প্রাইম ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখায় ভয়াবহ ধরনের জালিয়াতি হয়েছে। ভুয়া গ্রাহকের নাম করে ঋণ অনুমোদন ও গ্রাহকের আবেদন ছাড়াই ঋণ বিতরণ দেখিয়ে আত্মসাত্ করা হয়েছে শত কোটি টাকা। জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ১২ কর্মকর্তার কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে বেরিয়ে আসা এ ঘটনায় ব্যাংকের বর্তমান উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জড়িত থাকার প্রমাণও মিলেছে। এই ঘটনার ফলে, ২০০৫ সাল থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত সময় ব্যাংকটির অর্জিত মুনাফা সংশোধন করতে হবে। এতে অর্জিত মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। আর মুনাফা কমে যাওয়ায় মূলধনও কমে যাবে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল জালিয়াতির ঘটনা উদঘাটন করে ইতিমধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ৩১ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে আশংকা করা হয়েছে, ব্যাংটিতে আরো বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটতে পারে। অনিয়মের ব্যাপকতা, আত্মসাত্কৃত মোট অর্থের পরিমাণ ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যাংকের ভিতরে এবং বাইরে সকল পর্যায়ের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখতে সার্টিফাইড বহিঃনিরীক্ষক নিয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সাত বছরে প্রাইম ব্যাংকের দিলকুশার ইসলামী ব্যাংকিং শাখার এক্সিকিউটিভ অফিসার কামরুল আহমেদ ফেরদৌস ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়সহ শাখার কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাত্ করেছে। ইসলামী ব্যাংকিং শাখার অপরাপর কর্মকর্তাদের যোগসাজশে, সরলতার সুযোগ কিংবা দায়িত্বে অবহেলার সুযোগে তাদের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে এ জালিয়াতি করা হয়েছে। এজন্য শত শত ভুয়া বিনিয়োগ (ঋণ) হিসাব সৃষ্টি করে শাখার বিভিন্ন জিএল (জেনারেল) হিসাব থেকে সরাসরি নির্দিষ্ট কিছু ডিপোজিট হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, কখনও কখনও লেনদেনহীন বিনিয়োগ হিসাবে নতুন করে লিমিট প্রদানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন ভুয়া সঞ্চয়ী বা চলতি হিসাবে স্থানান্তরের মাধ্যমে আত্মসাত্ করা হয়েছে। আবার কিছু কিছু বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদিত বিনিয়োগ সীমার অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে অর্থ তছরুপ করা হয়েছে। শাখার বিভিন্ন জিএল হিসাবে (সান্ড্রি হিসাব, মাইগ্রেশন হিসাব, প্রফিট রিসিভেবল হিসাব) সরাসরি ঢুকে তা সংশোধন করতে পারার সুযোগ থাকায় কামরুল আহমেদ ফেরদৌস উক্ত হিসাবসমূহকে ডেবিট বা ক্রেডিট করে অর্থ স্থানান্তর করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল দেখতে পেয়েছেন, মোট ৩৭টি সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে শতাধিক কোটি টাকা আত্মসাত্ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সিংহভাগ অর্থ আত্মসাত্ হয়েছে শাখার গ্রাহক মেসার্স নিউ এস কে এন্টারপ্রাইজের একটি চলতি হিসাবের মাধ্যমে (যার নম্বর ১০৮১১০৩০০০০৭৩৮)। ২০০৫ থেকে জুন ২০১২ পর্যন্ত সময় চলতি হিসাবটির মাধ্যমে প্রায় ৬২ কোটি টাকা আত্মসাত্ করা হয়েছে। এ ঘটনার মূল সুবিধাভোগী নিউ এস কে এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. সাজিদুর রহমান। এই সাজিদুর রহমান প্রাইম ব্যাংকেরই ডিএমডি এবং শাখার প্রাক্তন শাখা ব্যবস্থাপক আইবি চৌধুরীর (বর্তমানে সাময়িকভাবে বরখাস্তকৃত) ভাগ্নে। ২০০৫ সালে আইবি চৌধুরী দিলকুশা শাখার ব্যবস্থাপক থাকাকালে নিজে পরিচয়দানকারী হয়ে নিউ এস কে এন্টারপ্রাইজের নামে ওই চলতি হিসাবটি খোলার সুযোগ সৃষ্টি করে দেন এবং বিধিবহির্ভূতভাবে শাখার ২য় কর্মকর্তা দ্বারা ম্যানেজারের স্থানে স্বাক্ষর করিয়ে ওই চলতি হিসাব খোলার অনুমোদন দেন। পরে এ হিসাবের মাধ্যমেই অর্থ জালিয়াতির সিংহভাগ ঘটনা ঘটে।
এদিকে বিধি অনুযায়ী এক শাখায় তিনবছরের বেশি থাকার বিধান না থাকলেও প্রায় ১১ বছর ধরে কামরুল আহমেদ ফেরদৌসের ইসলামী ব্যাংকিং শাখায় থাকা এবং পরে তাকে বদলি করা হলেও সে নির্দেশনা পরিবর্তন করিয়ে আবার একই শাখায় বহাল রাখার বিষয়ে আইবি চৌধুরীর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
