পণ্ডিত রবি শংকরকে গত বৃহস্পতিবার নেয়া হল সান্ডিয়েগোর স্ক্রিপস মেমোরিয়াল হাসপাতালে শ্বাস কষ্ট নিয়ে। তার হার্টে অস্ত্রোপচার করে হার্ট-বাল্ব বদলিয়ে দেয়া হয় সেইদিনই। তাড়া ছিল তার ফিরে যাওয়ার। গতকাল বিকাল সাড়ে চারটায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এই সংগীত গুণীর প্রস্থানে বিশ্বে উঠেছে ক্রন্দনের রোল। সারা বিশ্বে তিনি ছিলেন ভারতের সাংস্কৃতিক ঔজ্জ্বলের প্রধান শুকতারা।
দুইজন রবি পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছেন অনায়াসে—একজন রবীন্দ্রনাথ, অপর রবি শংকর। রবির নামও ছিল রবীন্দ্র শংকর। তার মৃত্যুতে আরেক রবি শ্রী শ্রী রবি শংকর বলেছেন টুইটারে—পণ্ডিত রবি শংকর ছিলেন ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের গুরু, সংগীতকে যিনি নিয়ে গেছেন সেই মার্গে যেখানে সংগীতের সংগত তীর্থ।
আজ সকালে আমার এক মার্কিন বান্ধবী মোবাইলে খবরটি দেয়ার পর থেকে বেশ আহত আমি—যদিও তার অনেক বয়স হয়েছিল। ১৯২০ সালের ৭ এপ্রিল তার জন্ম। আমার চেয়ে ১৭ বছরের বড় তিনি। তা হলে কী হবে—একজন তরুণ শিল্পীকে তিনি গভীর ভালবাসায় আপ্লুত করেছিলেন যখন তার সঙ্গে প্রথম দেখা হয় ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক সংগীত সম্মেলনে। তাকে এবং জ্যাক বর্নফকে যখন আমার বয়ে নিয়ে যাওয়া উপহার একতারাটি দান করলাম—তিনি টুংটুং করে বাজালেন এবং বললেন, এ যন্ত্রটি তার সবচেয়ে প্রিয়, অবশ্যই তা সেতারের পরে। সেতারের তার সাতটি, একতারায় একটি। বললাম, একতারার দেশের মানুষ আপনাকে ভালবাসে। তাদের ধারণা, আপনি আমাদেরই লোক। জন্ম বারানসিতে হলেও পিতা ব্যারিস্টার শ্যাম শংকর যশোরের। লোকে ভুলে গেলেও আমরা ভুলিনি। সূর্য উঠলে—সে তো সবার। অনায়াসেই জড়িয়ে ধরলেন আমাকে এবং বললেন, হোটেলে আমার ঘরে এস, তোমার গান শুনব। এর কয়েক বছর পর দেখা শান্তিনিকেতনে। এক নজরেই চিনতে পারলেন এবং আমার স্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী বেশ কয়েকটি ছবি তোলা হল আমার ক্যামেরায়। জিজ্ঞেস করলাম অন্তরঙ্গ কিছু প্রশ্ন। তার লেখা আত্মজীবনী ‘রাগ অনুরাগ’ গ্রন্থে নিজের কথা যেখানে বলেছেন অকপটে। তার একটি হল—সুন্দরের পূজারি তিনি। সুন্দরের আহবানে তাই তার সাড়া। আমার প্রশ্ন : পথে দেরি হলে অরূপসুন্দরের কাছে পৌঁছানো যাবে কেমন করে, যে আধ্যাত্মিকতায় স্পর্শিত আলাউদ্দিন বাবার সাধনা। উত্তর দেননি। বলেছেন, স্যান্ডিয়েগোতে এসো।
আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে তার অসামান্য অবদান। জর্জ হ্যারিসনকে সঙ্গে নিয়ে সমস্ত পৃথিবী মাতিয়ে তুলেছিলেন তিনি। আমার একান্ত ইচ্ছা ছিল তাকে বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব দান করার। শিশুর সারল্যে উনি আমার কথায় নেচে উঠলেন। বললাম, আপনি বাংলাদেশে যখন আসতে চান, আমাকে জানাবেন। ঢাকায় ফিরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করার পর বুঝলাম—আমাদের কথায় কিছুই হবে না।
রুদ্রবীণা, রাবাব এবং সুরসিঙ্গার তিন যন্ত্রেই তিনি শিক্ষা করেছেন আলাউদ্দিন খানের কাছে। তার সঙ্গে একই সঙ্গে শিখেছেন আলী আকবর খান ও অন্নপূর্ণা দেবী। আমার মনে পড়ে ভিয়েনায় তার বাজনা শুরু হলে, সেই বিরাট রাজকীয় অর্কেষ্ট্রা হলে ছিল পিনপতন নিস্তব্ধতা—সত্যিকারের সমঝদার হাতেগোনা। বাকিরা ‘ফ্যাড’-র অনুগামী।
পণ্ডিত রবি শংকর ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক কাউন্সিলের সভাপতি। আর আমি বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি [১১ বছর]। সন্তুর শিল্পী শিবকুমার শর্মা বলেছেন, তার প্রস্থান শুধু আমাদের সংগীত নয়, পৃথিবীর সংগীতের ক্ষতি। ঔপন্যাসিক হরি কুনজুরু লিখছেন, আমার পিতা তার অস্ত্রোপচার করেছেন। কি কঠিন ছিল তার কাজ। তার বাজনা আজ টেলিভিশন, রেডিও খুললেই পাওয়া যাচ্ছে। রবি অস্ত গেছেন, সুরের অস্ত নেই।
লেখক : সাহিত্য-সংগীত ব্যক্তিত্ব, ১২ ডিসেম্বর, ২০১২
