নতুন মুখ নতুন সম্ভাবনা

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৩১
ভাবপ্রকাশে আমার মতো প্রত্যেক নির্মাতার কাছেই সবচেয়ে প্রিয় জায়গাটি হচ্ছে চলচ্চিত্র। এই সময়েই শুধু নয়, স্বাধীনতার পূর্ববর্তী পর্যায়ের ধারাহিকতায় আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাস সামর্থের তুলনায় সব সময়ই ছিল সমৃদ্ধ। গত দুই দশক ধরে আমাদের চলচ্চিত্র বাণিজ্যিক ধারায় এক ক্রান্তিলগ্ন পেরিয়ে এলেও এর অতীত কিন্তু ঈর্ষণীয়। কারিগরি সীমাবদ্ধতা, আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা আর সামাজিক চৌহদ্দির কথা মনে রেখে বিবেচনা করলে দেখা যাবে, স্বাধীনতার পরবর্তী পর্যায়ে বাংলা চলচ্চিত্রের উঠে আসার গল্পটা অনেক ইতিবাচক। বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডে প্রথম বায়োস্কোপ প্রদর্শনী হয় কলকাতার ব্রেডফোর্ড বায়োস্কোপ কোম্পানির উদ্যোগে ১৮৯৮ সালের ৪ এপ্রিল বাকেরগঞ্জ জেলার ভোলা মহকুমায়। তখনও বায়োস্কোপের মাধ্যমে এই চলচ্চিত্র দেখার জন্য সাধারণ দর্শকের টিকেটের ব্যবস্থা ছিল। টিকেটের দাম ছিল আট আনা থেকে তিন টাকা। ঢাকার আরমানিটোলার পাটের গুদাম থেকে নিয়মিত বায়োস্কোপ প্রদর্শনীর গৌরবের অভিযাত্রা সূচিত হয় ১৯১৩-১৪ সালে। পরে এখানেই স্থাপিত হয় ঢাকায় বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা হল পিকচার হাউজ, যা পরে শাবিস্তান হল নামে রূপান্তরিত হয়। দাদাসাহেব ঢুন্ডিরাজ গোবিন্দ ফালকে হলেন উপমহাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রের নির্মাতা। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি দাদাসাহেব ফালকে নামেই বেশি পরিচিত। নবাব পরিবারের উদ্যোগে ঢাকায় ইস্ট বেঙ্গল সিনেমাটোগ্রাফ কোম্পানি গঠিত হয়। এর প্রযোজনায় অম্বুজপ্রসন্ন গুপ্ত নির্মাণ করেন নির্বাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট কিস’। খাজা আজমল, খাজা আদিল, খাজা আকমল, খাজা শাহেদ, খাজা নসরুল্লাহ, শৈলেন রায় বা টোনা বাবু ছিলেন এই চলচ্চিত্রের অভিনেতা। ১৯৩১ সালে এই চলচ্চিত্র মুক্তি পায় ঢাকার মুকুল হলে (অধুনা আজাদ হল)। এর প্রিমিয়ার শো উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার। আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাস শুরুর ঘটনাটি অনেকটাই একটি ডাকাতের কাহিনিকে নির্ভর করে গড়ে ওঠে। ১৯৫৬ সালে আবদুল জব্বার খান রচিত নাটক ‘ডাকাত’-এর চিত্রায়ণ ‘মুখ ও মুখোশ’। এই চলচ্চিত্রে পেশাদারিত্বের ছাপ থাকার কথা নয়। কিন্তু প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে এর গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরের বছর সরকারি প্রচার-চিত্র নির্মাণের জন্য জনসংযোগ বিভাগের অধীনে চলচ্চিত্র ইউনিট গঠিত হয়। ১৯৫৫ সালে নাজীর আহমদের উদ্যোগে ঢাকায় প্রথম ফিল্ম ল্যাবরেটরি এবং স্টুডিও চালু হয়। তাঁর কাহিনি থেকে ফতেহ লোহানী নির্মাণ করেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র আসিয়া। এফডিসি প্রতিষ্ঠার পরে চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক যোগ্য ব্যক্তি এগিয়ে আসেন। ১৯৫৯ সালে ফতেহ লোহানীর ‘আকাশ আর মাটি’, মহিউদ্দিনের ‘মাটির পাহাড়’, এহতেশামের ‘এ দেশ তোমার আমার’—এই তিনটি বাংলা চলচ্চিত্র ছাড়াও এ জে কারদারের ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ উর্দু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। স্বাধীনতার পরে আবির্ভূত চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে আলমগীর কবির উল্লেখযোগ্য। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র হলো ‘ধীরে বহে মেঘনা’, ‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘রূপালী সৈকতে’, ‘মোহনা’, ‘পরিণীতা’ ও ‘মহানায়ক’। ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত মোট ২২৪টি ছায়াছবি ঢাকায় তৈরি হয়েছে। দুটি ছায়াছবি ছিল পরিত্যক্ত। ২২৪টি ছায়াছবির মধ্যে ৫৯টি ছায়াছবি উর্দু ভাষায় নির্মিত, বাকি ১৬৫টি ছায়াছবি বাংলা ভাষায় নির্মিত। আশ্চর্যজনক আরেকটি তথ্য হচ্ছে, দেশ স্বাধীন হবার অনেক পরে, ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের যৌথ প্রযোজনায় আরও ১৮টি ছায়াছবি নির্মিত হয়েছিল। পাকিস্তানি আমলে ঢাকা থেকে উর্দু ছায়াছবি নির্মিত হলেও প্রথম প্রথম পশ্চিম পাকিস্তানে মুক্তির ব্যাপারে প্রদর্শকরা আগ্রহী ছিল না। পরবর্তী সময়ে শবনম, নাদীম, ববিতা, শাবানা, আনোয়ার হোসেন, রেহমান প্রমুখের ছায়াছবি আলোচিত হওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি ও লাহোরে ঢাকার ছায়াছবি মুক্তি পেত। সেই ছায়াছবির বেশ কয়েকটি ব্যবসাসফল; হিট, সুপার হিট থেকে ধরে সিলভার জুবিলি, গোল্ডেন জুবিলি, প্লাটিনাম জুবিলিও হয়েছিল। পাকিস্তানের ইতিহাসে দুটি ছায়াছবি প্লাটিনাম জুবিলি হয়েছিল। তার মধ্যে একটি ঢাকা থেকে নির্মিত। শহীদ জহির রায়হানের হাতেই পাকিস্তানের প্রথম সম্পূর্ণ রঙ্গিন ছায়াছবি নির্মিত হয়েছিল, এবং পাকিস্তান হিসেবে ১৯৭১ সালের শেষ ছায়াছবিটিও ছিল শহীদ জহির রায়হানের। সেই স্বর্ণালী ইতিহাস পেরিয়ে বর্তমান সময়ে নতুন প্রজন্মের মেধাবীদের হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্র তার ক্রান্তিকাল পেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত আগ্রহ বড়পর্দার স্বপ্ন আর নিজের মেধাকে অনেক বেশি শাণিত করার লক্ষ্যে ‘নতুন মুখ’রা নতুন আশার সঞ্চার করছে। প্রত্যাশা আর স্বম্ভাবনার জোয়ারে তারুণ্যের এই স্রোত হারিয়ে যাবে না হয়তো। লেখক :চলচ্চিত্র ও নাট্যনির্মাতা