উপমহাদেশের সুরসম্রাট পণ্ডিত রবিশংকর আর নেই। কিংবদন্তীতুল্য এই সেতার সম্রাট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। একজন বাঙালি হিসাবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এই সেতার শিল্পী। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের কথা তুলে ধরেছিলেন পৃথিবীর মানুষের সামনে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সপক্ষে প্রচার ও মানবিক সহায়তার জন্য জর্জ হ্যারিসনের উদ্যোগে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে সেতার বাজিয়েছিলেন তিনি। পণ্ডিত রবিশংকরই প্রধানত এই অনুষ্ঠানের জন্য জর্জ হ্যারিসনকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার চলতি বছর রবিশংকরকে ‘ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ’ পদক প্রদান করে।
এই সঙ্গীতসাধকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং পণ্ডিত রবিশংকরকে বর্ণনা করেছেন ভারতের জাতীয় সম্পদ এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক দূত হিসাবে।
এই সুরসাধক গত মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সানডিয়াগো শহরের একটি হাসপাতালে মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। সেতারবাদনের এই মহান স্রষ্টা সপ্তাহখানেক ধরেই অসুস্থ ছিলেন। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। এজন্য গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। সেদিনই তাঁর হূিপণ্ডের ভাল্ব পরিবর্তন করা হয়। অপারেশনের এই ধাক্কা তাঁর দুর্বল শরীর সহ্য করতে পারেনি। ৪ঠা নভেম্বর তিনি ক্যালিফোর্নিয়াতে শ্রোতাদের সামনে সর্বশেষ বাদন উপহার দেন।
বিশ্বে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। রবিশংকরের সঙ্গীতধারার দুটি ভিন্ন দিক রয়েছে। উচ্চাঙ্গ সেতার শিল্পী হিসাবে তিনি সবসময়ই ঐতিহ্যমুখী ও শুদ্ধতাবাদী; কিন্তু সঙ্গীত রচয়িতা হিসাবে তিনি সবসময়ই নিজের সীমাকে ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। পণ্ডিত রবিশংকরের অমর কীর্তি হচ্ছে পাশ্চাত্য ও প্রতীচ্যের সঙ্গীতের মিলন। পাশ্চাত্য সঙ্গীতের বিখ্যাত বেহালাবাদক ইহুদি মেনুহিনের সঙ্গে সেতার-বেহালার কম্পোজিশন তাঁর এক অমর সৃষ্টি যা তাঁকে আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের এক উচ্চ আসনে বসিয়েছে।
বিশ্বখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী জর্জ হ্যারিসনের মতে, ‘রবিশংকর হচ্ছেন বিশ্ব সঙ্গীতের দেবপিতা।’ আরেক সঙ্গীতশিল্পী ইহুদি মেনুহিন বলেছেন, ‘রবিশংকর আমার জন্য সঙ্গীতের এক অনন্য অমূল্য উপহার নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর মাধ্যমেই আমি আমার সঙ্গীত অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যুক্ত করতে পেরেছি। আমার কাছে তাঁর সঙ্গীত প্রজ্ঞা এবং মানবিকতাকে একমাত্র মোজার্টের সঙ্গে তুলনীয় মনে হয়।’ আরেক সঙ্গীতজ্ঞ ফিলিপ গ্রাসের মতে, ‘রবিশংকরের কাছে আমার অনেক ঋণ; তিনি ছিলেন আমার শিক্ষকদের একজন।’
পণ্ডিত রবিশংকরের জন্ম ১৯২০ সালের ৭ এপ্রিল উত্তর প্রদেশের বারানসী শহরে। তার পুরো নাম রবীন্দ্র শংকর চৌধুরী যিনি ‘রবিশংকর’ নামেই বিশ্বে সুপরিচিত। ডাক নাম রবু। আদি পৈতৃক বাড়ি বাংলাদেশের নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলায়। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মাইহার ঘরানার স ষ্টা ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ সাহেবের শিষ্য রবিশংকর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ঐতিহ্য এবং ভারতীয় সঙ্গীতকে পাশ্চাত্য বিশ্বের কাছে প্রথম উপস্থাপন করেন। ছয় দশক জুড়ে পরিব্যাপ্ত কর্মজীবন। এমনকি এই সুরসম্রাট দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক কর্মজীবনের জন্য গিনেস রেকর্ডের অধিকারী।
শৈশবে ভাই উদয় শংকরের নাচের দলে কাজ করেছেন। ১৯৩৮ সালে নাচ ছেড়ে দিয়ে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কাছে সেতার শেখা শুরু করেন। ১৯৩৯ সালে ভারতের আহমেদাবাদ শহরে রবিশংকর প্রথম সাধারণের জন্য উন্মুক্ত একক সেতার পরিবেশন অনুষ্ঠান হয় ।
১৯৪৪ সালে সংগীত পরিচালক হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তাঁর। তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওর সংগীত পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সত্যজিত্ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ ‘অপরাজিত’ এবং ‘অপুর সংসার’ ছবির সংগীত পরিচালনা করে ব্যাপক প্রশংসিত হন রবিশংকর।
