পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ব্যাপারে মামলা দায়েরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ সত্ত্বেও সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী ও জাতীয় সংসদের হুইপ নূরে আলম চৌধুরীর ভাই নিক্সন চৌধুরীকে বাদ দিয়েই মামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। শেষ মুহূর্তে কোনো পরিবর্তন না হলে আজ বৃহস্পতিবার সাত জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে।
তবে, উল্লেখিত তিন জনকে বাদ দিয়ে মামলা করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে দুদকের দুই কমিশনার কোনো মন্তব্য করেননি। এ বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, ‘কমিশন যাচাই-বাচাই করে ব্যবস্থা নিচ্ছে। দালিলিক তথ্য ছাড়াতো কারো বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না।’
জানা গেছে, অনুসন্ধান কমিটির দেয়া প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষ করে দুদকের দুই কমিশনার গতকাল বুধবার কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে তাদের মতামত জানান। পরে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের সঙ্গে পরামর্শ করে দুদক চেয়ারম্যান কমিশনারদের জরুরি বৈঠক ডাকেন। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, পদ্মা সেতু দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আজ মামলা দায়ের করা হবে। দুর্নীতির অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের জন্য দণ্ডবিধির ১২০(খ) ধারা, ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫/২ ধারা এবং পরস্পরের যোগসাজশে অপরাধ সংগঠনের জন্য দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় এই মামলা করা হবে।
দুদক কমিশনার শাহাবুদ্দিন চুপ্পু ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা দুই কমিশনার অনুসন্ধান প্রতিবেদন এবং তার সুপারিশের আইনগত দিক নিয়ে পর্যালোচনা শেষ করেছি। দুদক ষড়যন্ত্রকারীদের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে। বৃহস্পতিবারই এজাহার দায়েরের জন্য আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে। কোনো কারণে ওই দিন সম্ভব না হলে রবিবার অবশ্যই তা করা হবে।’ মামলার আসামির সংখ্যার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ষড়যন্ত্রকারী চিহ্নিত করেছি। পরোক্ষ ষড়ন্ত্রকারীরা পর্যবেক্ষণে রয়েছে।’
গতকালের বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ নভেম্বর দুদকের অনুসন্ধান টিম ৮৮ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন কমিশনে দেন। এ প্রতিবেদনে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সংসদের হুইপ নূরে আলম চৌধুরীর ভাই নিক্সন চৌধুরী, সাবেক সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দরপত্র মূল্যায়নে গঠিত কমিটির সদস্য সচিব কাজী ফেরদৌস, সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের, এসএনসি-লাভালিনের স্থানীয় এজেন্ট মো. মোস্তফা এবং এর তিন কর্মকর্তা সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেস, আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ সাহা ও সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ ইসমাইলের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয়। এরপর প্রতিবেদনের বিষয়ে মতামত ও মামলার সুপারিশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দুদকের আইন উপদেষ্টা আনিসুল হককে দায়িত্ব দেয়া হয়। দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান তার কাছে জানতে চান, অনুসন্ধান টিমের প্রতিবেদন অনুযায়ী মামলা করা যায় কিনা! মামলায় আবুল হোসেনকে আসামি করা হলে আদালতে টিকবে কিনা তার বিষয়েও মতামত দিতে বলা হয়। দুদকের আইন উপদেষ্টা জানান, মামলায় সাবেক দুই জন মন্ত্রীকে আসামি করা হলে আদালতে অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব হবে না। এরপর কমিশন কয়েক দফা বৈঠকের পর সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী ও নিক্সন চৌধুরীকে বাদ দিয়ে সাত জনের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, এ অনুসন্ধান প্রতিবেদনে ১০ জনকে দায়ী করা হয়েছে। অনুসন্ধান টিম তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সুপারিশ করলেও দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, কমিশনার এম বদিউজ্জামান, এম সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ও আইন কর্মকর্তা আনিসুল হক প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে এ তিনজনকে বাদ দেন।
কমিশনে জমা হওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, এসএনসি-লাভালিনকে কাজ পাইয়ে দিতেই ঘুষ লেনদেনের আলোচনা হয়েছে। সে অনুযায়ী ষড়যন্ত্র করে দরপত্রে অংশগ্রহণকারী অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে পেছনে রাখতে বারবার দরপত্র কমিটি পরিবর্তন করা হয়েছে এবং পরামর্শক সংস্থা নিয়োগের কাজটি চূড়ান্ত করতে এক বছর ১০ মাস সময়ক্ষেপণের বিষয়টিই সন্দেহজনক ও দুর্নীতির ষড়যন্ত্র। ষড়যন্ত্রও আইনের ভাষায় একটি অপরাধ। সে হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে গত ২৯ জুন বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করে। পরে সরকার অভিযোগ অনুসন্ধানে বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি সই করার পর ‘শর্তসাপেক্ষে’ বিশ্ব ব্যাংক আবার অর্থায়নে ফিরে আসার ঘোষণা দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল গত ১৪ অক্টোবর ও ১ ডিসেম্বর দুই দফায় ঢাকায় এসে দুদককে কিছু পরামর্শ দেয়। এরপর গত শনিবার বিশ্ব ব্যাংকের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়, দুদক নিরপেক্ষ তদন্ত না করলে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন করবে না দাতা সংস্থাটি।
