১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর খুলনা শহরে ছিলাম। সেদিনের আনন্দ কোনো দিন ভুলতে পারবো না। মনে হয়েছিল, আমাদের আনন্দের দিন ফিরে এলো—প্রিয় মাতৃভূমি শত্রুমুক্ত হলো। এখন দেশ গড়বার সময়; কিন্তু তখনো বুঝতে পারিনি আজ দেশটা চলবে ‘অদ্ভুত এক উটের পিঠে’ চড়ে। শিক্ষা আন্দোলন, ঐতিহাসিক ছয় দফা আর কত আন্দোলনের পরে ’৭১-এ হানাদার বাহিনীকে আমরা পরাজিত করেছি। আমাদের বেঁচে থাকার আন্দোলন দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ; কিন্তু আমরা এখনো বেঁচে আছি। সামনের দিনগুলো ভয়ানক মূর্তিতে এগিয়ে আসছে। বাতাসে বারুদের গন্ধ। তাই দেশ বাঁচানোর যুদ্ধের ডাকে আবারো উজ্জীবিত হই। আমাদের আবার জেগে উঠবার সময় এসে গেছে এই প্রিয় স্বদেশকে বাঁচানোর জন্য।
১৯৭১ সালের নয় মাসের বিভীষিকাময় অধ্যায় অতিক্রম করে আমি খুলনাতেই ছিলাম। অধীর আগ্রহে রেডিওতে খবর শুনে চলেছিলাম। মিত্রবাহিনী প্লেন থেকে শত্রুদের আত্মসমর্পণ করার জন্য বার বার লিফলেট ছড়িয়ে যাচ্ছিল। চারিদিকে মাইন-বোমা-গুলিগোলা। যুদ্ধকালীন সেই বিজয়ের শিহরণ। জয়-পরাজয়ের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলে দুলছিলাম—আমরা যারা বাংলাদেশের বাইরে যেতে পারিনি। লুটতরাজের আবারও মত্ততা। সহসা কিছু স্বাধীনতা বিরোধী, মুক্তিযোদ্ধার বেশ ধারণ করে লুটতরাজ, হত্যা শুরু করলো। সবই স্বচক্ষে দেখা হলো। বেরিয়ে পড়লাম মুক্তবাংলার জোয়ার উত্সবের পথে ধ্বংস লীলার প্রতিটি আহাজারি আমার বিধ্বস্ত কলঙ্কের সাথে একাকার হয়ে। কে কার অলংকার? ছুটে গেলাম প্রথমে গল্লামারী রেডিও সেন্টারে—সেখানে স্তূপীকৃত কংকাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। রেডিও সেন্টারের সামনে বয়ে যাওয়া খাল যার দুই ধারে হাজার হাজার সদ্য হত্যাকৃত লাশের সারি। যতদূর চোখ যায় লাশের শেষ নেই। শেষ মুহূর্তে পাকহানাদারদের পরাজয়ের রোষ-কীর্তি ছিল এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। হত্যা! আর কতো! ফিরে এলাম বুকের মধ্যে— অবশ পাথর সমান যন্ত্রণা—কেমন শিথিল হয়ে এলো। পথে পথে গলিতে লাশ, ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, অপমানিতা ধর্ষিতা নারীদের চাপা ক্রন্দন। কেউবা এ কলঙ্কভারে অবনত—সমাজ বিতাড়িত। থর-থরিয়ে কাঁপছে। পাছে পাকসেনাদের কবলে পড়ে—সম্ভ্রমহানির খবর পাড়া-পড়শি জেনে ফেলে। সমাজ এর কঠোর ফতোয়া তর্জনী সইতে না পেরে আত্মহত্যাও করেছে কত নারী। আমি প্রিয়ভাষিণী তাদেরই দলের কেউ। তেমন করেই গোপন রাখতে হচ্ছিল নয় মাসের ক্ষত-বিক্ষত কাল—যেন কারো নজরে না পড়ে। সহপাঠিরা-বন্ধুজনেরা মুখের উপরে দরজা বন্ধ করেছে—আত্মীয়-স্বজন সকলেই পরিত্যাগ করেছিল বলা চলে। গ্রেফতারী পরোয়ানা বাড়িতে হাজির হয়েছিল। যখন স্বামী আহসান উল্লাহ মুক্তিযুদ্ধের পরিপূর্ণ মর্যাদাকে সংসারে আশ্রয় দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। একইভাবে আগামী প্রজন্মকে দিয়ে যেতে হবে তাদের সঠিক ঠিকানা। সেই ঠিকানার কথা কে বলবে?
লেখক :ভাস্কর
