বিজয়ের মাস:বিশেষ কলাম

একচল্লিশ বছরের কৃষি শিক্ষা

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০৫
দেশের প্রায় একল্লিশ বছরের কৃষি অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে; তার আগের পঞ্চাশ বছরের কৃষি স্মরণ করে এবং আগামী ২০ বছরের কৃষির চাহিদা মাথায় রেখে প্রণীত কয়েকটি সুপারিশের আলোকে লেখাটা শুরু করতে চাই। সুপারিশ হল- এক, অনতিবিলম্বে কৃষকের তথ্য চাহিদার ভিত্তিতে কৃষককে সংজ্ঞায়িত করে নিবিড়ভাবে ব্যবহারিক কৃষক প্রশিক্ষণ চালু করা। দুই, বাংলাদেশের কৃষি পরিসংখ্যান পরিশুদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত উপজেলা ভিত্তিতে কৃষকের অংশগ্রহণ নির্ণিত কৃষিপণ্য বহিরাগমন বা আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা। এর কোনোরূপ বিকল্প দেশের ও কৃষকের উপকারে আসবে না। বলতে হয় বাংলাদেশের কৃষির পরিবর্তন সূচিত হয়েছে আজ থেকে প্রায় ৯০ বছর আগে আগারগাঁওতে ঢাকা ফার্ম ও ল্যাবরেটরি স্থাপন ৭০ এবং ৫০ বছর আগে কৃষি কলেজ ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তারপর ৬০-এর দশকে শুরু হয় সবুজ বিপ্লব আন্দোলন এবং ৭০ দশকে নিবিড় ধান উত্পাদন প্রকল্প। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পর জাতির জনকের ঐকান্তিক ইচ্ছায় কৃষির যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল তা সত্যিই কৃষকের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম দরদ প্রকাশ করে। যেমন- ইউনিয়ন কৃষি সহকারীকে ত্রাণ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব প্রদান, জাপানি অর্থায়নে আধুনিক কেন্দ্রীয় সম্প্রসারণ, সম্পদ কেন্দ্র স্থাপন, দূরসহ আন্তঃজেলা কৃষিপণ্য পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করা, কৃষিবিদগণকে প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড পদমর্যাদা দান, কৃষি সমবায় গঠন, হার্টিকালচার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠন, স্কুল-কলেজে কৃষি শিক্ষা জোড়দারকরণ ইত্যাদি। কিন্তু ৭৫-এর ক্ষমতা পরিবর্তনের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত ৩৮ বছরে কৃষির পরিবর্তন ধারাকে কৃষি ও কৃষকের অনুকূলে রাখার বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে খুবই কম। এর একটি প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল কৃষি প্রশাসনের ধারণা ও দূরদৃষ্টির সংকীর্ণতা। যেমন- খাদ্যের সংজ্ঞা ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ব্যাপারে অনুচিত প্রচার। দেশে নিবিড় ধান উত্পাদন কার্যক্রমে ধানের উত্পাদন বাড়তে থাকল বটে, তবে এই ধান উত্পাদন করতে দেশের পাট, তুলা, ইক্ষু, ডাল, তেল, মাছ, সবজি, ফল, মসলা ইত্যাদির সকল জমি গ্রাস করা হল। তাতে ১০০ টাকার ধান উত্পাদন করে ৩০০ টাকার ডাল-তেল-মসলা-তুলা আমদানির ব্যবস্থা করে নিল ব্যবসায়ীরা। বিষয়টি প্রতিভাত হওয়ার পর দেশে ৯১-এর সরকার কর্তৃক সিডিপি বা ক্রপ ডাইভারসিফিকেশন প্রোগ্রাম নেয়া হল, এসব আধুনিক প্রযুক্তি সহজে প্রচারের জন্য স্কুল কলেজের সর্বস্তরে ৬ টি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে বাধ্যতামূলক কৃষি শিক্ষা চালু করা হল, কৃষি শিক্ষক তৈরির জন্য ডিপ্লোমা ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক কর্মসূচি নেয়া হল কিন্তু ৯৬-এর সরকার এসে এর অধিকাংশই বাতিল করে দিল। পরিবর্তে চালু হল কৃষক নিবন্ধন ও ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে কৃষি ভর্তুকি সহায়তা দানের কার্যক্রম। একটি বাড়ি একটি খামার প্রোগ্রাম যা হয়ত গুরুত্বের বিবেচনায় কোনো অংশেই কম ছিল না। তবে একটু সমস্যা ছিল তা হল কৃষককে সংজ্ঞায়িত করা হল না, একটি বাড়ি একটি খামার অন্য মন্ত্রণালয়কে দেয়া হল। তাই ফলাফল আশাব্যঞ্জক হল না। যা হোক, সংক্ষেপে বলতে গেলে এর পরবর্তী সরকারসমূহ বেশি ব্যবসাবান্ধব হওয়ায় কৃষির ক্ষেত্রে বাজেট ও কার্যক্রমে কোনোরূপ স্থায়ীত্বশীল পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা যায়নি। খাদ্য উত্পাদন বা চাল উত্পাদনের কৃষি পরিসংখ্যানের খেলায় কৃষক ও কৃষি হেরে গেছে। এখন কৃষি থেকে ফেরত্ যাওয়ার পালা। বিগত দশ বছরে সরকারি যাচিত পরিসংখ্যান মতে, কৃষি উত্পাদন ও কৃষি জমি ক্রমাহ্রাসমান। তবে বলতে হয় দেশে ৮ থেকে দশ টি টিভি চ্যানেল দেশের কৃষি ও কৃষককে সজীব রাখার চেষ্টা করছে। বর্তমান কৃষকরা ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সী, তারা আধুনিক কৃষি জানতে ও বুঝতে চায়। কিন্তু নিয়মিত দেশীয় অর্থায়নে কৃষক প্রশিক্ষণের সুযোগ দেশে নেই। প্রশিক্ষণের একটি সংজ্ঞা আছে, রকম-ফের আছে। খামার বাড়ির প্রশিক্ষণ পরিদপ্তরের নিজস্ব মডিউল ভিত্তিক কোনো কৃষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেই। তাই আমি অনতিবিলম্বে প্রকৃত কৃষককে নিয়মমত প্রশিক্ষণ দিয়ে (প্রয়োজনে টিভি চ্যানেলগুলোর অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতা নিয়ে) জনশক্তিতে রূপান্তরের সুপারিশ করছি। তিন, জাতীয় পরিসংখ্যানকে উচ্চ পর্যায়ের জাতীয় ব্যক্তিরা বলেন, রাবিশ বা এসব ‘মিথ্যাচার’। তাই কৃষকের অংশগ্রহণে উপজেলা ভিত্তিতে পরিসংখ্যান তৈরি করলে তা সঠিক হবে এবং দেশের পরিকল্পনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এতে কোনো উপজেলায় কৃষি পণ্যের উত্পাদন ও চাহিদা স্পষ্টভাবে জানা যাবে। কৃষক যদি নিজে গোলঘর তৈরি করে ২ থেকে ৩ মাস পণ্য ঘরে রেখে প্রক্রিয়া করে বিক্রি করতে পারে তাহলে পণ্যমূল্য নিয়েও সরকারের পরিকল্পনা করা সহজ হয়ে যাবে। বর্তমানে কৃষকের গোলাঘর নেই। সে মাঠ থেকে পণ্য নিয়ে বাজারে ছুটে, আর গোলাঘর ভর্তি হয় ব্যবসাীদের। আশা করি দেশের কৃষির যে অবস্থা তাতে আগামী ২০ বছর জীবনটা বাঁচাতে হলে এসব সুপারিশ বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। এটাই হোক আমাদের একচল্লিশ বছরের কৃষি শিক্ষা।