মূলহোতা কামরুল আহমেদ ফেরদৌস ছাড়াও অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে ইনপুটার অথবা অথরাইজার হিসেবে শাখায় ২০০৫ থেকে ২০১২ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় কর্মরত ব্যবস্থাপক হতে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার নাম পাওয়া গেছে। বেনিফিসিয়ারি হিসেবে বর্তমানে প্রধান কার্যালয়ের আইটি বিভাগের এএইচএম জাকির হোসেন, হেড অফিসের রিটেইল ডিভিশনের বাকী বিল্লাহ ও মোহাম্মদ হুমাউন কবির, বর্তমানে ওয়ারী শাখায় অপারেশন ম্যানেজার মজিদ আনসারী ও তার স্ত্রী সুলতানা ইয়াসমিন, নাসির উদ্দিন বালীসহ কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত থাকার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিনিধি দল।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ফেরদৌসকে কেন্দ্র করে শাখার অন্যান্য কর্মকর্তাসহ একটি চক্র গড়ে উঠেছিল। শাখার কতিপয় গ্রাহকও এ চক্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। আর শাখা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে চরম গাফিলতি এবং দায়িত্বহীনতা, অপারেশন ম্যানেজার ও বিভিন্ন শাখার ইনচার্জদের অবহেলার কারণেই এ ধরনের জালিয়াতি ঘটেছে যা প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ ৩৫৭টি ভুয়া বিনিয়োগ হিসাব চিহ্নিত করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন দল আরো ২৭টি ভুয়া বিনিয়োগ হিসাব পেয়েছে। তবে বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হলে এ পরিধি আরও বাড়বে। কারণ ওই শাখার এক হাজার ৪৪৫টি বিনিয়োগ হিসাবের মধ্যে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ বিনিয়োগ হিসাব পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে এবং অবশিষ্ট প্রায় এক তৃতীয়াংশ বিনিয়োগ হিসাব সময়স্বল্পতার কারণে যাচাই করে দেখা সম্ভব হয়নি। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ৩৮৪টি ভুয়া বিনিয়োগ হিসাব চিহ্নিত করা হয়েছে যার বিপরীতে বর্তমান স্থিতি পায় ১০৩ কোটি দুই লাখ টাকা। এছাড়া ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী শাখার জিএল (জেনারেল) হিসাব, মাইগ্রেশন হিসাব এবং পার্কিং হিসাব হতে স্থানান্তরের মাধ্যমে আত্মসাত্কৃত অর্থের পরিমাণ ২২ কোটি ২৩ লাখ টাকা দেখানো হলেও পরিপূর্ণভাবে এবং বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখলে আত্মসাত্ করা অর্থের পরিমাণ আরও অনেক বাড়বে। সফটওয়্যার মাইগ্রেশনের সময় কিছু প্রকৃত বিনিয়োগ হিসাবে অতিরিক্ত স্থিতি দেখিয়ে ভুয়া বিনিয়োগ হিসাব বন্ধ করা হয়েছে। বর্তমানে এ বিনিয়োগ হিসাবের গ্রাহকরা তাদের অতিরিক্ত স্থিতি কমানো বা সমন্বয় করার জন্য ব্যাংকে অভিযোগ দাখিল করেছে। ২০০৫ সাল থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত সময় ফিকটিশাস বিনিয়েগের (ঋণ) উপর অর্জিত মুনাফা সংশোধন করতে হবে। এতে অর্জিত মুনাফা (রিটেইন আর্নিং) উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। আর মুনাফা কমে যাওয়ায় মূলধনও কমে যাবে।
জানা গেছে, এ জালিয়াতির ঘটনার কারণে গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন। পরে ক্ষতিগ্রস্ত এক গ্রাহকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ জালিয়াতির ঘটনাটি প্রকাশ পায়।
জানা গেছে, এ জালিয়াতি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এ পর্যন্ত ২৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রাইম ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ১১ জন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত ও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, দুইজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট ১২ জনকে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে। একইসঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা হিসেবে মতিঝিল থানায় একটি এজাহার দাখিল করা হয়েছে যার নম্বর ৭৩। ওই এজাহারে ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ অফিসার (বর্তমানে সাময়িকভাবে বরখাস্তকৃত) কামরুল আহমেদ ফেরদৌসকে দায়ী করা হয়েছে। তবে জালিয়াতি ঘটনার ব্যাপকতার তুলনায় জালিয়াতির সহিত জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তা, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ নিতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ শৈথিল্য দেখিয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়।
