দেশের বিভিন্ন এলাকা হানাদারমুক্ত হয় আজ ১৩ ডিসেম্বর ৭১-এর এই দিনে। এ উপলক্ষে এই সবস্থানে মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় মিছিল, আলোচনাসভা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেন। খবর ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের।
বগুড়া
’৭১ এর এই দিনেই বগুড়া শহর পাক হানাদারমুক্ত হয়েছিল। ৩ দিনের ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধের পর এদিন বিকেল ৩ টায় বৃন্দাবনপাড়া সুলতান সাহেবের বাড়ির সামনে মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল পাক হানাদার বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে বিজয়ের ৩২ বছর পর প্রথম বগুড়ায় মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। শহরের জয়পুরপাড়ায় সরকারি শিশু পরিবার চত্বরে ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে এই সৌধ নির্মাণ করা হয়। বগুড়ায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ৮৭ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম এই স্মৃতিসৌধে লেখা রয়েছে।
নীলফামারী
সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ফজলুল হক জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা চোরাগোপ্তা হামলার সাথে একাধিক সন্মুখ যুদ্ধের পর মিত্রবাহিনীর সহায়তায় ১৩ ডিসেম্বর নীলফামারী জেলা সদর হানাদার মুক্ত হয়। একই দিনে উপজেলা সদর কিশোরীগঞ্জও হানাদার মুক্ত হয়। তবে উপজেলা সদর সৈয়দপুর দখলদার মুক্ত হয় আরো ২ দিন পরে। স্বাধীনতা সংগ্রামে জেলার প্রায় ৪৬ জন মুক্তিযোদ্ধা পাক সেনাদের হাতে শহীদ হন। ১৯৭১ সালে ডিসেম্বরের গোড়া থেকেই পিছু হটতে শুরু করা পাক সেনারা তেঁতুলিয়া, বোদা, দেবীগঞ্জ ও খানাসামা থেকেও পিছু হটে নীলফামারী কলেজ ক্যাম্পে জড়ো হতে থাকে। ১১ ও ১২ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর বিমান হামলায় দিশেহারা পাকসেনারা। প্রচুর পরিমাণ রসদ ফেলে ১৩ ডিসেম্বর ভোরে নীলফামারী ছেড়ে রংপুর সেনা ক্যাম্পে চলে যাওয়ার মধ্যদিয়ে হানাদার মুক্ত হয় নীলফামারী। দিনটি পালনে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচী গ্রহণ করেছে।
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল)
এই দিনে হানাদার মুক্ত হয় মির্জাপুর উপজেলা। মির্জাপুরকে হানাদার মুক্ত করার জন্য ১৮ নভেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধারা চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে। আজাদ কামাল বীর প্রতীক, এম এ সবুর বীর প্রতীক ও রবিউল কমান্ডারের নেতৃত্বে ১৩ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয় মির্জাপুর। ১২ ডিসেম্বর রাতে দেশমাতৃকার সূর্য-সন্তান বীরযোদ্ধারা মির্জাপুরের বংশাই, লৌহজং ও চতুর্দিকে পাকসেনাদের ঘিরে ফেলে। শুরু হয় তুমুল সম্মুখ যুদ্ধ। প্রায় ৫শ’ মুক্তিযোদ্ধা সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকসেনাদের পরাজিত করে। দিবসটি সরকারিভাবে যথাযোগ্য মর্যাদায় আজও পালিত হয়নি। সে দিনের স্মৃতি মনে করে মির্জাপুর ও আন্ধরা গ্রামবাসী আলোচনা সভার আয়োজন করে থাকেন। এ ছাড়া মির্জাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল এবং সর্বদলীয় জনতার উদ্যোগে আলোচনা সভা ও একটি র্যালি হবে বলে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার অধ্যাপক দুর্লভ বিশ্বাস জানিয়েছেন।
সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ)
স্বাধীনতা যুদ্ধে জয় লাভের মাত্র তিন দিন আগে-১৩ ডিসেম্বর তত্কালীন মানিকগঞ্জ মহকুমা পাকবাহিনী মুক্ত হয়। এদিন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নিকট মানিকগঞ্জ শহরের পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থিত মানোরা এলাকায় পলায়নপর পাকবাহিনী বিপুলসংখ্যক সদস্যের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ সমরে দশম শ্রেণীর ছাত্র মোঃ চাঁন মিয়া শহীদ হন। স্বাধীনতার যুদ্ধের স্মৃতিকে ধরে রাখতে প্রতিবছরের ন্যায় এবার ও মানিকগঞ্জ বিজয় মেলা মাঠে ১৩ ডিসেম্বর থেকে ১৫ দিনব্যাপী বিজয় মেলার আয়োজন করা হয়। এছাড়া বিজয় দিবস পালনের জন্য বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
কাহালু (বগুড়া)
১৩ ডিসেম্বর কাহালুবাসীর একটি স্মরণীয় দিন। মুক্তিযোদ্ধাদের চাপের মুখে পাকসেনারা ১২ ডিসেম্বর কাহালু ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পরদিন সকালে মুক্তিযোদ্ধারা বীরদর্পে কাহালুতে প্রবেশ করে কাহালু বাজার এলাকায় সর্ব প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন কাহালুর শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ আলহাজ্ব হোসেন আলী। মুক্তিযোদ্ধা কাহালু উপজেলা কমান্ড ১৩ ডিসেম্বর দিনটিকে ‘‘হানাদার মুক্ত দিবস’’ হিসেবে পালন করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
কাউখালী (পিরোজপুর)
১৯৭১ সালের এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে কাউখালীবাসীকে শত্রুমুক্ত করেন। দিনটি কাউখালীবাসীর জন্য বেদনাদায়ক হলেও আনন্দের বটে। ১৯৭১ সালে ২০ মে কাউখালীর স্টিমার ঘাট এলাকায় পরিত্যক্ত পাইলট হাউসের আওতাধীন একটি দালানে রাজাকার বাহিনী ২৫০ জন নিরীহ সাধারণ মানুষকে নৃশংসভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে।
আক্কেলপুর (জয়পুরহাট)
জয়পুরহাটের আক্কেলপুর হানাদার মুক্ত দিবস আজ। দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধের পর ১৩ ডিসেম্বর। সকাল ১০টার পূর্বে পাকসেনারা আক্কেলপুর হতে রেললাইন ধরে জয়পুরহাট অভিমুখে পালিয়ে যায়। আর রাজাকাররা গা ঢাকা দেয়। বিকেল ৩টায় মুক্তিবাহিনী আক্কেলপুর দখল করে। স্বাধীন হয় আক্কেলপুর। আক্কেলপুর হানাদার মুক্ত দিবস উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম কমান্ডের উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সংবর্ধনা দেয়া হবে।
সোনারগাঁও (না’গঞ্জ)
৪১ বছর আগে এই দিনে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিরোচিত সংগ্রামে সোনারগাঁওয়ের তিন শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা হটিয়ে দিলে পাক হানাদরদের কাছ থেকে মুক্ত করেছিল সোনারগাঁওকে। এইদিন শ্রদ্ধাভরে সোনারগাঁওবাসী স্মরণ করে তত্কালীন সময়ের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক শহীদ এ্যাডভোকেট সাজেদ আলী মিয়া ও সাবেক সংসদ সদস্য শহীদ মোবারক হোসেনকে। সোনারগাঁও সাহিত্য পরিষদ, সোনারগাঁও প্রেসক্লাব সোনারগাঁও মুক্ত দিবসে এক ঘরোয়া আলোচনার আয়োজন করেছে।
লালপুর (নাটোর)
আজ লালপুর উপজেলা মুক্ত দিবস। ২৫ মার্চ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকবাহিনী দেশীয় দালাল ও রাজাকারদের সহায়তায় লালপুরের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, নির্যাতন, অগ্নিকাণ্ড ও লুটতরাজ চালানোর পর এই দিনে লালপুর থেকে বিতাড়িত হয়।
