মো. লুত্ফুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি
কুমিল্লায় কিশোর অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে চলেছে। নগরীর নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ কিশোর বয়সে জড়িয়ে পড়ছে খুন করার মতো ভয়ংকর অপরাধে। তারা গড়ে তুলছে বিভিন্ন কিশোর গ্যাং বা গ্রুপ। কোনো অপরাধে জড়াতেই তারা ভয় পাচ্ছে না। অপরাধ জগতে পা বাড়ানো এসব কিশোর শিক্ষার্থীদের দ্বারা সংঘটিত রোমহর্ষক ঘটনায় অভিভাবকসহ নগরীর বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোকজনের মাঝে রীতিমত আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুলিশের কর্মকর্তা, শিক্ষক-অভিভাবক, আইনজীবী ও সচেতন নাগরিকের সঙ্গে কথা বলে কিশোর বয়সে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার নেপথ্যে নানা কারণের কথা ওঠে এসেছে।
জানা যায়, সম্প্রতি স্কুল শিক্ষার্থী কিশোর গ্যাং গ্রুপের কয়েকটি ঘটনায় কুমিল্লা নগরজুড়ে বেশ আলোচনার ঝড় তুলে। তুচ্ছ ঘটনায় গত ২১ এপ্রিল শবে বরাতের রাতে নগরীর ঠাকুরপাড়া এলাকায় কিশোর অপরাধীদের হাতে ছুরিকাঘাতে নিহত হয় মুমতাহিন হাসান মিরণ নামে এক স্কুলছাত্র। নিহত মিরণ কুমিল্লা নগরীর মডার্ন হাইস্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্র ছিল। সে জেলার আদর্শ সদর উপজেলার ঝাগুরজুলি বিষ্ণপুর গ্রামের সিঙ্গাপুর প্রবাসী আবুল কালাম আজাদের ছেলে। ওই স্কুলের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সামনে-পেছনে সিটে বসা, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব এবং ‘বড় ভাই ছোট ভাই’ সম্বোধন নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার দুই আসামি মো. আমিন ও সৌরভ হোসেন পল্টুকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। গত ২৫ এপ্রিল ভোরে চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকা থেকে কুমিল্লা কোতোয়ালি থানা পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত আমিন নগরীর ঠাকুরপাড়া এলাকার ফজিলাতুন্নেছা মডার্ন হাই স্কুলের ৭ম শ্রেণির ছাত্র ও জেলার মুরাদনগর উপজেলার পালাসুতা গ্রামের নোয়াব মিয়ার ছেলে এবং পল্টু স্কুল থেকে ঝরেপড়া কিশোর ও ঠাকুরপাড়ার আলমগীর হোসেনের ছেলে। এ চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর নগরীর স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ বিভিন্ন মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।
এর আগে গত ২১ এপ্রিল বিকালে নগরীর নুরপুর এলাকায় দুই কিশোর ছাত্রের ছুরিকাঘাতে আহত হয়ে ২৩ এপ্রিল মারা যায় অটোরিকশা চালক শাহজাহান। অভিযোগ রয়েছে- ভাড়া নিয়ে বাগবিতণ্ডার জের ধরে স্কুল ছাত্র ইরফান, হূদয় ও তার সঙ্গীয়রা তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা শাহজাহানকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর চিকিত্সাধীন অবস্থায় দুই দিন পর তিনি মারা যান। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।
গত ১৬ এপ্রিল কুমিল্লা কালেক্টরেট স্কুলের এক ছাত্রের ছুরিকাঘাতে আহত হয় কুমিল্লা জিলা স্কুলের ছাত্র মারুফ। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায় সহপাঠীরা। এ ঘটনায় দুটি স্কুল কর্তৃপক্ষই কমিটি গঠন করে ঘটনার তদন্ত করছে।
গত ১০ মার্চ নগরীর দিশাবন্দ এলাকায় ক্রিকেট খেলায় তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে সাজ্জাতুল ইসলাম (১৬) নামে এক তরুণকে নগরীর চর্থা এলাকার ইউসুফ নামের এক কিশোর স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। নিহত সাজ্জাতুল নেওড়া হাইস্কুলের ৯ম শ্রেণির ছাত্র ও দিশাবন্দ গ্রামের প্রবাসী শফিকুল ইসলামের ছেলে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।
২০১৮ সালের ১১ জুলাই রাতে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে কুমিল্লা অজিতগুহ কলেজের ছাত্র অন্তুকে (১৮) নগরীর ধর্মসাগরপাড়ে খুন করে তার সহপাঠীরা। প্রেম সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। সে কুমিল্লা নগরীর রেইসকোর্স এলাকার হুমায়ূন কবিরের ছেলে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।
২০১৭ সালের ২৭ মে সন্ধ্যায় নগরীর নজরুল এভিনিউ এলাকায় ব্রিটানিয়া ইউনিভার্সিটির বিবিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র শাহজাদা ইসলামকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে জখম করে একটি সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং। এ ঘটনায় ২৯ মে নিহত শাহজাদার বাবা শহিদ মিয়া বাদী হয়ে স্কুলছাত্র শাফায়েত উল্লাহ শৈকতকে প্রধান আসামি করে ৭ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন। আসামিদের সকলেই স্কুল ছাত্র। ঘটনার পর দিন মডার্ন স্কুলের ৯ম শ্রেণির ছাত্র অর্পণ আশ্চার্য দীপসহ কয়েকজন স্কুল ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়।
কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির কারণ প্রসঙ্গে কুমিল্লা জিলা স্কুলের শিক্ষক দেবরাজ ঘোষ বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান বিশ্বায়নের যুগে অনুপযোগী পাঠক্রম যা ছাত্রদের আকর্ষণে ব্যর্থ, অপসংস্কৃতি চর্চা, মাদক, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, পিতা/অভিভাবকের সান্নিধ্য থেকে দূরে অবস্থান, রাজনৈতিক কিংবা এলাকার ‘বড় ভাইদের’ দ্বারা বিপথগামী হওয়া, অসাধু ছাত্রনেতার সান্নিধ্যসহ নানা কারণে এসব শিক্ষার্থী কিশোর ও তরুণরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পিপি, লেখক ও গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. গোলাম ফারুক বলেন, ‘আমাদের পারিবারিক শিক্ষার ধরন অনেকটা বদলে গেছে। শহরের অনেক পরিবারে পিতা-মাতা দুইজনই কর্মজীবী হওয়ার কারণে একদিকে সন্তান যেমন স্নেহের পরশ পাচ্ছে না, অপরদিকে সন্তানকেও তারা নজরদারি করতে পারছেন না। ইট-পাথরের নগরীতে শিশু-কিশোরদের জন্য আগের মতো নেই খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা। অভিভাবকের অনুপস্থিতির সুযোগে তারা বাজে সংস্কৃতির চর্চা করছে। বিনোদন এখন টিভি আর মোবাইল ফোনে আবদ্ধ। প্রযুক্তির অপব্যবহার হচ্ছে। বায়োনিক তথা অতিমানব হওয়ার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। এসব কারণে তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে।’
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পদোন্নতিপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার) আবদুল্লাহ আল-মামুন জানান, ‘কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন থেকে এরই মধ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া নগরীতে কিশোর অপরাধীদের বিভিন্ন গ্যাংয়ের বিষয়ে প্রশাসন কড়া দৃষ্টি রাখছে।
