ভালো নেই বই ব্যবসায়ীরা

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২৫
বাংলাদেশের বইয়ের বৃহত্তম মার্কেট বাংলাবাজার। বাংলাদেশের প্রকাশনা ব্যবসা আবর্তীত হচ্ছে এই বাংলাবাজারকে ঘিরে। ত্রিশ দশকে ১০-১২টি বইয়ের দোকান দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বাংলাবাজারে এখন এ সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। দেশের সাত হাজার ছাপাখানায় ছাপা হওয়া বই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে যায় বাংলাবাজার থেকেই। এ কারণে দেশের ৩৫ হাজার বইয়ের দোকানের আশা ভরসার কেন্দ বিন্দু রাজধানীর এই জনপথটিই। কিন্তু বইয়ের ব্যবসায় মন্দাভাবের কারণে বাংলাবাজারের ব্যবসায়ীদের চোখে মুখে শুধুই এখন হতাশার ছাপ। যুগ যুগ ধরে চালিয়ে আসা ব্যবসা এখন নিভু নিভু অবস্থায় টিকে আছে। কেউ স্মৃতি রক্ষায় ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ ব্যবসা বন্ধ করে পাড়ি দিয়েছেন অন্য পেশায়। অন্যদিকে নতুন কেউ আসছেন না এই ব্যবসায়। ঐ দেখা যায় তাল গাছ, ঐ আমাদের গাঁ, ঐখানেতে বাস করে, কানাবগির ছাঁ! শিশুদের জনপ্রিয় এই ছড়াটির লেখক কবি খান মো: মইন উদ্দিন বাংলাবাজারের একটি বইয়ের দোকানের মালিক ছিলেন। ১৯৩৫ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করলেও ১৯৪৭ সালে তিনি দোকানটি ঢাকার বাংলাবাজারে স্থানান্তর করেন। নাম আল হামরা লাইব্রেরি। বাংলাবাজারে হাজারো বইয়ের দোকানের মধ্যে কয়েকযুগ চলার পর এখন এর অবস্থা নিভু নিভু। কবির ছেলে খান মো. সিহাব উদ্দিন এটি এখন পরিচালনা করছেন। ঢাকা সদর প্রধান ডাকঘরের উল্টোদিকে ৩৩/১ বাংলাবাজারে একটি ছোট দোকান এটি। হাতে গোনা কিছু সৃজনশীল বই রয়েছে। বেশিরভাগ সেলফ সাজানো হয়েছে স্কুল কলেজের খাতা, কাগজ ও কলম দিয়ে। এই দোকানে ৫০ বছর ধরে কাজ করছেন নিতাই চন্দ সাহা। তিনি জানালেন, বেচা বিক্রি কম। কোন মতে দিন চলে যায়। স্মৃতি রক্ষার্থেই লাইব্রেরিটি এখনো চালু রেখেছে কবি পরিবার। নোট-গাইড বিক্রি না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এখন কোনমতে টিকে আছে। বাংলাবাজারের ফুটপাতে ১৯৩৫ সালের দিকে বই বিক্রি করতেন বিকাশ কর। এই সময়েই বইয়ের নেশায় পড়ে যান তিনি। ধীরে ধীরে ‘ঢাকা টাউন লাইব্রেরি’ নামে একটি বইয়ের দোকান পরিচালনা করেন তিনি। নানা ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করে ব্যবসাটা এখনো টিকিয়ে রেখেছেন বিকাশ করের ছেলে অরুপ কর। তিনি জানালেন, ‘দীর্ঘদিনের বই ও প্রকাশনার ব্যবসা। বাবার স্মৃতি। এটাকে ধরে রাখতেই হবে। তবে বই বিক্রির ব্যবসা এখন আগের মতো আর ভালো নয়। বইয়ের প্রতি আকর্ষণ কমে যাওয়া ও নোট-গাইড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই অবস্থা।’ বই বিক্রির পুরনো প্রতিষ্ঠান দুটি টিকে থাকলেও পুরনো অনেক বই বিক্রির দোকান এখন আর নেই। যেগুলো আছে তাও নিভু নিভু অবস্থায়। ৩৮ বাংলাবাজার উনিশ শতকের শুরুতে ছিল ইকবাল ওয়াচ কোম্পানির। পরে এখানে প্রতিষ্ঠা হয় প্রেসিডেন্সি লাইব্রেরি। এখন এই প্রতিষ্ঠানটির কোন অস্তিত্ব নেই। এখানে তৈরি হয়েছে সাত তলাবিশিষ্ট একটি বইয়ের মার্কেট। শতাধিক বইয়ের দোকান রয়েছে এখানে। এছাড়া বই বিক্রির পুরনো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জুয়েল লাইব্রেরির প্রকৃত মালিক নেই। এর দোকানের জায়গায় এখন বইয়ের মার্কেট। পঞ্জিকা প্রকাশে পরিচিত প্রতিষ্ঠান লোকনাথ বুক এজেন্সিও ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে এর মালিক পরিবর্তন হয়েছে। প্রকৃত মালিকদের কেউ কেউ জীবিত নেই। আবার কেউ ভারতে চলে গেছেন। তবে এ প্রতিষ্ঠানটি এখনো কোনমতে পঞ্জিকা প্রকাশ করে টিকে আছে। খোসরোজ কিতাবমহল এখনো টিকে আছে। মহিউদ্দিন আহমেদ এর মালিক। মালিকের মৃত্যুর পর আজাদ পাবলিশিং হাউজ নিভু নিভু অবস্থায় টিকে আছে। রাজধানীতে এদের ছাপাখানা রয়েছে। নওরোজ কিতাবিস্তান এখনো বই প্রকাশ ও বিক্রির ব্যবসায় টিকে আছে। মালিকের ছেলে ইফতেখার রসুল জজ এটি পরিচালনা করছেন। ব্রিটিশ আমলের মিনারভা লাইব্রেরির এখন কোন আস্তিত্ব নেই। সব কিছু বিক্রি করে মালিকের পরিবারের সবাই চৌমুহনী চলে গেছেন। স্টুডেন্টস ওয়েজ এখনো রয়েছে। প্রতিষ্ঠাতার ছেলে লিয়াকত উল্লাহ এটি পরিচালনা করছেন। মাওলা ব্রাদার্স মালিকের ভাতিজা আহমেদ মাহমুদুল হক পরিচালনা করছেন। সিটি পাবলিশার্স নিভু নিভু অবস্থায় টিকে আছে। শান্তি লাইব্রেরির কোন অস্তিত্ব নেই। ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশে ঢাকা মিউনিসিপালের তত্কালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী বশিরের প্রভেনশিয়াল লাইব্রেরি এবং তার ভগ্নিপতি ধারাভাষ্যকার মো: শাহজাহানের প্রভেনশিয়াল বুক ডিপো নামে দুটি প্রকাশনা ছিল। এখন শাহজাহানের প্রতিষ্ঠানটি তার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারিরাই পরিচালনা করেন। হার্ট সন্স এন্ড কোম্পানির প্রতিষ্ঠা ১৯১২ সালে। কিন্তু বিক্রি কম হওয়ায় ব্যবসার ধরন পাল্টেছে। এখনে এখন বিয়ের কার্ড বিক্রি হচ্ছে। ১৯৬৭ সালে চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন পাঠ্যপুস্তক ও নোটবইয়ের প্রকাশনা সংস্থা পুঁথিঘর লিমিটেড। এটি এখন প্যারিদাস রোডে অবস্থিত। পুরনো একটি ভবনও রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটির। বনেদী টাইপের এই প্রতিষ্ঠানটি একসময়ে অনেকের চেয়ে এগিয়ে ছিল। কিন্তু এখন ব্যবসা অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। চিত্তরঞ্জন সাহার এক নিকট আত্মীয় এটি পরিচালনা করছেন। খান ব্রাদার্স এ্যান্ড কোম্পানি প্রাচীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি। ১৯৬২ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে কে এম ফিরোজ খান এটি পরিচালনা