বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৩৪
মাতৃভাষার নামেই একটা দেশ—সে আমাদের বাংলাদেশ। আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ। এই দেশ এখন স্বাধীন। আমরা নয় মাসের যুদ্ধশেষে মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলাম। আর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রথম বিজয় ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়। কালক্রমে আমরা বহু মাইলফলক অর্জন করেছি ঠিকই, কিন্তু তা মুক্তিযুদ্ধে বিজয়কে কখনও ছাপিয়ে যায়নি। আর নিঃসন্দেহে জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় গৌরবের বিষয়। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধোত্তর প্রজন্মের কাছে এটা একটা আফসোস যে, অন্তত আমার কাছে, আমরা মুক্তিযুদ্ধটা দেখিনি। সম্মুখসমরে থেকে অর্জিত বিজয়ের স্বাদই আলাদা, সেই বিজয়ের প্রতি আলাদা একটা মমত্ব থাকে। আমাদের আফসোস যে, সেই স্বাদ আমরা পাইনি। তবে দেশের প্রতি আমাদের মমত্ব কোনো অংশেই কম নয়, তার বহু প্রমাণ এই মুক্তিযুদ্ধোত্তর প্রজন্ম কিন্তু বারবারই দিয়ে চলেছে। স্বাধীনতাত্তোর দেশটি কিন্তু আমাদের কাছে একটা বাগান সাজানোর মতো। সেখানে বিভিন্ন ফুলের গাছ সৃজনের দায়িত্বটা আমাদেরই। সেই বাগানে নানা ফুলের আগমন আমাদের উত্ফুল্ল করে। বহু ফুলের প্রস্ফূটনে আমরা আনন্দিত হই। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৪১ বছরে মুক্তিযুদ্ধোত্তর প্রজন্ম বর্হিবিশ্বে নানা অর্জনের মধ্য দিয়ে এই দেশটিকে বিশ্বের কাছে চিনিয়েছে। তার মধ্যে মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জন করাটাই অনেকের কাছে বিস্ময়। এর পর জাতি হিসেবে আমরা অনেক পরিণত হয়েছি। তার প্রমাণ আমরা দিয়ে চলেছি বহির্বিশ্বে নানা জায়গায় নানা আন্তর্জাতিক অর্জনের মধ্য দিয়ে। এখানে কিছু বিষয় প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসে। সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় ১৯৭৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করার মাধ্যমে বিশ্বের বুকে আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রকে তুলে ধরেন। এটা ছিল আমাদের জন্য স্বাধীনতাপরবর্তী এক অনন্য বিজয়। এই বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে আব্দুস সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ আরও অনেকে প্রাণ দিয়েছেন। বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে গিয়ে বাঙালিরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তা ইউনেস্কোর নজরে আনার জন্য কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড’ প্রচেষ্টা শুরু করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তত্কালীন সরকার সেটাকে বিশেষ গুরুত্বসহকারে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছিল। এর ফলে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ওই সংগঠনের প্রচেষ্টা সফল হয়। ওই দিন ইউনেস্কোর ৩০তম অধিবেশনে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি জানানোর প্রস্তাব উত্থাপন করে এবং অপর ২৫টি দেশের সদস্যরা সেটিকে অনুমোদন করে। এর পর থেকে সারা বিশ্বে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয়ে আসছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। ইউনেস্কোর পর জাতিসংঘও ২০০৮ সালের ৫ ডিসেম্বর সাধারণ অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি সম্মান দেখায়। তবে বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের দাবি বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশনে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার জন্য সদস্য দেশগুলোর সমর্থন চেয়েছেন। আর যদি জাতিসংঘ এই দাবি মেনেই নেয়, তাহলে বাংলা হবে সংস্থাটির সপ্তম দাপ্তরিক ভাষা। আর তা হলে এটা হবে বাংলাদেশের জন্য একটা নতুন মাইলফলক। শান্তিতে-সংগ্রামে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা বাহিনী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবদান রেখে চলেছে। যাতে বহির্বিশ্বে উজ্জ্বল হয়েছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি। শান্তির কাজে বিভিন্ন দেশে বিশ্বের সর্বোচ্চসংখ্যক সেনা দেওয়ার কৃতিত্ব এখন বাংলাদেশের। সিয়েরা লিওনে শান্তির স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। দেশটিতে রাস্তাঘাটের নামকরণ করা হয়েছে বাংলাদেশের নামে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাস, সংঘাত ও দাঙ্গা দমন করে শান্তি স্থাপন তথা সেসব দেশ পুনর্গঠনে এ দেশের শান্তিসেনারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা বাহিনী উপসাগরীয় এলাকা, বেনিন, নামিবিয়া, কম্বোডিয়া, সোমালিয়া, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, মোজাম্বিক, প্রাক্তন যুগোশ্লাভিয়া, লাইবেরিয়া, হাইতি, তাজাখস্তান, পশ্চিম সাহারা, কসোভো, জর্জিয়া, পূর্ব তিমুর, কঙ্গো, আইভরি কোস্ট ও ইথিওপিয়ায় শান্তিরক্ষা কাজে অংশগ্রহণ করেছে। এ সবই স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে বহির্বিশ্বে আমাদের অন্যতম বিশেষ অর্জন। মেধা-মননেও যে বাঙালি পিছিয়ে নেই, তার প্রমাণ কিন্তু এখন সর্বজনবিদিত। ষাটের দশকে বাংলাদেশে সাহিত্য আন্দোলনের অগ্রনায়ক বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ২০০৪ সালে পান এশিয়ার নোবেলখ্যাত র্যামন ম্যাগসেসাই পুরস্কার। এরপর প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ২০০৫ সালে সাংবাদিকতায় র্যামন ম্যাগসেসাই পুরস্কার লাভ করেন। আর ২০১২ সালে পরিবেশ সুরক্ষার আন্দোলনে অবদানের জন্য বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও ম্যাগসেসাই পুরস্কার লাভ করেন। এরপরই আসতে হয় নোবেল পুরস্কারে। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. ইউনূস ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটানোর অবদানস্বরূপ ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এই প্রাপ্তিতে বাংলাদেশের স্থান বিশ্বের বুকে আরও শক্তভাবে জুড়ে গেছে। বিদেশে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন বাংলাদেশে মূকাভিনয়ের জনক পার্থপ্রতিম মজুমদার। ইতিমধ্যেই তিনি বিশ্বের অনেক নামী-দামি মঞ্চে অভিনয় করেছেন। তাঁর করা শো-এর সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। কিছুদিন আগে তাঁর অভিনিত ভারতীয় গিনিপিগ নাটকটি মলিয়র অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছে। এখানে তাঁর মাধ্যমে বাংলাদেশের নামটিও উঠে এসেছে। এভাবেই তিনি বাংলাদেশের পতাকা বিদেশে বহন করে চলেছেন। ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর দারিদ্র্য বিমোচন ও দরিদ্রের ক্ষমতায়নে অবদানের জন্য প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত হন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপার্সন ফজলে হাসান আবেদ। ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথ নববর্ষের সম্মাননা তালিকায় নাইট হিসেবে বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনের এ পথিকৃেক সম্মানিত করার ঘোষণা দেন। ক্রীড়াঙ্গনেও আমরা পিছিয়ে নেই। শ্যুটিংয়ে কমলওয়েলথ গেমসে প্রথম সফলতা আসে অকল্যান্ডে ১৪তম আসরে। সেবার আব্দুস সাত্তার নিনি ও আতিকুর রহমান জুটি ১০ মিটার এয়ার পিস্তল দলীয় ইভেন্টে স্বর্ণপদক জিতেছিলেন। এরপর কমনওয়েলথ গেমসে ১৯৯৭ সালে মহিলা বিভাগের ৫০ মিটার রাইফেল প্রোনে ইভেন্টে স্বর্ণ পেয়েছিলেন সাবরিনা সুলতানা। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ইভেন্টে আসিফ হোসেন খান স্বর্ণপদক জয় করেছিলেন। তিনি সাফ শ্যুটিংয়েও স্বর্ণ জয় করেন। ২০১০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের দিল্লিতে কমনওয়েলথ শ্যুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক জয় করেন বাংলাদেশ দলের কৃতী শ্যুটার শারমিন আক্তার রত্না ও সাদিয়া সুলতানা জুটি। সাকিব আল হাসান বিভিন্ন সময়ে টেস্ট এবং ওয়ানডে ক্রিকেটে বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার নির্বাচিত হয়ে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল করেছেন। ক্রিকেটে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তামিম ইকবালকে ক্রিকেট বাইবেল বলে খ্যাত উইজডেন ক্রিকেট ম্যাগাজিন ২০১০ সালের টেস্ট ক্রিকেটের ‘বেস্ট প্লেয়ার’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। আমরা এভারেস্টেও বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছি। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আমি ২০১০ সালের ২৩ মে বাংলাদেশ সময় ৫টা ১৬ মিনিটে এভারেস্ট-চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা ওড়ালে বাংলাদেশ বিশ্বের ৬৭তম এভারেস্টজয়ী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর এম এ মুহিত দুবার এভারেস্ট জয় করেন ২০১১ ও ২০১২ সালে। আর নিশাত মজুমদার ২০১২ সালের ১৯ মে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন। তাঁর ঠিক এক সপ্তাহ পর এভারেস্ট-চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা ওড়ান ওয়াসফিয়া নাজরিন। আরেকটি আন্তর্জাতিক সাফল্য আমরা অর্জন করেছি জিনবিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে। তিনি পাটের জিন আবিষ্কারের পর ছত্রাকেরও জিন আবিষ্কার করে জ্ঞানবিজ্ঞানেও যে আমরা পিছিয়ে নেই, সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন প্রকৌশলী সালমান খান উন্মুক্ত অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘খান অ্যাকাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন। নিজ বাসার ছোট অফিস থেকে যাত্রা শুরু করে তিনি গণিত ও বিজ্ঞানের ওপর তিন হাজারের বেশি ভিডিও তৈরি করেছেন। ২০১২ সালে মার্কিন পত্রিকা টাইম-এর জরিপে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির বার্ষিক তালিকার একটি উল্লেখযোগ্য নাম খান অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সালমান আমিন খান। তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসও তাঁকে সম্মানিত করেন। সুমাইয়া কাজী এবং সালমান খান তাঁদের কাজের অংশ হিসেবে বিশ্বের ৫০ প্রভাবশালীর তালিকাভুক্ত হয়েছেন। ওয়েবসাইট জগতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ৫০ উদ্যোক্তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে সংবাদসংস্থা রয়টার্স ও ক্লাউট। সেই তালিকার ১৬ নম্বরে স্থান পেয়েছেন সুমাইয়া কাজী। আর সালমান খানের ক্রমিকও ১৬। আটলান্টিকের দুই পারের দুটি খ্যাতিমান সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত এই তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ানদের মধ্যে আর কেউ নেই। কয়েক মাস আগে বিশ্বের ১০০ উদ্যমী মানুষের একজন হিসেবে বাংলাদেশি আমেরিকান ড. রায়ান সাদীর নাম উঠে এসেছিল। এভাবেই বিশ্বের বুকে বাংলাদেশিরা লাল-সবুজ পতাকা দিন দিন সমুজ্জ্বল এবং সবার ওপরে তুলে ধরছেন। জয় হোক বাংলাদেশের। লেখক :পর্বতারোহী