একটি জাতির উন্নয়নে ও উন্নত সভ্যতা নির্মাণের প্রথম ও প্রধান শর্ত হচ্ছে শিক্ষা। আমাদের দেশের প্রায় ৮৫ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই হচ্ছে বেসরকারি। সরকারি ও বেসরকারি অন্যান্য সংস্থা/প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চাকরিজীবীদের প্রতি বছরই বেতন বৃদ্ধি পায় বা বেতনস্কেলের সঙ্গে একটি ইনক্রিমেন্ট যোগ হয়। কিন্তু খুবই দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি পায় না।
কথায় বলে অনিয়মে রাজ্য চলে না। অথচ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীদের চাকরিবিধি নেই। চাকরিবিধি না থাকার কারণে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা নিয়ন্ত্রিত হয় প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও জিবি/ম্যানেজিং কমিটি ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। ফলে কর্মচারীরা নানা ধরনের নির্যাতন-হয়রানি-পেরেশানির শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত হলে কর্মচারীরা কোর্টের দ্বারস্থ হতেও বাধা-বিঘ্নের সম্মুখীন হয় চাকরিবিধি না থাকার কারণে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত দু-লক্ষাধিক তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে চাকরিবিধি বাস্তবায়নের সরকারি জিও পর্যন্ত হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত সে চাকরিবিধি বাস্তবায়ন হয়নি।
বেসরকারি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি / জিবি শিক্ষকদের প্রতিনিধি আছে। যার ফলে শিক্ষকগণ তাঁদের সুবিধা-অসুবিধার কথা ম্যানেজিং কমিটি / জিবি সভায় উপস্থাপন করতে পারেন। অথচ একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীদের কোনো প্রতিনিধি নেই। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টি বোর্ড এবং অবসর সুবিধা বোর্ডে কর্মচারীদের প্রতিনিধি আছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের রেগুলেশনে ম্যানেজিং কমিটিতে কর্মচারী প্রতিনিধি রাখার বিধান আছে।
অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান/সংস্থায় কর্মরত ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীরা মূল বেতনের ৬৫% বাড়িভাড়াভাতা পায়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা বাড়িভাড়া পায় মাত্র ১০০ টাকা। জানামতে বাংলাদেশের কোথায়ও ১০০ টাকায় বাড়িভাড়া পাওয়া যায় না।
অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান/সংস্থায় কর্মরত কর্মচারীরা মূল বেতনের সমপরিমাণ বছরে দুটি উত্সবভাতা পান। অথচ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বছরে দুটি উত্সবভাতা মূল বেতনের ৫০%। অনেক সময় দেখা যায়, ঈদের আগে বোনাসের ঐ সামান্য ক’টি টাকা কর্মচারীরা ব্যাংক থেকে উত্তোলনও করতে পারে না উত্সবভাতা দেরিতে ছাড়ার কারণে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য চাকরিতে পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধির সুযোগ আছে। একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকগণ চাকরিতে যোগদানের দুই বছর, আট বছর, বারো বছর পর সিনিয়র স্কেল পান। অথচও কর্মচারীরা সমগ্র চাকরিজীবনে একটি সিনিয়র স্কেল পায় এবং এই সিনিয়র স্কেলে বেতন বাড়ে মাত্র ১০০ টাকা।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত কাজের জন্য অতিরিক্ত কোনো পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা নাই। দাফতরিক সময়ে কাজের পর অতিরিক্ত সময় কাজের জন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয় না। অথচ একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের কার্যকালীন সময়ে কোনো অতিরিক্ত কাজ করলে তাঁদের (শিক্ষকদের) নাস্তা বা আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। কর্মচারীদের দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হয় সম্পূর্ণ অভুক্ত অবস্থায়। প্রতিষ্ঠান থেকে টিফিনভাতা প্রদানের সরকারি বিধান থাকলেও আমাদের দেশের অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীদের টিফিনভাতা দেয়া হয় না। স্বল্প বেতনভুক্ত কর্মচারীদের টিফিনভাতা প্রয়োজন।
কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের বিকল্প নাই। একজন কর্মচারী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাকরিতে যোগদান করার পর তাকে কোনোরকম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় না বা প্রশিক্ষণের কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি বা বিভিন্ন দাফতরিক কাজ সম্পাদনের জন্য প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অনলাইন রেজিস্ট্রেশন এবং পরীক্ষার ফরম ফিলাপও অনলাইনে করা হয়। অনলাইন রেজিস্ট্রেশন বা ফরম ফিলাপের কাজগুলো কর্মচারীদেরই সম্পাদন করতে হয়। অথচ এইসব অনলাইন কাজের প্রশিক্ষণে পাঠানো হয় শিক্ষকদের।
ঢাকা
