বিশ্বজিত্ হত্যার দায় স্বীকার

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২৫
গত রবিবার বিরোধী জোটের অবরোধ চলাকালে পুরনো ঢাকায় বিশ্বজিত্ দাস হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন ৭ জন। এদের মধ্যে রফিকুল ইসলাম শাকিল চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছে ও রাজন তালুকদার ছুরিকাঘাত করেছে। আর বাকিরা রড দিয়ে পিটিয়ে বিশ্বজিতের মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন। গ্রেফতারকৃত তিন ঘাতক মাহফুজুর রহমান নাহিদ, এইচএম কিবরিয়া ও কাইয়ুম মিয়া টিপু এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন। তবে এই তিনজনের মধ্যে একমাত্র নাহিদ সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন। বাকি দু’জন সঙ্গে ছিলেন। গতকাল শুক্রবার তাদের ৮ দিনের রিমাণ্ড মঞ্জুর করে আদালত। রিমান্ডে তারা এই হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ঘটনা বর্ণনা করেন। তারা পলাতক ৬ ঘাতকের নাম-ঠিকানাও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। বিশ্বজিেক হত্যা করা হয় যেভাবে :জিজ্ঞাসাবাদে ঘাতকরা জানান, ওই দিন ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষের এক পর্যায় বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। সংঘর্ষের মাঝখানে পড়ে যান নিরীহ পথচারী বিশ্বজিত্। সে দৌড়ে আত্মরক্ষার জন্য দোতলার কাছে টমাস ডেন্টাল ক্লিনিকে গিয়ে আশ্রয় নেয়। পিছনে পিছনে ছাত্রলীগ নামধারী ১৪/১৫ জনের একটি গ্রুপ সেখানে যায়। তারা ক্লিনিকে গিয়ে বিশ্বজিেক দেখে বলে ‘এই শালা বোমা মেরেছে।’ এরপর যে যেভাবে পারে তাকে কিল ঘুষি মারতে থাকে। এর মধ্যে ৭/৮ জন সেখান থেকে বের হয়ে যায়। এক পর্যায়ে তাওসীনের নেতৃত্বে ৭ জন ক্লিনিকের ভিতরে থেকে যায়। তাওসীন বলে উঠে, ‘শালাকে আর বাঁচিয়ে রাখা যায় না।’ ওই সময় বিশ্বজিত্ দুই হাত উঁচু করে বলে, ‘ভাইয়া আমি হিন্দু এবং বিএনপি কিংবা কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই।’ কিন্তু বিশ্বজিতের একথা কেউ শোনে না। এসময় নাহিদ লাঠি দিয়ে বিশ্বজিতের মাথায় আঘাত করে। রক্ত ঝরতে থাকে। শাকিল চাপাতি দিয়ে কোপাতে থাকে। পিছনে রাজন তালুকদার ছোরা দিয়ে পিছনে ও বুকে আঘাত করে। এরপর শাওন, ইমদাদুল, নুরে আলম লিমন, নাহিদ (গ্রেফতারকৃত), তাওসীন রড ও লাঠি দিয়ে পিটাতে থাকে। এসময় আত্মরক্ষার জন্য বিশ্বজিত্ ক্লিনিকের ভেতর থেকে বারান্দায় চলে আসে। সেখানে আবারও তাকে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো হয় (যা ভিডিও ফুটেজে ধারণ করা হয়েছে)। এক পর্যায়ে সেখানে আবার ক্লিনিকে প্রবেশকালে বিশ্বজিত্ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। ঘাতকরা তার মৃত্যু নিশ্চিত করে বের হয়ে আসে। এসব বর্ণনাকালে তিন ঘাতকের অবস্থা বেশ স্বাভাবিক ছিল। তবে তারা বিষয়টি মর্মান্তিক ও দুঃখজনক বলে কর্মকর্তাদের কাছে স্বীকার করেছে। হত্যার পর উত্সব ! ঘাতকরা আরো জানায়, ওই দিন ডেন্টাল ক্লিনিকের ভিতরে বিশ্বজিতের উপর চাপাতি ও ছুরিকাঘাত বেশি করা হয়। ওই দৃশ্য কেউ ধারণ করতে পারেনি। এই ঘটনার আধঘন্টা পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শরীফুল ইসলামের জন্মদিন পালনের জন্য তারা ক্যাম্পাসে চলে যান। ক্যাম্পাসে আনন্দ উল্লাস করে কেক কেটে জন্মদিন পালনের সময় তারা সবাই উপস্থিত ছিলেন। এ নিয়ে পরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে শরীফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, সেখানে একজন খুন হয়েছে এবং এতে কে কে জড়িত বিষয়টি তিনি আসলে ওইসময় জানতেন না। তার ইচ্ছার বাইরে অতি উত্সাহীরা তার জন্মদিন পালন করেছে বলে তিনি দাবি করেন। পলাতক ৬ জন সনাক্ত এদিকে ডিবির কর্মকর্তারা বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও অভিযোগের ভিত্তিতে ১৪ জনের একটি তালিকা করেছেন। এদের মধ্যে বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণকারি ৭ জনকে সনাক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে মাহফুজুর রহমান নাহিদকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে ডিবির কর্মকর্তারা জানান। বাকি ৬ জন হলেন, রফিকুল ইসলাম শাকিল, ওবাইদুল কাদের তাওসীন, আলম লিমন, ইমদাদুল হক, রাজন তালুকদার ও জিএম রাশেদুজ্জামান শাওন এখনও পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেফতারে ডিবির একাধিক টিম মাঠে রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানান। ঘাতকরা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের সক্রিয় সদস্য ছিল বলে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ ব্যাপারে ডিসি (ডিবি, দক্ষিণ) মনিরুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতারকৃত ৩ জনকে রিমাণ্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। জড়িতরা গা ঢাকা দিয়েছে। তাদের ধরতে অভিযান চলছে বলে তিনি জানান। কে এই রাজন-শাওন ? কলমাকান্দা সংবাদদাতা জানান, বিশ্বজিতের ঘাতক ৭ জনের মধ্যে রাজন ও শাওন অন্যতম। রাজন তালুকদার নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার কেশবপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা হোমিও চিকিত্সক ডা. রানা তালুকদার। তার দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন পুলিশের এসআই ও অপরজন কনস্টেবল। সবার ছোট রাজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ৮ম সেমিস্টারের ছাত্র। রাজনের বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা বলে জানা গেছে। খুলনা প্রতিনিধি জানান, রাশেদুজ্জামান শাওন খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার নাছিরনগর গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় হাইস্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক জিএম লুত্ফুর রহমানের পুত্র। শাওনের মা স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। শাওন খুলনার পাবলিক কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছে। ওই সময় সে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। তার পিতা আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে জানা গেছে।