ফয়জুর রহমান আহমেদ ও ট্রেজারি অফিসার ম্যাজিস্ট্রেট সাইফ মিজানুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে। গণহত্যা:পাকহানাদার বাহিনীর নৃশংসতা আর মধ্যযুগীয় বর্বরতার সাক্ষী পিরোজপুরের বলেশ্বর ঘাট বধ্যভূমি। জেলা শহরের পশ্চিম প্রান্তে বলেশ্বর নদের খেয়াঘাটের কংক্রিটের সিঁড়িটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের রক্তাক্ত সোপান যেন। এই সিঁড়িটির উপর দাঁড় করিয়ে বহু মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করেছে পাকসেনারা। পিরোজপুরের বিপ্লবী সন্তান ফজলুল হক খোকন, এসডিও আব্দুর রাজ্জাক, এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ, ম্যাজিস্ট্রেট সাইফ মিজানুর রহমানসহ অসংখ্য সূর্য্যসেনার রক্তে স্নাত এই সিঁড়ি। পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধার চর সন্দেহে ভাগিরথী সাহা নামে কদমতলা গ্রামের এক নারীকে মোটরসাইকেলের পেছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে নির্মমভাবে হত্যার পর বলেশ্বর ঘাটে নিয়ে এসে লাশ নদীতে নিক্ষেপ করে। এছাড়া ২৪ অক্টোবর স্বরূপকাঠি আকলম স্কুলের শিক্ষক মহিউদ্দিন, জহির উদ্দীন বাহাদুরসহ চারজনকে জীপের পিছনে একইভাবে রাস্তায় টেনে হিঁচড়ে নৃশংসভাবে হত্যার পর বলেশ্বরে এনে লাশ নদীতে ফেলা হয়। একইভাবে রায়বাহাদুর সড়কের মাথা, চাঁদমারী, হুলারহাট লঞ্চ ঘাটের পন্টুন, কাউখালী লঞ্চ ঘাটের পন্টুন পাকবাহিনীর বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। জেলার অন্যান্য বধ্যভূমির মধ্যে রয়েছে স্বরূপকাঠি থানার আটঘর কুড়ি আনা পেয়ারাবাগান, সমুদয়কাঠি, শশিদ, জলাবাড়ি, মাদ্রা, গণপতিকাঠি, সোহাগদল (বরছাকাঠি) কাচারীর উলা, অলংকারকাঠি, দৈহারী, করফা, সদর থানার রানীপুর, মাছিমপুর, কৃষ্ণনগর, তেজদাসকাঠি, মঠবাড়িয়া থানার সূর্য্য মনি। নাজিরপুর থানার শ্রীরামকাঠি, কালিকাঠি, দীর্ঘা, ঘোষকাঠি ইত্যাদি। প্রতিরোধ যুদ্ধ: স্বরূপকাঠির আটঘর-কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগানে ৭১’র মে মাসের শেষসপ্তাহ জুড়ে, শর্ষিণা মাদ্রাসায় ২৬ নভেম্বর, ইন্দুরহাট বন্দরসহ প্রভৃতি রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকসেনা ও রাজাকারদের খন্ড যুদ্ধ হয়েছে। কাউখালীর কেউন্দিয়ায় ৭ মে ও ২২ সেপ্টেম্বর এবং ১৭ নভেম্বর কাউখালীর আইরণে পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধ হয়। মঠবাড়িয়ার থানায় তুষখালী ও বড় মাছুয়ায় ১৫ অক্টোবর পাকসেনা ও রাজাকারদের সাথে পৃথক যুদ্ধ হয়। নাজিরপুরের রঘুনাথপুরে ১১ থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত তিনদিনব্যাপী যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা একটি রাজাকার ক্যাম্প দখল করে নেয়। পিরোজপুর জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা (জেলা তথ্য বাতায়ন থেকে সংগৃহিত) পিরোজপুর সদর উপজেলা: লে: কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, আমজাদ হোসেন, বিধান চন্দ্র হাওলাদার (মন্টু), ভগীরথী সাহা, মো: নুরুল আলম সেলিম, ফজলুল হক খোকন, শহীদ খোকন সরদার, লত্ফর রহমান হাওলাদার, মো: আ: ছত্তার হাওলাদার, আব্দুস সালেক সেখ, দুলাল চন্দ্র ঘোষ, আ: মালেক খান, মনিন্দ্র নাথ হালদার, আজিজ উদ্দিন আহমেদ, ওয়াহেদ আলী খান। নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি উপজেলা): সুভাষ চন্দ্র হালদার, মো: আবু জাফর মন্টু, মো: আলী হোসেন, নির্মল চন্দ্র হালদার, আলমগীর বাহাদুর, আবুল কালাম আজাদ, কাজী শামসুল হক। নাজিরপুর উপজেলা: সারোয়ার হোসেন, আ:হালিম খন্দকার, গোলাম মোস্তফা দাড়িয়া, মোবারক আলী সিকদার, হোসেন আলী সেখ। ভান্ডারিয়া উপজেলা: ক্যাপ্টেন নুরুল আলম, নায়েক আবুল কাশেম বীর বিক্রম, গনেশ চন্দ্র বসু। কাউখালী উপজেলা: আ: মাজেদ, হারুন অর রশিদ, জালাল উদ্দিন, শাহজাহান, মানিক হোসেন, আতাহার আলী, বেলায়েত হোসেন, হাবিবুর রহমান, লতিফুর রহমান, শাফায়েত হোসেন, আবুল কালাম আজাদ, মোক্তাদিরুল ইসলাম, এসমাইল হোসেন, হায়দার আলী, হারুন অর রশিদ, গৌরাঙ্গ চন্দ্র দে, ইদ্রিছ আলী, ওমর ফারুক। মঠবাড়িয়া উপজেলা: হাবিলদার আ: রাজ্জাক বিশ্বাস, নায়েক মো: মোতালেব শরীফ, রুহুল আমিন খন্দকার, আবু মিয়া, আনোয়ারুল কাদির, গণপতি হালদার, জিয়াউজ্জামান, গোলাম মোস্তফা, সালেহ আহমেদ, মানিক মিয়া, আ: মালেক, নায়েক হাবিবুর রহমান, আ: হাকিম, আ: আজিজ (আ: মজিদ)। তালিকা সূত্র: জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, পিরোজপুর (১৪.১০.২০০৮)