বিজয়ের মাস

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২৯
ইতিহাসের এই দিনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্স আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে শিগগিরই যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। তিনি ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ চায় না, তবে যুদ্ধ বাধলে যুক্তরাষ্ট্র তাতে জড়িয়ে পড়বে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বললেও এ দিনই বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রা শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর। এদিকে, ১৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মুলতবি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব তৃতীয়বারের মত সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো দেয়ার ফলে বাতিল হয়ে যায়। এদিকে, ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী ঢাকার পতন দ্রুততর করার প্রয়োজনে যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করে। কেননা ঢাকার পতন হলে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের পরাজয় চূড়ান্ত হবে। একাত্তরের এই দিনে পূর্ব ও উত্তর দিক থেকে মিত্রবাহিনী ঢাকার প্রায় ১৫ মাইলের মধ্যে পৌঁছে যায়। ৫৭ নম্বর ডিভিশনের দুটো ব্রিগেড এগিয়ে আসে পূর্ব দিক থেকে। উত্তর দিক থেকে আসে জেনারেল গন্ধর্ব নাগরার ব্রিগেড এবং টাঙ্গাইলে নামা ছত্রিসেনারা। পশ্চিমে ৪ নম্বর ডিভিশনও মধুমতী পার হয়ে পৌঁছে যায় পদ্মার তীরে। রাত নয়টায় মেজর জেনারেল নাগরা টাঙ্গাইল আসেন। ব্রিগেডিয়ার ক্লের ও ব্রিগেডিয়ার সান সিং সন্ধ্যা থেকে টাঙ্গাইলে অবস্থান করছিলেন। রাত সাড়ে নয়টায় টাঙ্গাইল ওয়াপদা রেস্ট হাউসে তারা পরবর্তী যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় বসেন। এদিন লে. কর্নেল শফিউল্লাহর ‘এস’ ফোর্স ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে ঢাকার উপকণ্ঠে ডেমরা পৌঁছায়। সৈয়দপুরে এদিনে আত্মসমর্পণ করে ৪৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়কসহ ১০৭ পাকিস্তানি সেনা। ইতিহাসের এই দিনে যৌথবাহিনীর অগ্রবর্তী সেনাদল শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী অতিক্রম করে ঢাকার ৫-৬ মাইলের মধ্যে পৌঁছে যায়। বালু নদীর পূর্বদিকে পাকিস্তানি বাহিনী স্বীয় পরিসীমায় এক শক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এদিকে বগুড়া জেলায় মুক্তিবাহিনীর গেরিলা দল মহিমাগঞ্জের দুলুর নেতৃত্বে ও সিহিপুরের বাবলু, খালেক, হামিদ, খলিল, নূরুল, শুকু, ফিনু, জগলু, হাল্লু, লিন্টু এবং আরো অনেকের সহযোগিতায় সুকানপুকুর রেল স্টেশনের কাছে সিহিপুরে পাকিস্তানি সৈন্যবাহী একটি স্পেশাল ট্রেন ডিনামাইটের সাহায্যে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এতে প্রায় দেড়শত পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। কুমিল্লায় মুক্তিবাহিনী চাওড়া এলাকায় অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়। এই সংঘর্ষে ২ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত ও ৩ জন আহত হয়। আক্রমণ শেষে মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদে নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে আসে। ৮ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনী একদল পাকিস্তানি সেনাকে রাজাপুর নামক স্থানে এম্বুশ করে। এই এম্বুশে পাকবাহিনীর ৪ জন সৈন্য নিহত ও ২ জন আহত হয়। মুক্তিবাহিনী কুষ্টিয়া জেলার প্রতাপপুর এলাকায় পাকসেনাদের এম্বুশ করে। এই এম্বুশে পাকবাহিনীর ১১ জন সৈন্য নিহত ও ৪ জন আহত হয়। ২ নম্বর সেক্টরে সুবেদার মেজর লুত্ফর রহমানের নেতৃত্বে এক প্লাটুন যোদ্ধা লক্ষ্মীপুর রাজাকার ঘাঁটি আক্রমণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের আকস্মিক আক্রমণে অনেক রাজাকার হতাহত হয়। এই সংঘর্ষে এলাকার জনসাধারণ বিশেষভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করে। ৬ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সহায়ক সৈন্যদের সম্মিলিত বাহিনীর বীর যোদ্ধারা ভুরুঙ্গামারী পাকসেনা অবস্থানের ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়। এই যুদ্ধে বহু পাকসৈন্য নিহত ও ৩ জন পাঞ্জাবি সৈন্য বন্দী হয় এবং ভুরুঙ্গামারী থানা মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে। এই অভিযানে ভারতীয় সহায়ক বাহিনীর নেতৃত্ব দেন ব্রিগেডিয়ার যোশী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালনা করেন সেক্টর কমান্ডার কেএম বাশার ও সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর নওয়াজেশ।