নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী বন্ধুরা, আবদুল হাকিম রচিত ‘বঙ্গবাণী’ ’ কবিতাটি বুঝানোর জন্য শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যেভাবে বক্তব্য দিতে পারেন এবং তোমরা কবিতাটির মূলভাব অনুধাবন করতে পার, সেভাবে তোমাদের জন্য শ্রেণিশিক্ষা পর্বে কবিতাটির মর্মকথা তুলে ধরেছেন প্রভাষক কামাল মুহম্মদ।
‘বঙ্গবাণী’ কবিতাটি বুঝানোর জন্য শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যেভাবে বক্তব্য দিতে পারেন এবং ছাত্র-ছাত্রীরা কবিতাটির মূলভাব অনুধাবন করতে পারে সেভাবেই তোমাদের জন্য শ্রেণিশিক্ষা পর্বে কবিতাটির মর্মকথা তুলে ধরছেন— কবি কামাল মুহম্মদ।
কবি সম্পর্কে ধারণা: কবি আবদুল হাকিম সম্ভবত ১৬২০ খ্রিস্টাব্দে সন্দীপের সুধারামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কবি আবদুল হাকিম মধ্যযুগের অন্যতম প্রধান কবি ছিলেন। তাঁর কাব্য চেতনায় আমরা স্বদেশপ্রেম ও স্বভাষার প্রতি অসীম দরদ ফুটে উঠতে দেখি। মধ্যযুগে এরকম করে মাতৃভাষার জন্য আর কোনো কবি ভেবেছেন কিনা তার নজির এখনো দেখা যায় না। আমরা বাংলা ভাষার জন্য প্রথম প্রতিবাদ শিখি আবদুল হাকিমের কাছ থেকে এবং বাংলাকে ভালোবাসার বিষয়টিও উপলব্ধি করি তাঁর কাছেই। কবি আবদুল হাকিম উপলব্ধি করেছিলেন নিজের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হলে প্রথমে নিজের ভাষার মান রক্ষা করতে হবে। এ বিষয়টি চিন্তা করেই তিনি ‘বঙ্গবাণী’ কবিতাটি রচনা করেছিলেন। আবদুল হাকিমের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ নূরনামা। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ইউসুফ জুলেখা, লালমতি, সয়ফুলমুলুক, শিহাবুদ্দিনামা, নসীহত্নামা, কারবালা ও শহরনামা। আব্দুল হাকিমের কবিতায় স্বকীয় চিন্তা আর শিল্পের উত্কর্ষতা অপরিসীম। এই কবিরত্ন ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
বঙ্গবাণী
আবদুল হাকিম
কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।
সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ\
তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন,
নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন\
আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।
দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ\
আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুইমত,
যদি বা লিখলে আল্লা নবীর ছিফত\
যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ
সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন\
শ্রেণিশিক্ষা: কবি আবদুল হাকিমের ‘বঙ্গবাণী’ কবিতাটি নেয়া হয়েছে তাঁর শ্রেষ্ঠগ্রন্থ ‘নূরনামা’ থেকে। মধ্যযুগে এরকম বাংলা ভাষার প্রতি অসীম দরদ বিরল।
আমরা ‘বঙ্গবাণী’ কবিতাটি পাঠ করে এই বিষয়টিই উপলব্ধি করি যে, নিজের ভাষার চেয়ে পৃথিবীতে মহান কিছু নেই। কেননা মাতৃভাষাই জগতে শ্রেষ্ঠ। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। তাই বাংলাতেই আমরা আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করি।
‘বঙ্গবাণী’ কবিতাকে আবদুল হাকিম অন্য ভাষার প্রতি কোন প্রকার বিদ্বেষ পোষণ করেননি। তিনি বলেছেন, আরবি, ফারসি শাস্ত্রে নেই কোন রাগ, এবং আরও বলছেন, আরবি, ফারসি হিন্দে নাই দুই মত। যদিবা লিখে আল্লা নবীর ছিফত। বিষয়টি উপলব্ধি করে আবদুল হাকিম বলেছেন অন্য ভাষার প্রতি কোনোই ক্ষোভ নেই। কেননা এসব ভাষাতে ও আল্লাহ ও নবীর স্তুতি বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কবির রাগ সেখানেই যিনি নিজের ভাষাকে অবজ্ঞা করে অন্যের ভাষায় কথা বলতে চায়। অন্যের সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতির চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে। প্রত্যেক ভাষাই আল্লাহর সৃষ্টি। তারপরও প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ভাষা রয়েছে, আর সেই ভাষার মর্যাদা রক্ষা করাও তারই উচিত যে যে ভাষায় কথা বলে।
আমরা কালে কালে দেখেছি বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী এই ভূখন্ডে এসেছে শাসন করতে, তারা এসে বাংলা ভাষার প্রতি আঘাত এনেছে। এবং দেশীয় অনেক অর্ধশিক্ষিত মানুষকে বাংলা বিদ্বেষী করে তুলেছে—তা মধ্যযুগেও টের পেয়েছিলেন কবি আবদুল হাকিম। এ বিষয়টি উপলব্ধি করেই তিনি লিখেছিলেন, ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’ বাংলাতে জন্মে যার বাংলার প্রতি টান নেই তাদের জন্ম পরিচয় নিয়ে কবির সন্দেহ হয়। এবং নিজের দেশের বিদ্যার প্রতি যার কোনো অনুরাগ নেই, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধ নেই তাদেরকে তিনি দেশ ছেড়ে চলে যাবার কথা বলেছেন।
আমরা ‘বঙ্গবাণী’ কবিতাটিতে এই বিষয়টিই জানতে পারি যে, আমাদের নিজের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও যত্নবান হতে হবে। নিজের ভাষাকে বিকৃত করে উচ্চারণ করলে আসলে নিজেকেই বিকৃত করা হয়। প্রকৃত বাংলা চর্চাই হোক আমাদের শিক্ষার মূল লক্ষ্য।
