এ সেদিনের কথা। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সিরিজ হারিয়ে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা তখন বাধভাঙা উল্লাসে মেতেছেন। সারা দেশের মানুষ তখন উত্সব করছেন। ডিসেম্বর মাসে পাওয়া বিশাল এই অর্জনের পর সাংবাদিকদের সামনে কথা বলতে এসেছেন দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। সংবাদ সম্মেলনের একেবারে শেষলগ্নে এসে বললেন, ‘আমরা এই সিরিজ জয়টা উত্সর্গ করতে চাই মহান মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির উদ্দেশে। আমরা প্রতিদিন একটা করে এমন জয় উত্সর্গ করতে পারলেও তাঁদের ঋণ শোধ হবে না। হাজার বছর চেষ্টা করেও আমরা মহান মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব স্পর্শ করতে পারব না। তার পরও এই শ্রদ্ধাটুকু তাঁদের জন্য।’
মুশফিকুর যা বলেছেন, তা অবশ্যই সত্যি। মহান মুক্তিযোদ্ধাদের কীর্তি এই জাতির পক্ষে আরেকবার স্পর্শ করা সম্ভব না। তার পরও এই যে ছোট ছোট সাফল্য, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের জন্য, এ প্রজন্মের খেলোয়াড়দের এই যে শ্রদ্ধা—এটাও নিশ্চয়ই কম পাওয়া নয়।
আজ আমরা এই পাওয়ারই হিসাব করব। ৪১ বছরে কী পেলাম আমরা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন থেকে?
পাওয়ার হিসাবটা একেবারে মুক্তিযুদ্ধ থেকেই শুরু হতে পারে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে খেলাধুলার সম্পর্ক বড় নিবিড় ছিল। এই বাংলাদেশের উদীয়মান ক্রিকেটতারকা শহীদ জুয়েল একাত্তরে ব্যাট-বল ছেড়ে হাতে বন্দুক তুলে যোগ দিয়েছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনে। সে সময়ের সেরা ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন চলে গিয়েছিলেন ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে। একদল ফুটবলার সদ্য জন্ম নেওয়া জাতীয় পতাকা সামনে রেখে ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ নাম নিয়ে যুদ্ধ চলাকালীন ফুটবল খেলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করতে রেকর্ড সময় ধরে সাঁতরে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন প্রয়াত অরুণ নন্দী। পরবর্তীকালের জাতীয় দলের অধিনায়ক রকিবুল হাসান পাকিস্তানিদের বিপক্ষে একাত্তরে ব্যাটে ‘জয় বাংলা’ লিখে ব্যাট করতে নেমেছিলেন!
সোজা কথায় বলা যায়, সেই মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে শুরু হয়েছে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের ‘সাফল্য’। কিন্তু মুশকিল হলো, এসব অতি-আবেগের সাফল্যকেও প্রাপ্তি হিসাবে খাতায় রাখা হয় না। সেখানে দেখা হয় শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব। তাই আমাদের সেই জয়-পরাজয় দিয়েই ভাবতে হবে।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রাপ্তির হিসাব করতে বসলে ক্রিকেটেরই দাপট চোখে পড়বে। শুরুতে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্বপ্ন ছিল আইসিসি ট্রফি জয়। কয়েকবারের ব্যর্থতার পর ১৯৯৭ সালে নাটকীয়ভাবে মালয়েশিয়া থেকে সেই ট্রফি জিতে নিয়ে এলেন আকরাম খানরা। এর পর পরই ১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে আরও একটি উত্সবের উপলক্ষ তৈরি করেছিলেন ক্রিকেটাররা। দুটোর কোনোটাতেই মানের দিক থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেট খুব এগিয়ে গিয়েছিল, তা নয়। তার পরও এই দুই সাফল্য পূঁজি করে এবং মূলত সাংগঠনিক দক্ষতার জোরে ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে যায় বাংলাদেশ।
