আল্লামা মুফতি ফজলুল হক আমিনী আর নেই। মঙ্গলবার রাত সোয়া ১২টায় হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তিনি ছিলেন ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান, ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির আমীর, বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের সহ-সভাপতি, লালবাগ জামেয়া ও বড় কাটারা মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও সাবেক এমপি। ফজলুল হক আমিনী স্ত্রী, দুই ছেলে ও চার মেয়ে, ছাত্র, কর্মী-সমর্থক-গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। হাফেজ মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নামাজের জানাজা গতকাল বেলা সোয়া তিনটায় জাতীয় ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হয়। স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজা শেষে তাকে লালবাগ শাহী মসজিদের সংরক্ষিত গোরস্তানে দাফন করা হয়েছে। বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও পীর-মাশায়েখরা জানাজায় অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখেন। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন লালবাগ মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা আবদুল হাই।
মুফতি আমিনী প্রায় ২১ মাস ধরে গৃহবন্দী ছিলেন। মঙ্গলবার এশার পর লালবাগ শাহী মসজিদে একটি জানাজা নামাজের ইমামতি করেন তিনি। রাতে বাসায় যাওয়ার পর হূদরোগে আক্রান্ত হন। মুফতি আমিনী ছিলেন ডায়বেটিস রোগে আক্রান্ত। ২০০৭ সালে একবার ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছুদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মুফতি আমিনী মাদরাসা থেকে লালবাগের বাসায় ফিরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় তাকে প্রচণ্ড অসুস্থ মনে হচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার দেহ নিথর হয়ে পড়ে। দ্রুত তাকে ধানমন্ডি ইবনে সিনা হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গভীর রাতে তার মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। ইসলামী আন্দোলন ও কওমী মাদরাসা অঙ্গনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা রাতেই লালবাগ মাদরাসায় এসে ভীড় করেন। ফজরের আগেই গোসল দিয়ে দর্শনার্থীদের জন্য তার মরদেহ লালবাগের দারুল হাদীসে রাখা হয়। হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘ কাতারবন্দী হয়ে তার মরদেহ দেখেন।
এদিকে আমিনীর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কওমী মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক-ইসলামী কর্মীরা বাস ভরে দলে দলে রওনা দেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। গতকাল বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ঈদগাহে জমায়েত হতে থাকেন তারা। বেলা আড়াইটার মধ্যে ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এরপর বিরাট সন্নিহিত এলাকা ভরে ওঠে। রাজনৈতিক নেতা ও পীর-মাশায়েখরা মুফতি আমিনীর বর্ণাঢ্য জীবনী নিয়ে মাইকে বক্তব্য রাখেন। এখানে তার ভক্তদের হূদয়বিদারক কান্নায় পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে।
১৮ দলীয় জোটের প্রধান শরীক বিএনপি নেতাদের মধ্যে জানাজায় বক্তব্য রাখেন স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, মির্জা আব্বাস, এমকে আনোয়ার, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, বরকত উল্লাহ বুলু, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, চরমোনাইয়ের পীরের প্রতিনিধি মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দিন, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব আব্দুল লতিফ নেজামী, খেলাফত আন্দোলনের মাওলানা শাহ আহমেদুল্লাহ আশরাফ, মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, শফিউল আলম প্রধান প্রমুখ।
এদিকে ১৮ দলের নেতা ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ফজলুল হক আমিনীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া। এক শোকবাণীতে বিএনপি প্রধান বলেন, দেশবরেণ্য ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা ফজলুল হক আমিনীর অবদান এ দেশের মানুষ কখনো ভুলে যাবে না। বর্তমান আওয়ামী সরকারের অপশাসন ও অপকীর্তির বিরুদ্ধে মাওলানা আমিনীর কণ্ঠস্বর ছিল সাহসী ও মানুষের মৌলিক অধিকারের পক্ষে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে আমিনীকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছিলো বলে শোকবাণীতে অভিযোগ করেছেন খালেদা জিয়া।
বিএনপি চেয়ারপার্সন ফজলুল হক আমিনীর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকাহত পরিবারের সদস্য, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।
সংক্ষিপ্ত জীবনী
১৯৪৫ সালের ১৫ নভেম্বর বি-বাড়ীয়া জেলার আমীনপুর গ্রামে মুফতি ফজলুল হক আমিনীর জন্ম। বি-বাড়ীয়া জামেয়া ইউনুসিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষে মুফতি আমিনী মুন্সিগঞ্জ জেলাধীন বিক্রমপুরের মোস্তফাগঞ্জ মাদরাসায় তিন বছর পড়াশুনা করেন। তারপর উচ্চ শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৬১ সালে লালবাগ মাদরাসায় চলে আসেন। এখানে দাওরায়ে হাদীসের সনদ লাভ করেন। পরে করাচী থেকে তিনি উলুমুল হাদীস ও ইসলামী আইনের উপর বিশেষ ডিগ্রি অর্জন করে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
আমিনীর মৃত্যুতে শোক
জাতীয় পার্টি-জেপি’র চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও মহাসচিব সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম গতকাল বুধবার ইসলামী ঐক্যজোটের এক অংশের চেয়ারম্যান মুফতি ফজলুল হক আমিনীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তারা বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর আমীর মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করীম পীরসাহেব চরমোনাই ও মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে তারা বলেন, আমিনী বাতিল, নাস্তিক-মুরতাদ ও খোদাদ্রোহী শক্তির মোকাবিলায় সবসময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করতেন। মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের আমীর ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী ও সেক্রেটারি জেনারেল ড. মওলানা মুহাম্মদ এনামুল হক আজাদ, খাদেমুল ইসলাম জামায়াতের আমীর মুফতি রুহুল আমীন ও সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা কামরুজ্জামান কবির, খাদেমুল ইসলাম যুব পরিষদের সভাপতি মাওলানা আজিজুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মুফতি মুহাম্মদ তাসনীম, খাদেমুল ইসলাম ছাত্র পরিষদের সভাপতি সরদার ইমরান হোসাইন ও সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল্লাহ ইদ্রিস গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
এছাড়া বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ ও মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ এমপি ও মহাসচিব শামিম আল মামুন, জাতীয়তাবাদী পেশাজীবী পরিষদের সভাপতি আবুল কাসেম হায়দার ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান, ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গণি ও মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া, মুসলিম লীগের সভাপতি এএইচএম কামরুজ্জামান খান ও মহাসচিব আতিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মিছবাহুর রহমান চৌধুরী, এনপিপি চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নিলু গভীর শোক প্রকাশ করেন। তারা মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