১৯৬৫ সালে বিটলসের জর্জ হ্যারিসন সেতারের সুর নিয়ে গবেষণা শুরু করলে রবিশংকরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয় এবং পরবর্তী সময়ে তা বন্ধুত্বে পরিণত হয়। এই বন্ধুত্ব রবিশংকরকে অতিদ্রুত আন্তর্জাতিক সঙ্গীত পরিমণ্ডলে নিজস্ব অবস্থান সৃষ্টিতে সাহায্য করে। রবিশংকর পপ সঙ্গীতের গুরু জর্জ হ্যারিসনের ‘মেন্টর’ হিসাবে পাশ্চাত্য সঙ্গীত জগতে গৃহীত হন। এর ফলে রবিশংকরকে এমন সব উত্সবে সঙ্গীত পরিবেশনের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল যা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরিবেশনের উপযোগী পরিবেশ নয়।
রবিশংকর ছিলেন চার ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। তাঁর বাবা শ্যাম শংকর ছিলেন একজন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ এবং আইনজ্ঞ। কিন্তু বাবার অনুপস্থিতিতে দারিদ্র্যের মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন তিনি। বড় ভাই উদয় শংকর ছিলেন বিখ্যাত ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী। তিনি ছিলেন প্যারিসে। রবিশংকর ১৯৩০ সালে মা হেমাঙ্গিনী দেবীর সঙ্গে প্যারিসে যান এবং সেখানেই স্কুলে ভর্তি হন। বারো বছর বয়স থেকেই রবিশংকর বড় ভাইয়ের নাচের দলের একক নৃত্যশিল্পী ও সেতার বাদক। একুশ বছর বয়সে রবিশংকর তাঁর গুরু ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ সাহেবের মেয়ে অন্নপূর্ণা দেবীকে বিয়ে করেন। এ পক্ষে সন্তান শুভেন্দ্র শংকর। পরে আমেরিকান কনসার্ট উদ্যোক্তা স্যু জোন্সের সঙ্গে সম্পর্ক হয়। এ পক্ষে কন্যা নোরা জোন্স। যিনি একজন প্রথিতযশা জ্যাজ, পপ, আধ্যাত্মিক এবং পাশ্চাত্য লোকসঙ্গীতের শিল্পী ও সুরকার। নোরা জোন্স ২০০৩ ও ২০০৫ সালে দশটি গ্র্যামি এওয়ার্ড পেয়েছেন। এরপরে রবিশংকর তাঁর গুণগ্রাহী সুকন্যা কৈতানকে বিয়ে করেন। এই পক্ষে কন্যা অনুশকা শংকরের জন্ম হয়। তিনিও একজন সেতার বাদক। ১৯৬২ সালে পণ্ডিত রবিশংকর মুম্বাইয়ে কিন্নর স্কুল অব মিউজিক এবং ১৯৬৭ সালে লস এঞ্জেলেসে কিন্নর স্কুল অব মিউজিক স্থাপন করেন।
২০০৩ সাল পর্যন্ত ৬০টি মিউজিক এলবাম প্রকাশ পেয়েছে তাঁর। ১৯৬২ সালে ভারতীয় শিল্পের সর্বোচ্চ সম্মাননা পদক ভারতের রাষ্ট্রপতি পদক লাভ করেন তিনি। এছাড়া ১৯৮১ সালে ভারতের সর্বোচ্চ সুশীল সমাজ পুরস্কার পদ্মভূষণ; ২০০১ সালে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ কর্তৃক প্রদত্ত অনারারী নাইটহুড; ২০০২ এ দুটি গ্র্যামি এওয়ার্ড; ১৪টি সম্মানসূচক ডক্টরেট; ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত পদ্মবিভূষণ, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত দেশিকোত্তম, ম্যাগসেসে পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়া ১৯৮৬ সালে ভারতের রাজ্যসভার সদস্য মনোনীত হন তিনি।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রীর শোক
শোকবাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে পণ্ডিত রবিশংকর যে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এ কারণে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাঁর মৃত্যুতে বিশ্ব একজন সুপরিচিত সমকালীন সঙ্গীতজ্ঞ এবং বাংলাদেশ তার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীকে হারাল।’
বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধে রবিশংকরের ভূমিকা বাংলাদেশের মানুষ চিরদিন স্মরণ রাখবে।
এছাড়াও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, স্পিকার মোঃ আব্দুল হামিদ এডভোকেট ও ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন। শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মোঃ নূর খান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
জেপির শোক
জাতীয় পার্টি-জেপি চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও দলের মহাসচিব সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম পণ্ডিত রবিশংকরের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, পণ্ডিত রবিশংকর ছিলেন বাংলাদেশের জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান জাতি চিরকাল স্মরণ রাখবে। তাঁর মৃত্যুতে এই উপমহাদেশের সঙ্গীত জগতের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হলো এবং সঙ্গীত জগতে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হল।
