টি ভি মি ডি য়া

ছোটপর্দার পথপরিক্রমা

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৩২
নতুন প্রজন্মের টেলিভিশন-দর্শকদের কাছে বিনোদনের অনিবার্য খোরাক হচ্ছে নাটক। একসময় দেখা যেত বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) চাকরিরত প্রযোজকেরাই নাটক নির্মাণ করছেন। নব্বইয়ের দশকে বেসরকারি পর্যায়ে নির্মিত বিটিভির প্যাকেজ নাটক এবং স্যাটেলাইট টিভি স্টেশন শুরু হওয়ার পর থেকে টেলিভিশন নাটকে খুলে গেল সম্ভাবনার দুয়ার। নতুন অভিনয়শিল্পীদের আগমন ঘটল; প্রোডাকশন হাউস তৈরি হলো। একরকম জোয়ার বইতে লাগল নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে। টিভি নাটকের এই জোয়ারের পেছনে সমুজ্জ্বল হয়ে থাকল এক সোনালি অধ্যায়। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্ম ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ডিআইটি ভবনের ছোট্ট পরিসরের একটি কামরায় টেলিভিশন সমপ্রচারের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা হয়েছিল। তিন মাস পরীক্ষামূলক টিভি প্রচার করার পর ১৯৬৫ সালের ২৫ মার্চ ‘পাইলট টেলিভিশন, ঢাকা’ নাম পরিবর্তন করে ‘পাকিস্তান টেলিভিশন সার্ভিস, ঢাকা’ করা হয়। অনেক পালাবদলের পর ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ টেলিভিশন নামকরণ হয়। কালক্রমে বাংলাদেশের সংস্কৃতিচর্চার এক প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয় এই টেলিভিশন। বাংলাদেশ টেলিভিশনকে ঘিরে এ দেশের মানুষের সাংস্কৃতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চেতনার গতিধারা শব্দে-দৃশ্যে ধারণের সুযোগ পেয়েছে বেশি। এ দেশের মানুষের কাছে তাই টেলিভিশন এবং বিটিভি সমার্থক শব্দ। বাংলাদেশ টেলিভিশনকে ঘিরেই এ দেশের টিভি নাটকের ইতিহাস। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে নাটকে সংযুক্ত হয়েছে বৈচিত্র্য। এ দেশের টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে মুনীর চৌধুরীর ‘একতলা দোতলা’র কথা না বললেই নয়। মাত্র ৩০ মিনিটের এ নাটকটির টানা এক মাস ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহড়া হয়েছিল। এবং অত্যন্ত সফলভাবে ডিআইটি স্টুডিও থেকে সরাসরি সমপ্রচারিতও হয়েছিল। টিভি সমপ্রচার শুরু হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই দেখা গেল, নাটক বেশি দর্শকপ্রিয়তা লাভ করছে। সেই সময় সফলভাবে প্রচারিত হওয়া নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—‘ত্রিরত্ন’, ‘ঘরোয়া’, ‘আমাদের মাসুম’, ‘নতুন বাড়ি’, ‘দম্পতি’, ‘সত্যই সেলুকাস’, ‘অভ্যুদ্বয়’, ‘নাইটগার্ড’, ‘সামনের মাসে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘কতগুলো মৃত্যু’, ‘বিষুবরেখা’, ‘যখন চেতনা’, ‘পিনিস’, ‘কুশল সংবাদ’, ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ প্রভৃতি। আশির দশকে প্রচারিত লেখক-নাট্যকারদের রচিত নাটকের দীর্ঘ তালিকা থেকে অন্তত কিছু নাটকের নাম অবশ্যই উল্লেখের দাবি রাখে। সৈয়দ শামসুল হকের ‘কবি’, সেলিম আল দীনের ‘দেবদূত’, ‘একদিন একরাত্রি’, আমজাদ হোসেনের ‘অস্থির পাখিরা’, মামুনুর রশীদের ‘এখানে নোঙর’, মমতাজউদ্দিন আহমদের ‘হরিণ চিতা চিল’, সেলিনা হোসেনের ‘চাঁদবেনে’, হুমায়ূন আহমেদের ‘প্রথম প্রহর’ প্রভৃতি। এসব নাটকে একদিকে যেমন এ দেশের জনমানুষের জীবন ও জীবিকা, পেশা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করার প্রচেষ্টা রয়েছে, তেমনি মানব-মানবীর প্রেম ও মনোজগতের বহুমুখী সমস্যা ও সংকটের গতিপ্রকৃতি নিয়েও নির্মিত হয়েছে স্মরণযোগ্য নাটক। দেশি-বিদেশি গল্প এবং উপন্যাস অবলম্বনে রচিত নাটক ও বিদেশি নাটকের বাংলা রূপান্তরও আশির দশকের প্রথমার্ধে টেলিভিশন নাটকের সমৃদ্ধ অতীত নির্মাণে অবদান রেখেছে। সাপ্তাহিক নাটকের জনপ্রিয়তা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি একসময় টিভি সিরিয়ালের যুগ এসে পড়ে। টিভি সিরিয়াল রচনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নেন বেগম মমতাজ হোসেন। তাঁর ‘সকাল সন্ধ্যা’ তুমুল জনপ্রিয়তা নিয়ে চার বছর প্রচারিত হয়। এ ছাড়া ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘পূর্ব রাত্রি পূর্ব দিন’, ‘সংশপ্তক’, ‘জোনাকী জ্বলে’, ‘বহুব্রীহি’, ‘কোথাও কেউ নেই’ প্রভৃতি দর্শকদের বিপুলভাবে নাড়া দেয়। নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশন মিডিয়ায় ঘটে যায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আকাশ-সংস্কৃতির মুক্তহাওয়া ছুঁয়ে যায় বাংলাদেশকে। ১৯৯৭ সালে আত্মপ্রকাশ করে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলা। ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে আত্মপ্রকাশ করে চ্যানেল আই। স্বাভাবিকভাবে দেশে টিভি মিডিয়ার পরিধি বেড়ে যায়। এটিএন বাংলা ও চ্যানেল আইয়ে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে ৩০ মিনিট ব্যাপ্তির ধারাবাহিক নাটকের সম্প্রচার শুরু হয়। ২০০০ সালের ১ অক্টোবর চ্যানেল আইয়ে শুরু হয় প্রথম ডেইলি সোপ ‘জোয়ার ভাটা’। এটি রচনা ও পরিচালনা করেন আবদুল্লাহ আল মামুন। ২০০১ সালের ২ মে একুশে টিভিতে প্রথম মেগাসিরিয়াল প্রচার শুরু হয়; নাটকের নাম ‘বন্ধন’; পরিচালনায় আফসানা মিমি। বহুমাত্রিক বিবেচনায় ৪১ বছরের পথপরিক্রমায় বাংলাদেশের টিভি নাটক শক্তিশালী টিভি মাধ্যমই শুধু নয়; বরং এই প্রজন্মের পথ চলার সাহসী অংশীদার। আমাদের প্রত্যাশা—বাংলা টিভি নাটক নতুন প্রজন্মের হাত ধরে এগিয়ে যাবে। লেখক :অভিনেত্রী