রাজধানীর পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে নিরীহ পথচারী বিশ্বজিত্ দাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত আসল খুনিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর গতকাল দুপুরে সচিবালয় সাংবাদিকদের কাছে বলেন, বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে জড়িত আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরো কয়েকজনকে আজই গ্রেফতার করা হবে।
মহানগর পুলিশের দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তা অবশ্য বলেন, ভিডিও ফুটেজ দেখে ও বিভিন্ন তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আসলে আটজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এদের কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
সন্ধ্যায় ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে আটজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এরা কেউ সরাসরি ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। তিনজন প্রধান ঘাতকের নাম ঠিকানা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণকারী ছয়জনকে পুলিশ শনাক্ত করেছে। তাদের এখনও গ্রেফতার করা হয়নি বলে তিনি জানান। এ গ্রেফতার নিয়ে সারা দিন ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। আসলে মন্ত্রী না পুলিশের কথা সঠিক?
সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহী উদ্দীন খান আলমগীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডটি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশের পাশাপাশি, থানা পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। আটজনকে কোন না কোন সংস্থার কর্মকর্তারা গ্রেফতার করেছে। জড়িতরা ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত। এ বিষয়টি সকলেই জানবেন এমনতো কথা নয়। আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জড়িত যেই হউক কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। জড়িত পলাতকদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে মন্ত্রী জানান। বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা সকলেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতারা দাবি করেন, বিভিন্ন অপকর্মের কারণে তাদেরকে আগেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ঢাকার আরামবাগ ও মানিকগঞ্জে প্রকৃত খুনিদের গ্রেফতারে অভিযান হয়েছে বলে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান।
গতকাল হাইকোর্ট থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনিদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছে। খুনিরা যেন বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারে সেই বিষয়ে হাইকোর্ট নির্দেশনা দিয়েছে।
তিন প্রধান খুনিকে শনাক্ত
ভিডিও ফুটেজ দেখে ও বিভিন্ন তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে গোয়েন্দা পুলিশ ও তদন্তকারী পুলিশ এবং র্যাবের একটি দল বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত প্রধান তিনজনকে শনাক্ত করেছে। তাদের সঙ্গে আরও তিনজন খুনে অংশগ্রহণ করে। তাদেরও শনাক্ত করা হয়। চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে রক্তমাখা সাদা শার্ট পরিহিত অবস্থায় বীরদর্পে খুন নিশ্চিত করে দোতলা থেকে নেমে আসে রফিকুল ইসলাম শাকিল। চাপাতি দিয়ে উপর্যুপরি কোপের সময় বিশ্বজিতের রক্তে শাকিলের শার্ট ও দেহ লাল হয়ে যায়। জিন্সের প্যান্ট ও সাদা শার্ট রক্ত মাখা ও বুকের বোতাম খোলা অবস্থায় শাকিল নিচে নেমে আসে। তার বাড়ি পটুয়াখালী সদর উপজেলার ফায়ার সার্ভিস রোডে। তার পিতার নাম আনছার আলী। শাকিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাসের ষষ্ঠ সেমিস্টারের ছাত্র। তার বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা রয়েছে। এছাড়া শাকিলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।
পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, শাকিলের বাবা আনছার আলী আয়কর বিভাগের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী ছিলেন। তিনি বর্তমানে চাকরি থেকে অবসরে রয়েছেন। শাকিল পটুয়াখালীতে এসএসসি পাস করে ২০০৬ সালে ঢাকার ধানমন্ডির একটি বেসরকারি কলেজে ভর্তি হয়। সেখানে এইচএসসি পাস করে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। তবে সে একজন সন্ত্রাসী এবং ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। পটুয়াখালীর ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তাকে চিনেন।
মাহফুজুর রহমান নাহিদ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ৮ম সেমিস্টারের ছাত্র। সে নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের চরকৈলাশ এলাকার বাসিন্দা মাওলানা মহিউদ্দিনের পুত্র।
হাতিয়া সংবাদদাতা জানান, নাহিদ হাতিয়া রহমানিয়া মাদ্রাসা থেকে আলীম পাস করে। এরপর সে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। হাতিয়া থাকাকালে নাহিদ স্থানীয় শিবিরের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তার পিতা মাওলানা মহিউদ্দিন জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। তিনি আজহারুল আলম সিনিয়র মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাফসীর এবং তিনি সেখানকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল শাখার শিবিরের সভাপতি। ২০১০ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামী তাফসীর। তিনি সেই থেকে পলাতক রয়েছে বলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা জানান। দ্বিতীয় সন্তান বিশ্বজিতের ঘাতক নাহিদ। নাহিদের বিরুদ্ধে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিপক্ষের এককর্মীকে ছুরিকাঘাত করায় তার নামে মামলা রয়েছে। সে ছাত্রলীগের ব্যানারে শিবিরের সক্রিয় কর্মী। নাহিদ রড দিয়ে বিশ্বজিতের দেহ খুঁচিয়েছে এবং নির্দয়ভাবে প্রহার করেছে।
তৃতীয় মীর মোহাম্মদ নূরে আল লিমন একই বিশ্বদ্যািলয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। ২০০৯ সালে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষককে লাঞ্ছিত করায় তাকে বহিষ্কার করা হয়। সে চাপাতি দিয়ে বিশ্বজিেক কুপিয়েছে। রড দিয়ে প্রহার করেছে। তার বাড়ি রংপুরে। লিমন ছাত্রলীগের কর্মী। উক্ত তিন প্রধান খুনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রলীগের সভাপতি শরীফুল ইসলাম গ্রুপের সক্রিয় কর্মী বলে জানা যায়। পুলিশের খাতায় এরা সন্ত্রাসী ও এলাকার চাঁদাবাজ হিসাবে চিহ্নিত। বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আরও দুইজন হচ্ছে ছাত্রলীগ কর্মী ইমদাদুল হক ও ওবায়দুল। ইমদাদুল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় ২০০৯ সালে ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত ৩৭ জনের মধ্যে সে একজন। ওবায়দুল মনোবিজ্ঞান বিভাগের অষ্টম সেমিস্টারের ছাত্র। উক্ত দুইজন রড দিয়েও কেউ চুল ধরে বিশ্বজিেক প্রহার করেছে। এছাড়া পুলিশ ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা আরেকজনের নাম জানা যায়নি।
