গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ : প টু য়া খা লী

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০৭
সংগ্রাম পরিষদ গঠন: পটুয়াখালী জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন সভাপতি- এডভোকেট কাজী আবুল কাসেম (জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি), সাধারণ সম্পাদক- আশরাফ আলী খান(জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক), হাফিজুর রহমান ফোকান মিয়া, এডভোকেট মোঃ আবদুল বারী, আবদুল করিম মিয়া(ভাসানী ন্যাপের কেন্দ্রীয় নেতা), সৈয়দ আশরাফ হোসেন (জেলা ন্যাপের সভাপতি) ও কমরেড মোকসেদুর রহমান (কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা)। এদের মধ্যে কমরেড মোকছেদুর রহমান ছাড়া সকলেই আজ প্রয়াত। ২৬ এপ্রিলের আগ পর্যন্ত একমাস পটুয়াখালী জেলা ছিল মুক্তাঞ্চল। এসময় সংগ্রাম পরিষদ বর্তমান মহিলা কলেজে জেলা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করে ৩শ’ মুক্তিযোদ্ধাকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করে। তত্কালীন জেলা প্রশাসক এম.এ আউয়াল এক্ষেত্রে অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি পুলিশ লাইন থেকে রাইফেল ও গুলি এনে তুলে দেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। পরে এ জন্য পাকহানাদাররা তাকে গুলিবিদ্ধ করে। তবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। হানাদারদের আক্রমণ: ২৬ এপ্রিল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা। পাক-হানাদারদের জঙ্গী বিমান ছুটে আসে পটুয়াখালীর আকাশে। শুরু হয় বিমান হামলা। চলে শেলিং আর বেপরোয়া গোলাবর্ষণ। এক নাগাড়ে কয়েকঘণ্টা বোমা হামলা চালিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারযোগে কালিকাপুর এলাকায় অবতরণ করে পাকিস্তানী ছত্রীসেনা। হানাদাররা ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র জনতার উপর। চালায় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। আগুনে ভস্মীভূত করা হয় শহরের পুরান বাজার এলাকা। এ সময় পাক বাহিনীর হাতে কালিকাপুর মাদবার বাড়িতে শহীদ হন ১৭ জন, জেলা প্রশাসকের বাসভবনের সামনে শহীদ হন ৬ জন আনসারসহ ৭ জন। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জেলার বিভিন্নস্থানে ও জেলখানার অভ্যন্তরে হত্যা করা হয় দেড় সহস্রাধিক লোককে। মাদবার বাড়ি, জেলা প্রশাসকের বাসভবনের অদূরে ও পুরান জেলখানার বধ্যভূমি পাকবাহিনীর গণহত্যার নির্মম সাক্ষ্য বহন করে আছে আজো। মাদারবুনিয়ায় প্রথম প্রতিরোধ: পটুয়াখালী শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে মাদারবুনিয়া গ্রামে ১১ আগস্ট দুপুরে শাহজাহান ফারুকীর নেতৃত্বাধীন ৩৪ সদস্যের মুক্তিযোদ্ধা দলের উপর অতর্কিত হামলা চালায় পাক সেনারা। মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা গুলিতে শত্রুপক্ষের ৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়। প্রায় এক ঘণ্টা যুদ্ধের পর গুলি ফুরিয়ে যাওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা ঐ স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। কলিশুরীর(চাঁদকাঠী) যুদ্ধ: ১১ সেপ্টেম্বর সকালে পাক হানাদার বাহিনীর ৫০ জনের একটি দল বাউফলের কালিশুরী বন্দরে আসে গানবোট নিয়ে। অগ্নিসংযোগ করে বন্দরের দোকানপাট ও বাড়িঘরে। গুলি চালিয়ে হত্যা করে বেশ কিছু নিরীহ মানুষকে। এ খবর পেয়ে সেখানে ছুটে আসে হাবিলদার পঞ্চম আলী ও হাবিলদার আবদুল বারেক হাওলাদারের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি গ্রুপ। তারা দুপুরে চাঁদকাঠী এলাকায় পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ চালায়। দ্বিমুখি এই আক্রমণে নিহত হয় ৭ জন পাক সেনা। টিকতে না পেরে পালিয়ে যায় পাকবাহিনী। পানপট্টির যুদ্ধ: গলাচিপা থানা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে পানপট্টি গ্রামের সাইক্লোন শেল্টারে ক্যাম্প স্থাপন করেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল। নেতৃত্বে ছিলেন কে.এম নুরুল হুদা ও হাবিবুর রহমান শওকত। ১৮ নভেম্বর সকাল ৬টার দিকে মেজর ইয়ামিনের নেতৃত্বে পাক হানাদারদের একটি সুসজ্জিত বাহিনী আক্রমণ করে সেখানে। শুরু হয় দু’পক্ষের সম্মুখ যুদ্ধ। যুদ্ধে পাকবাহিনীর বেশ ক’জন হতাহত হয়। এক পর্যায়ে টিকতে না পেরে বিকাল ৪টার দিকে পিছু হটতে শুরু করে ইয়ামিন বাহিনী। এ সময়ে এলাকার মানুষও মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে। অবস্থা বেগতিক দেখে সন্ধ্যার দিকে পালিয়ে যায় পাক হানাদাররা। জেলার প্রথম মুক্তাঞ্চল পানপট্টিতে মুক্তিযোদ্ধারা উত্তোলন করে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা। শহীদ ৩৩ মুক্তিযোদ্ধা: মুক্তিযুদ্ধকালে বিভিন্ন রণাঙ্গনে শহীদ হন ৩৩ জন মুক্তিযোদ্ধা। তারা হলেন: আমজাদ হোসেন সিকদার, তোজম্বর আলী গাজী, সিপাহী নুরুল হক, হাবিলদার হাফিজউদ্দিন সিকদার, আ: হক তালুকদার, আ: ছালাম, আ: রহমান হাওলাদার, আ: মান্নান, আ: কাদের জমাদ্দার, ইউছুফ আলী মৃধা, সিপাহী আবদুল করিম, ল্যান্স নায়েক মুজাফফর হাওলাদার, মো: আবদুল খালেক, মোয়াজ্জেম হোসেন খান, আলী আহমেদ খাঁ, শাহজাহান হাওলাদার, আবদুল মজিদ খান, আ: রশীদ হাওলাদার, পিসি আনোয়ার হোসেন, আ: খালেক, সিপাহী আবদুল মোতালেব, সিপাহী আব্দুল কুদ্দুস, সুলতান আহমেদ, সিপাহী আব্দুল খালেক, সোরাব আমীর হোসেন, নায়েক জয়নাল আবেদীন হাওলাদার, হাবিলদার নাসিরউদ্দিন, নায়েক আবদুল মালেক, সিপাহী ইউছুফ আকন্দ, সিপাহী চান মিয়া, মো: হাফিজুর রহমান, মো: আবদুর রাজ্জাক ও সিপাহী মকবুল হোসেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কথা: মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জেলা ইউনিট কমান্ডার আবদুল বারেক হাওলাদার, সদর উপজেলা কমান্ডার বাদল ব্যানার্জীসহ নেতৃস্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, আমরা জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু দীর্ঘদিনেও আমাদেরকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। আমরা যারা বেঁচে আছি তাদের সময়ও শেষের পথে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কিছু করার থাকলে এখনই করা উচিত। এরপর কিছু করার ইচ্ছা থাকলেও তখন আর মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। শুধুই জানানো যাবে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা।