নদী-নালা-খাল-বিলের দেশ বাংলাদেশ। পলি বিধৌত অসংখ্য নদীর ভারে এ জনপদ প্রতিটি ক্ষেত্রেই উর্বর। আর এই উর্বরতাকে কাজে লাগিয়েছে দেশের মাছ চাষিরা। মাছ চাষ বাংলাদেশে কবে শুরু হয়েছিল তা সঠিক দিনক্ষণ হয়ত দিতে পারব না; তবে ৮০ দশকে মুষ্টিমেয় কয়েকজন চাষির শুরু হওয়া মাছ চাষের মিছিল এখন এক বিরাট বিপ্লবে পরিণত হয়েছে। যদিও সরকারি পর্যায়ে ৮০ দশকের গোড়ার দিকে হ্যাচারিতে রেনু উত্পাদন শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়টা ছিল অনেকটা অন্ধকার যুগের মত। যেমন হ্যাচারিতে উত্পাদিত পোনা বড় হয় না এমন ধারণা অনেকেই পোষণ করত। আর সব চেয়ে বেশি অন্তরায় ছিল সামাজিক অবস্থান। কেউ মাছ চাষ করলে তাকে বাঁকা চোখে দেখা হত। ৮৯ সালে আমিও মাছ চাষ শুরু করেছিলাম। কত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা-প্রতিবন্ধকতা মুখ বুজে মেনে নিতে হয়েছে আমাকে। অনেকে মনে করত মাছ চাষ হল জেলে সমপ্রদায়ের কাজ। সে সময় নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেই শুরু হয়েছিল বাণিজ্যিক মাছ চাষ। প্রথমে রুই জাতীয় মাছের চাষ দিয়ে শুরু হয়। একে ঠিক মাছ চাষ বলা যাবে না। নদী থেকে রেনু বা পোনা পাইকাররা বাড়ি বাড়ি নিয়ে আসত আর কৃষকরা সে পোনা কিনে তাদের বাড়ির পৈত্রিক পুকুরে ছেড়ে দিত। চাষ বলতে এটাই অর্থাত্ বাড়ির পুকুরে মাছ ছাড়া হত আর বছর শেষে খেয়ে দেয়ে যা থাকত তাই বিক্রি করা হত। ৮০ দশকের মাঝামাঝিতে যশোরের মহসীন মাস্টারের হ্যাচারি দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে রেনু উত্পাদনের যাত্রা শুরু হয়। ওই দশকের শেষ দিকে ময়মনসিংহে ৩ টি হ্যাচারি গড়ে ওঠে। এর পরেই শুরু হয় মাছ চাষে বিপ্লব। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ মাত্স্য গবেষণা ইন্সটিটিউট, ময়মনসিংহ এবং ময়মনসিংহ সরকারি মত্স্য অধিদপ্তর এর ত্রিমাত্রিক
সহযোগিতায় এক বিশাল বিপ্লবের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। এই ৩ টি ইন্সটিটিউট ছাড়াও ডেনমার্কের সাহায্যপুষ্ট ডানিডা ও সরকারি মত্স্য অধিদপ্তর যৌথভাবে পরিচালিত “মত্স্য চাষ সমপ্রসারণ প্রকল্প” যা পরবর্তীতে “ময়মনসিংহ মত্স্য চাষ সমপ্রসারণ প্রকল্প” নামে পরিচালিত হয়। বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পটি এক বিরাট ভূমিকা পালন করে। প্রকল্পটি প্রথমে ময়মনসিংহের ৬ টি উপজেলায় এবং পরে সব কটি উপজেলায় সমপ্রসারণ করে। প্রদর্শনী পুকুরে মাছ ছেড়ে হাতে তৈরি করা খাবার বানিয়ে মাছ চাষের যাত্রা শুরু করে। পুকুরে মাছ ছেড়ে তাতে খাবার দিয়ে মাছ বড় করে বাজারে
