এক দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা ও কিছু কথা

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪২
মোশারেফ শেখ একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি, গায়ে বিবর্ণ শার্ট, পায়ে প্লাস্টিকের স্যান্ডেল, হাতে পুরনো ঘড়ি, কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। চোখ দুটো এখনও শাণিত। শার্ট খুলে তিনি দেখান সেই ১৯৭১ সালের গুলির দাগ। তিনি থাকেন মিরপুর ১০ নম্বর ঝুটপট্টি রোড শরণার্থী বিহারীদের বাসস্থান ৬ নম্বর ওয়াপদা বিল্ডিংয়ের পেছনে মিল্ক ভিটা কোম্পানির সীমানা দেয়াল ঘেঁষা একটি ছোট্ট ঘরে। তাঁর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার গোহালা ইউনিয়নের মনিরকান্দি গ্রামে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশের গেজেটে তাঁর ক্রমিক নম্বর ৪২৮৭। মোশারেফ শেখ বলেন, “যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের বিরুদ্ধে ছিল, ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়েছে, মা-বোনদের নির্মম অত্যাচার করেছে, সেই অত্যাচারীরা এখন গাড়িতে পতাকা লাগিয়ে চলে। আজ আমরা ভিটামাটিহারা। আজ আমরা একটা কাগজের সার্টিফিকেটের জন্য রাস্তায় রাস্তায় দৌড়াই—এ বড় অপমান, এ বড় কষ্টদায়ক।” ১৯৭১ সালে মোশারেফ শেখের বয়স ছিল ২১ বছর। যুদ্ধ শুরু হবার পর পর স্থানীয় রাজাকাররা তাঁকে টেকেরহাট থেকে ধরে নিয়ে যায়। প্রচণ্ড মারপিট করে রাজাকারে নাম লেখাতে বলে। তিনি কৌশল করে ওদের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার পর পালিয়ে কোটালিপাড়ায় গিয়ে হেমায়েত বাহিনীর দলে যোগ দেন। কোটালিপাড়া জহরকান্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এক মাস সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে যুক্ত হন হেমায়েত বাহিনীর সঙ্গে। বাহিনী প্রধান হেমায়েত উদ্দিনের নেতৃত্বে মধুমতি নদীতে পাকিস্তানি বাহিনীর খাদ্য সরবরাহকারী একটি কার্গো জাহাজ দখলের অভিযানে অংশ নেন। অভিযান সফল হলেও গুলিবিদ্ধ হন তিনি। রক্তাক্ত বাহু নিয়ে ভর্তি হন বানিয়ারচর ফাদার মারিনো রিগনের মিশনারি হাসপাতালে। সেখানে বেশ কিছুদিন চিকিত্সাধীন থাকেন। তারপর সুস্থ হয়ে ফিরে যান রণাঙ্গনে। দিননগর ফেরিঘাট সংলগ্ন পাকিস্তানি ক্যাম্পে থাকা কয়েকজন বাঙালি তরুণী বন্দীর খবর শুনলেন মোশারেফ শেখ। দ্রুত প্রস্তুতি নিলেন তিনি। সহযোগী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আক্রমণ করলেন দিননগর পাকিস্তানি ক্যাম্প। রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের পর পতন ঘটল ক্যাম্পটির। সেই ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করা হলো চার বীরাঙ্গনাকে। উদ্ধার করা বীরাঙ্গনাদের মধ্যে তিনজনের সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা কোনোরকমে করা গেলেও দিননগর ইউনিয়নের ভাজন্দি গ্রামের জগদীস বণিকের কন্যা কানন বণিকের জন্য জুটলো না কোনো আশ্রয়। সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে পারলেন না তাঁর মা-বাবা, আত্মীয়-পরিজনেরা। বীরাঙ্গনা কানন বণিককে ঘরে তুলতে স্পষ্ট অস্বীকার করলেন তাঁরা। ফলে কানন বণিক মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে চলে গেলেন কোটালিপাড়ায় যুদ্ধশিবিরে। হাতে তুলে নিলেন শিবিরের রান্নাবান্নার দায়িত্ব, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার কাজ। এসবের অবসরে থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালানো শিখলেন কানন বণিক। আয়ত্ত করলেন গ্রেনেড ছোড়ার কঠিন কৌশল। তারপর পুরুষ সহযোদ্ধাদের পাশাপাশি সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন তিনিও। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশ গেজেটে তাঁর ক্রমিক নম্বর ৪৯১০। ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধ শেষ হলো। তাঁর হাতে হাত রাখলেন মুক্তিযোদ্ধা মোশারেফ শেখ। পরিবারের তীব্র আপত্তি উপক্ষো করে কানন বণিককে বিয়ে করলেন তিনি। ধর্মান্তরিত কানন বণিকের নতুন নাম হলো নাজমা বেগম। এবার স্বজন বিতাড়িত এই মুক্তিযোদ্ধা দম্পতির নতুন যুদ্ধ শুরু হলো। এই যুদ্ধ দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। গোপালগঞ্জে টিকতে পারলেন না তাঁরা। জন্মস্থান ত্যাগ করে ঢাকায় এলেন। এরপর অনেক বছর পার হলো। এক মেয়ে তিন ছেলে নিয়ে এই মুক্তিযোদ্ধা দম্পতির সংসার। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সন্তানদের শিক্ষিত করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন তাঁরা। এর মধ্যে মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু টাকার অভাবে এখনও জামাইর ঘরে উঠিয়ে দিতে পারেননি। এরকম আরো মুক্তিযোদ্ধা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। তাঁদের জন্য কি আমাদের করণীয় কিছু নেই? ঢাকা