শিশুদের কম্পিউটার বা মোবাইল গেম খেলার নেশা নিয়ে আতঙ্কিত শহুরে মা-বাবা। তারা জানেন, এটা শিশুর জন্য ভালো নয়। কিন্তু শিশুদের সেল ফোনে বা কম্পিউটারে গেম খেলার বাইরে অন্য কোনোকিছুর সঙ্গে যুক্ত করবার সময় কিংবা সুযোগই বা কোথায় তাদের! শহুরে ঘরকুনো মুখ লুকানো বদ্ধ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়া শিশুদের ‘বন্দি’ ও ‘ভিডিও গেম’ নির্ভর জীবনের জন্য দায়ী কে? নিঃসন্দেহেই বলা যায় মা-বাবা এবং স্কুল কর্তৃপক্ষ। মা-বাবার অতি ‘ক্যারিয়ার সচেতনতা’ এবং ব্যস্ততার কারণেই আমাদের চোখের সামনেই প্রিয় সন্তানেরা অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে।
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহুরে জীবনে শিশুদের বিনোদনের ভীষণ অভাব। স্কুলে-কিংবা নিজের পাড়ায় খেলার মাঠ নেই। আর অভিভাবকদের বুঝতে হবে তার সন্তানের বিকাশ যদি স্বাভাবিক না হয়, সে যদি অসুস্থ কিংবা অস্বাভাবিক জীবনের দিকে চলে যায় তবে একটা সময়ে গিয়ে তাদের ক্যারিয়ার, টাকা বা স্বপ্নের ফ্ল্যাট সবকিছুই অর্থহীন হয়ে যাবে। তাই শিশুর সুস্থ বিকাশে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বজুড়েই যন্ত্রপাতির প্রতি মানুষের একটা বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। কারো কারো কাছে এসব ব্যবহার করতে পারাও স্মার্টনেসের পরিচয়। শিশুরা বড়দের কাছ থেকে এসব মানসিকতা গ্রহণ করছে। তাই তারা মাঠে গিয়ে খেলাধুলার পরিবর্তে কম্পিউটার-মোবাইল ফোনের ছোট স্ক্রিনেই বেশি সময় কাটাচ্ছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এতে করে শিশুরা সাময়িক স্বস্তি খুঁজে পেলেও এটা তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে।
ব্রিটেনের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু দুই ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় টিভি দেখে বা কম্পিউটারে খেলাধুলা করে তাদের চেয়ে যেসব শিশু এত সময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকে না তারা বেশি নম্বর পেয়েছে। এর অর্থ ঐসব ‘ডিজিটাল রোগে’ আক্রান্ত শিশুরা মনস্তাত্বিক সমস্যায় ভুগছে।
নগর-বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরের আয়তন ও এলাকার বিন্যাস অনুযায়ী অন্তত ৯২টি পার্ক থাকার কথা। রাজউক এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের খাতাপত্রের হিসাবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারি সম্পত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত পার্কের সংখ্যা ৫৪। আর বাস্তবে অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে বড়জোর ১৫টির। একইভাবে ১৯টি খেলার মাঠের মধ্যে ১১টিই অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে। বাকি যে ৮টি কোনোমতে টিকে আছে সেগুলোও রয়েছে বেদখল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে।
অন্যদিকে, রাজধানীর ৯৫ শতাংশ স্কুলে মাঠ নেই। অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে স্কুল। এসব স্কুলে মাঠ তো দূরের কথা, ক্লাস রুমই নেই প্রয়োজন অনুযায়ী। পরীক্ষায় ভালো ফল করা দামি স্কুলগুলোর অবস্থাও একইরকম। সেখানে শুধু লেখাপড়াই হয়, অন্যকিছু না। অথচ স্কুল কোনো খণ্ডিত শিক্ষার স্থান নয়, সার্বিক শিক্ষার জায়গা। জীবনে দক্ষতা ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা গড়ে ওঠে স্কুল থেকে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সাহিত্যিক ড. মোহিত কামাল বলেন, শিশুকে প্রচুর খেলাধুলার সুযোগ দিতে হবে। খেলার মাধ্যমে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাড়ে। এটাই তাদের নতুন কিছু জানার জগতে প্রবেশের সবচে বড় মাধ্যম। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, পৃথিবীর সব শহরেই এই সমস্যা রয়েছে। শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এ সংকট কমে আসবে। আর পরিবারের সদস্যদের সচেতন হতে হবে সবচেয়ে আগে।