টেস্টের শুরুটাও খুব খারাপ হয়নি। প্রথম টেস্টেই সেঞ্চুরিয়ান আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং ৫ উইকেট শিকারি নাঈমুর রহমান দুর্জয়কে পেয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। দৃশ্যপটটা বদলে গেল মূলত ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে। ওই বিশ্বকাপে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে বেশ সোরগোল ফেলে দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এর ধারাবাহিকতা ২০০৯ সাল পর্যন্ত একদমই ধরে রাখতে পারেনি তারা। এ সময়ে দেশের একঝাঁক জাতীয় দলের খেলোয়াড়ের আইসিএলে চলে যাওয়া এবং হঠাত্ অবসর কোমর ভেঙে দিয়েছিল ক্রিকেটের। সেই বাংলাদেশই ২০০৮ সালের শেষ দিকে এসে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবালদের হাত ধরে।
এই প্রজন্মের বড় উপহার বলতে দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইট ওয়াশ করা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে খর্বশক্তির ক্যারিবীয়দের হোয়াইট ওয়াশ করাকেও বোঝাচ্ছিল। কিন্তু এঁরা আসলে নিজেদের সেরাটা দেখিয়ে দেন এই ২০১২ সালেই। এ বছরই সাবেক দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দেশের মাটিতে এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠে যায় বাংলাদেশ। ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে ২ রানে হারের আফসোস রয়ে যায়।
সে আফসোস খানিকটা হলেও বছরের শেষ দিকে মুছে যায়। বাংলাদেশ দল সাকিববিহীন অবস্থায় দোর্দণ্ডপ্রতাপ ক-দিন আগের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে গুড়িয়ে দিয়ে ওয়ানডে সিরিজ জিতে নেয়। এই খেলার সুবাদেই বাংলাদেশ ২০১১ এশিয়ান গেমস থেকে প্রথম স্বর্ণপদক জিতেছে।
একসময় বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড়ের বৈশ্বিক কোনো র্যাংঙ্কিয়ে শীর্ষ ১০০-তে থাকাটাও খবর ছিল। বিপরীতে গত দু-বছর ধরে ওয়ানডে অলরাউন্ডারদের র্যাংঙ্কিয়ে শীর্ষ জায়গাটা ধরে রেখেছেন সাকিব আল হাসান। টেস্ট অলরাউন্ডারদের তালিকায়ও এক নম্বরে ওঠা-নামা চলছে তাঁর। একবাক্যে এ কথা সবাই মেনে নিচ্ছেন যে, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার এই সাকিব। ‘উইজডেন’ ক্রিকেট ম্যাগাজিনের বিচারে ২০০৯ ও ২০১০ সালের সেরা টেস্ট ক্রিকেটার পর্যায়ক্রমে দুই বাংলাদেশি সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। এর মধ্যে বাংলাদেশের দুই বোলার (সাকিব ও মাশরাফি) একটি মৌসুমে বিশ্বের সর্বোচ্চ উইকেট-শিকারি হিসেবে শেষ করেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের ওয়ানডে বোলার আব্দুর রাজ্জাক এখন বোলারদের র্যাংঙ্কিয়ে ১০-এর মধ্যেই থাকছেন নিয়মিত।
এখনও সারা পৃথিবীর মতো বাংলার প্রাণের খেলা ফুটবল। ফুটবল নিয়ে দেশটিতে উন্মাদনা অসীম হলেও সাফল্য খুব বেশি নয়। সাফল্য বলতে তিনটি দক্ষিণ এশীয় শিরোপা। শিরোপা তিনটি হলো ১৯৯৯ সালে ও ২০১০ সালের দুটি দক্ষিণ এশিয়ান গেমস ফুটবলে সোনা এবং ২০০৩ সালে দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবল টুর্নামেন্টে শিরোপা।
আমাদের সাফল্য রয়েছে কাবাডি ও বক্সিংয়ে। কাবাডিতে জাতীয় দল এশিয়ান গেমস থেকে রূপা এনে দিয়েছে বেশ কয়েকবার। আর বক্সিংয়ে একটিমাত্র যে সাফল্য, সেটির ওজন অনেক বড়। এশিয়ান গেমস থেকে বক্সার মোশাররফ হোসেন জিতে নেন ব্রোঞ্জপদক!
পুরো উপমহাদেশে দাবা যখন ‘অন্ধকার যুগে’ বসবাস করছে, তখন বাংলাদেশি দাবাড়ু নিয়াজ মোরশেদ প্রথম দক্ষিণ এশীয় হিসেবে গ্র্যান্ড মাস্টার নর্ম অর্জন করেন। নিয়াজের পর আমরা আরও চার দাবাড়ু জিয়াউর রহমান, রিফাত বিন সাত্তার, আব্দুল্লা রাকিব ও এনামুল হোসেন রাজীবকে পেয়েছি গ্র্যান্ড মাস্টার হিসেবে। খেলা হিসেবে বললে, ক্রিকেটের পরই সবচেয়ে বেশি সাফল্য দাবা থেকেই এসেছে বাংলাদেশের। দাবার আরেকটি বড় সাফল্য এনামুল হোসেন রাজীবের বাছাইপর্ব পার করে বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া। সে বিশ্বকাপে প্রথম পর্বে জয় পেয়েছিলেন তিনি।
গলফ থেকেও এসেছে বড় সাফল্য। অবশ্য সেটাকে পুরো গলফের সাফল্য না বলে একজন সিদ্দিকুর রহমানের সাফল্য বলা ভালো। তিনি ২০১০ সালেই দেশের ইতিহাসে প্রথম এশিয়ান ট্যুর জিতেছেন, আরেকটিতে হয়েছেন দ্বিতীয়।
২০০২ সালে কমনওয়েলথ গেমসে শুটার আসিফ জিতেছিলেন ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের স্বর্ণপদক। আসিফ ওই গেমসে যে অভিনব বিন্দ্রাকে হারিয়ে সোনা জিতেছিলেন; সেই বিন্দ্রাই পরে ২০০৮ সালে সোনা জেতেন অলিম্পিকে! আসিফ তখন পুলিশের পিটুনিতে শুটিংয়ের ধারই হারিয়ে ফেলেছেন! আসিফের বাইরে শুটিংয়ের আরেকটি বড় সাফল্য হলো, ১৯৯৭ সালে কমনওয়েলথ শুটিংয়ে সোনা জিতেছিলেন সাবরিনা সুলতানা।
এর বাইরে আঞ্চলিক পর্যায়ে কিছু সাফল্য আছে হকির। কয়েকবার এশিয়ান হকির বাছাইপর্বে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা উল্লেখ করার মতো ব্যাপার।
তবে বাকি খেলাগুলোতে অনেক সম্ভাবনা নষ্টের গল্পও আছে। আর্চারিতে বাংলাদেশ থেকে একাধিক খেলোয়াড় শুরুতে অলিম্পিক স্কোর করে ফেলেন; পরে আর তাঁদের খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়। শুটিংয়েও একই গল্প আছে। হকিতে যে প্রবল সম্ভাবনা ছিল, তা একরকম শেষ হয়ে গেছে। ফুটবল, দাবায় সংগঠকেরা খেলাটাই নিয়মিত চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।
এই সংগঠকদের প্রসঙ্গে অবশ্য আর কিছু সাফল্যের কথা বলতে পারি। বাংলাদেশ একক সামর্থে ১৯৯৮ সালে তত্কালীন মিনি বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল সবগুলো টেস্ট খেলুড়ে দেশ নিয়ে। এরপর অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ হয়েছে এই বাংলাদেশে। তবে ক্রিকেটের সেরা আয়োজন নিঃসন্দেহে গত বছর হয়ে যাওয়া বিশ্বকাপ। এর মধ্যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দায়িত্ব পাওয়া বিসিবি যেভাবে কাজটা করেছে, তাতে সারা বিশ্ব চমকে গেছে। বিশ্বের বড় বড় সংবাদমাধ্যমগুলো স্বীকৃতি দিয়েছে, এটি ক্রিকেট বিশ্বকাপের ইতিহাসের সেরা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। অনেকে একে আরেকটু এগিয়ে বেইজিং অলিম্পিকের সঙ্গেও তুলনা করেছেন!
একটা বিশাল আয়োজন ছিল ফুটবলেও। ২০১১ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন লিওনেল মেসি। সর্বকালের সেরা ক্রীড়াবিদ মোহাম্মদ আলী বা সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার জিনেদিন জিদান বাংলাদেশে এসেছেন। আর্জেন্টিনা দলে মেসির আলোয় সবাই ঢাকা পড়ে যান। তার পরও এই দলেই রিয়াল মাদ্রিদের সুপার স্টার গঞ্জালো হিগুয়েইন ও অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া, ম্যানচেস্টার সিটির অধিনায়ক সার্জিও আগুয়েরো, বার্সেলোনার হ্যাভিয়ের মাচেরানোরাও এসেছিলেন। প্রতিপক্ষ নাইজেরিয়া দলেও ছিলেন জন ওবি মিকেলের মতো তারকা।
বিশ্ব ফুটবলের সেরা তারকাদের সামলানোর এই দায়িত্ব নেওয়াটা বাফুফের জন্য কৃতিত্বের ব্যাপার। এই বেলা পর্যন্ত আমরা কেবলই প্রাপ্তি, সাফল্য আর আনন্দের গল্প করলাম। তাহলে ব্যর্থতা নেই? হতাশা নেই! আছে, এই সময়ে ব্যর্থতা আর হতাশাই পেয়েছি আমরা বেশি। আনন্দ আর প্রাপ্তি তো সে তুলনায় ছিটেফোঁটা মাত্র। কিন্তু এই বেলায় না পাওয়ার হতাশার গল্প তোলা থাক। না পাওয়ার গল্প বলে নতুনের স্বপ্ন দেখা যায় না। আমরা স্বপ্ন দেখতে চাই। ৪১ বছরের বিন্দু বিন্দু এই সাফল্যগুলো আরও আরও বড় হয়ে আমাদের নিয়ে যাক বড় সাফল্যের দুয়ারে।
লেখক :সাহিত্যিক, সাংবাদিক