করছেন। বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের বই প্রকাশ করতো এই প্রতিষ্ঠানটি। ব্রিটিশ আমলে চকবাজারে ইসলামী বই বিক্রি হতো। এখনও চকবাজার ইসলামী বইয়ের জন্য বিখ্যাত। এমদাদীয়া লাইব্রেরি, হামিদীয়া লাইব্রেরি এখনো তাদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। একই সময়ে ইসলামপুরে ইসলাম বুক ডিপো প্রতিষ্ঠা হয়। ক্রমান্বয়ে জিন্দাবাজার, আওলাদ হোসেন লেন, প্যারিদাস রোড, পাটুয়াটুলি, জনসন রোডে বইয়ের বাজার বিস্তৃত হয়। কিন্তু এসব স্থানে এগুলো যেন অনেকটা স্মৃতি। ১৯৬২ সালে প্রকাশনা ব্যবসায় আসেন হামিদুল ইসলাম। পরে বাংলাবাজারে ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বিউটি বুক হাউজ নামে একটি লাইব্রেরি। ১৯৬৫ সালে সব ধরনের বই প্রকাশ ও বিক্রি করতেন তিনি। তিনি জানালেন, একসময় জমজমাট ছিল বাংলাবাজার। এখন বাংলাবাজার বিরান ভূমি। আগে এখানে সকাল ৯টায় আসতাম। বাসায় ফিরতাম রাত ১০টায়। কিন্তু বইয়ের ব্যবসা মন্দাভাব থাকায় সপ্তাহে এক বা দুই দিন যাই সেখানে। তিনি জানালেন, ব্যবসায় প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় টিকে থাকাই এখন অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে প্রতিযোগিতা অন্যদিকে নোট-গাইড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। তবে যারা নামী দামী লেখকের বইয়ের কাজ পান সেসব প্রকাশকই শুধু ভালো আছেন। তিনি জানালেন, বই এখন কম মানুষই কিনছেন। এখন হাতের নাগালে তথ্য প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিই মানুষকে বই কেনা থেকে দূরে রাখছে। এখন ইন্টারনেটেই বই পাওয়া যায়। বই পড়ে কোন তথ্য নিতে হচ্ছে না। তিনি বলেন, স্মৃতি টিকিয়ে রাখতেই এখনো ব্যবসা ধরে রেখেছি। দেশি-বিদেশি লেখকের বই, সব ধরনের পাঠ্যবই, নোট-গাইড বই, ম্যাগাজিন, উপন্যাস, রিসার্চ পেপার, জার্নাল, রেফারেন্স বই, দেশি-বিদেশি ক্যাটালগ ও ইংরেজি, ফরাসি, আরবিসহ বিভিন্ন ভাষার বইয়ের জন্য বিখ্যাত এই বাংলাবাজারের ব্যবসা এখন ঝিমিয়ে পড়েছে। বাংলাবাজার গিয়ে দেখা গেছে, এখানকার ব্যবসায়ীদের চোখে মুখে হতাশার চিহ্ন। বেচা-বিক্রিও কম। শুধুই ক্রেতার জন্য অপেক্ষা। পুরান ঢাকার স্কুলগুলোই এখন ভরসা। শুধু খাতা কলম ও কলেজের বই বিক্রি হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় দোকান বেশি। ২০১০ সাল থেকে মাধ্যমিকের বই বিনামূল্যে দেয়ার কারণে বিপাকে পড়েছেন দোকান মালিকরা। নোট গাইড বন্ধের বিষয়ে ১৯৮০ সালে আইন থাকলেও এতদিন এ বিষয়ে তেমন কড়াকড়ি ছিল না। কিন্তু এটি নিয়ে এখন কড়াকড়ি করার কারণে নোট গাইড ছাপা ও বিক্রি হচ্ছে না। পাঠ্যক্রম সৃজনশীল প্রশ্নের আলোকে করার কারণেও নোট-গাইড বিক্রি হচ্ছে না। এ কারণে ব্যবসা এখন মন্দা। বাংলাবাজারের একাধিক বই বিক্রিতা বলেন, পাঠ্যবই ও সৃজনশীল বইয়ের চাহিদা না থাকায় মফস্বলের বই বিক্রির দোকানগুলোর মালিকরা এখন বাংলাবাজারে আসছেন না। মফস্বলের বইয়ের দোকান গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে। দোকানের একপাশে ফুটবল, স্টেশনারি ও কমমেটিক্স সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। অন্যপাশে কিছু বই, স্কুল কলেজের খাতা বিক্রির জন্য রাখা হয়। স্বাধীনতার পর পরই নীলক্ষেতে গড়ে উঠে বইয়ের দোকান। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং, ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্য বই, আইন-কানুন সংক্রান্ত বই, টোফেল, আইইএলটিএস, স্যাট ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের বই পাওয়া যায় নীলক্ষেতে। পুরনো বই কিনতে হলে নীলক্ষেত আদর্শ। এখানে পাইরেটেড বই বিক্রি হয়। বিদেশি মূল্যবান বই এখানে কম মূল্যে বিক্রি হয়। যে বইয়ের মূল্য ১০ হাজার টাকা তা নীলক্ষেতে পাওয়ায় ১ হাজার টাকায়। দুর্লভ ও পুরনো বইয়ের জন্য খ্যাত নীলক্ষেত এলাকা। এছাড়া আজিজ সুপার মার্কেট, পুরানা পল্টন, বায়তুল মোকাররম এলাকা, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, শান্তিনগর, বাংলা মোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ , বাংলা একাডেমি, এশিয়াটিক সোসাইটির বিক্রয় কেন্দ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া শেয়ার মার্কেট এলাকায় শেয়ার মার্কেট সংক্রান্ত বই পাওয়া যায়, সুপ্রিম কোর্ট বার ফটকে আইন বই, সংবিধান ইত্যাদি পাওয়া যায়, কাকরাইলের স্কাউট ভবনে স্কাউটিং সংক্রান্ত বিভিন্ন বই পাওয়া যায়। পাঠ্যপুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির পরিচালক মডেল পাবলিসিং হাউজের মালিক বাহাউদ্দিন ভুঁইয়া জানান, অনেক পুরনো বইয়ের দোকান। সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো আছে তাও নিভু নিভু অবস্থায় টিকে আছে। বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহআলম বলেন, বইয়ের ব্যবসা এখন ভালো নয়। এ কারণে মুদ্রণ শিল্পও কোন মতে টিকে আছে। বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি আলমগীর সিকদার লোটন বলেন, ‘বইয়ের ব্যবসা ভালো নয়। এ কারণে অনেকে লাইব্রেরি বন্ধ করে অন্য পেশা চলে গেছেন। নতুন প্রজন্ম সাহিত্য বই পড়তে চায় না। সব কাজ সবাই করে অনলাইনে।’ তিনি বলেন, অন্যদিকে সরকার নোট-গাইড, সহায়ক বইও তুলে দিয়েছে। এ কারণে নোট-গাইড ও সহায়ক বইও বিক্রি করা যাচ্ছে না। প্রকাশক ও বিক্রেতারা সরকারের পক্ষ থেকে কোন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না। পার্শ্ববর্তী ভারতেও পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতারা অনেক সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে। আলমগীর সিকদার লোটন বলেন, আমার বাবার প্রকাশনা ব্যবসা আমি ধরে রেখেছি। কিন্তু ব্যবসায় মন্দাভাব থাকার কারণে অনেকেই এই পেশা ছাড়ছেন।