বিক্রি করে যে লাভ করা যায় এর ধারণা সৃষ্টি করে। এর সুফল পরবর্তীতে ময়মনসিংহের সব এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। যার কারণে মাছের পোনার ব্যাপক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রাতারাতি অনেক হ্যাচারি গড়ে ওঠে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন নতুন প্রজাতির মাছের উদ্ভাবনের পাশাপাশি বেসরকারি হ্যাচারিগুলোতেও চলে গবেষণামূলক উত্পাদনের কাজ। রুই জাতীয় মাছ চাষের পাশাপাশি আসে অন্যান্য মাছের চাষ। এর ধারাবাহিকতায় বাণিজ্যিকভাবে পাঙ্গাস উত্পাদনে এগিয়ে আসে অনেক বেসরকারি খামার। এটা ৯০ সালের মাঝামাঝি সময়ের কথা। পাঙ্গাস অন্যান্য মাছের চেয়ে অনেক বেশি উত্পাদন হয় বলে এর চাষ রাতারাতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। রুই জাতীয় মাছ যেখানে শতাংশপ্রতি ১৮ কেজির বেশি উত্পাদন হয় না সেখানে পাঙ্গাস শতাংশপ্রতি উত্পাদন হয় ১০০ কেজি এবং বর্তমানে তা উন্নীত হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ কেজিতে।
প্রথম দিকে পাঙ্গাসের পোনা ফেনী থেকে বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদন হলেও পরবর্তীতে ময়মনসিংহ ও বগুড়ায় শুরু হয়। তারপর কুমিল্লাসহ সারা দেশে। তবে বর্তমানে ময়মনসিংহে চাষের প্রায় ৪০ ভাগ পাঙ্গাস উত্পাদন হচ্ছে।
৯০ দশকের শেষ দিকে শুরু হয় প্রায় বিলুপ্ত প্রজাতি মাছ চাষ। দেশি মাগুর, শিং, পাবদা চাষে এগিয়ে আসে বেসরকারি খামার। আর এরও চাষ শুরু হয় ময়মনসিংহ থেকেই। কক্সবাজারের ২ টি হ্যাচারিতে তেলাপিয়ার মনোসেক্স পোনা উত্পাদন শুরু হয়েছিল ২০০০ সালের কিছু আগে থেকে। তারপর আসে থাই কৈ এবং এটিও উত্পাদনে এগিয়ে আসে ময়মনসিংহের বেসরকারি হ্যাচারিগুলো। এভাবেই সার দেশে ছড়িয়ে পড়েছে মাছ চাষ। বর্তমানে সরকারি হিসাব মতে ২০০১-০২ বছরে চাষে উত্পাদিত মাছের পরিমাণ ছিল ৭,৮৬,৬০৪ মেট্রিক টন। আর ২০১০-১১ অর্থবছরে উত্পাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১৪,৬০,৭৬৯ মেট্রিক টন। আভ্যন্তরীন উত্পাদন ১০ লাখ টনের বেশি। মেরিন, আভ্যন্তরীন এবং চাষ এই ৩ টি মিলিয়ে দেশে মোট উত্পাদন হচ্ছে প্রায় ৩১ লক্ষ টনের কাছাকাছি আর দেশের চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৩৩ লক্ষ টনের মত।
এত সাফল্যের পরও বর্তমানে মাছ চাষের ক্রান্তিকাল চলছে। অতিরিক্ত খাদ্য মূল্যের কারণে উত্পাদন খরচ আর বিক্রয় মূল্যের পার্থক্য বাড়ছে দিন দিন। লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে প্রতিনিয়ত মাছ চাষিদের। এভাবে বেশি দিন চললে এ খাতে ধস নামতে বাধ্য। সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে সহযোগিতা করে খাতটিকে বাঁচিয়ে রাখবেন এটাই বিজয়ের মাসের সব মাছ চাষিদের প্রত্যাশা।
