বিশ্বজিত্ হত্যায় ‘চাপাতি শাকিল’ গ্রেফতার

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২২
গত নয় ডিসেম্বর বিশ্বজিেক চাপাতি দিয়ে যে ছাত্রলীগ কর্মী কোপায় সেই রফিকুল ইসলাম শাকিল গতকাল শনিবার ভোরে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার দেশান্তরকাঠী গ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয় তাকে। বিকালে তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল বিশ্বজিত্ দাসকে চাপাতি দিয়ে কোপানোর কথা স্বীকার করেছে। তার সাদা শার্ট বিশ্বজিতের রক্তে রঞ্জিত হওয়ার কথাও অকপটে বলেছে ডিবিকে। তিনি জানান, এর আগেও তিনি অনেককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছেন। এ জন্য কোন অনুশোচনা হয় না তার। এদিকে বিশ্বজিত্ হত্যাকান্ডের দৃশ্য বিভিন্ন টেলিভিশনে ও সংবাদপত্রে দেখে শাকিলের বাবা আনছার আলী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। গতকাল ছেলের গ্রেফতারের সংবাদ পেয়ে তিনি হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এদিকে গত শুক্রবার রাতে সিলেট জাফলংয়ের একটি হোটেল থেকে রাশেদুজ্জামান শাওন ও তাকে আশ্রয় দেয়া সাংবাদিক উত্পল দাস এবং ঢাকার উত্তরা একটি বাসা থেকে সাইফুল ইসলামকে গ্রেফতার করেছে ডিবি। এই তিনজনকে নিয়ে গতকাল পর্যন্ত বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতারের সংখ্যা ১০-এ দাঁড়ালো। এ ঘটনায় ডিবি ছয়জন এবং সুত্রাপুর থানা আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে থাকা চারজনকে গ্রেফতার দেখান। বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত শাকিল, নাহিদ, শাওন ও সাইফুলসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শাওন ও সাইফুলকে গতকাল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে। আদালত আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। শাকিলকে নিয়ে গতকাল বিকালে ডিবির একটি টিম পুরান ঢাকায় বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত সেই চাপাতি উদ্ধারে অভিযান চালায়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই নম্বর গেটের উল্টো দিকের ছোটো ছোটো দোকানের পাশে রাখা একটি বাক্স থেকে সন্ধ্যার দিকে ডিবি চাপাতিটি উদ্ধার করে। শাকিল জানান, এই চাপাতি দিয়েই বিশ্বজিেক কোপানো হয়। সাংবাদিক উত্পল দাস আসামি শাওনকে আশ্রয় ও সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগের চেষ্টায় ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখান ডিবির কর্মকর্তারা। গতকাল তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি। বিশ্বজিত্ হত্যা মামলার তদন্তভার গতকাল ডিবির উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। শাকিলকে যেভাবে ডিবি গ্রেফতার করে বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডের পর ডিবির একাধিক টিম শাকিলসহ খুনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী এবং জড়িতদের গ্রেফতারে মাঠে নামে। তাদের ভিডিও ফুটেজ তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করে। ঘাতকরা বার বার অবস্থান পরিবর্তন করে। সর্বশেষ ডিবি নিশ্চিত হয় যে, বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডের প্রধান ঘাতক শাকিল বরগুনা অবস্থান করছে। গত বৃহস্পতিবার ডিবির একটি টিম বরগুনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। আমাদের বেতাগী (বরগুনা) সংবাদদাতা জানান, শনিবার ভোর সাড়ে পাঁচ টায় বাকেরগঞ্জ থানা পুলিশের সহযোগিতায় ডিবি বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি ইউনিয়নের দেশান্তকাঠি গ্রামের সাকিলের খালু কাঞ্চন মীরার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। এ সময়ে পুলিশ শাকিলের খালাতো ভাই রায়হান সিদ্দিকীকে গ্রেফতার করে। ঘটনার দিন শাকিল রাজধানীর সবুজবাগ থানার মেরাদিয়া এলাকায় তার এক বন্ধুর বাসায় অবস্থান করে। সেখান থেকে শাকিল তার খালাতো ভাই রায়হানের চাচা জাকিরের নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লার বাসায় দুই রাত থাকে। গত বুধবার খালাতো ভাই রায়হানদের বরিশাল বাকেরগঞ্জের বাসায় গিয়ে উঠে। বৃহস্পতিবার রায়হানের দাদা বরগুনা বেতাগী উপজেলার দেশান্তরকাঠী গ্রামের বাসিন্দা মীর কাঞ্চন আলীর বাসায় গিয়ে শাকিলসহ উঠে। দায় স্বীকার গ্রেফতারের পর শাকিল জিজ্ঞাসাবাদে ডিবির কর্মকর্তাদের কাছে বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। তিনি বলেন, ‘১৪ থেকে ১৫ জন ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ দৌড়ে টমাস ক্লিনিকে যাই। সেখানে গিয়ে বিশ্বজিেক দেখতে পেয়ে তাওসীনসহ কয়েকজন বলে উঠে এই শালায় বোমা মেরেছে। এরপর যে যেভাবে পারে বিশ্বজিেক কিল ঘুষি, লাথি, রড ও লাঠি দিয়ে পোঠানো হয়। কেউ ছুরি ও চাপাতি দিয়ে কোপায়। বিশ্বজিত্ বাঁচার জন্য নিজের হিন্দু পরিচয় দেয় এবং বিএনপিসহ অন্য কোন রাজনীতি করি না বলে জানায়। সেই কথায় কেউ সাড়া দেয়নি। শাকিলসহ ৭/৮ জনের একটি গ্রুপ স্মরণকালের বর্বরোচিত ও নির্দয়ভাবে বিশ্বজিেক রড, লাঠি, ছুরি ও চাপাতি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। বাঁচার জন্য কতই কাকুতি মিনতি করছে বিশ্বজিত্। ঐ সময় তাওসীন বলে শালাকে শেষ করে দে। শাকিল চাপাতি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে। রাজন পিঠে ছুরিকাঘাত করেছে। কসাইর মত কোপানোর সময় বিশ্বজিতের জন্য কোন অনুসূচনা হয়নি কেন? এ প্রশ্নের জবাবে শাকিল ডিবির কর্মকর্তাদের জানায় যে, অস্ত্র ব্যবহার করতে তার ভাল লাগে না। চাপাতি দিয়ে কোপাতে তার ভালো লাগে। সবসময় তার কাছে চাপাতি থাকতো। চাপাতি শাকিল হিসাবে সে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পরিচিত। গ্রেফতারকৃত এইচএম কিবরিয়া ও কাইয়ুম মিয়া টিপু মারধর করে। গ্রেফতারকৃত সাইফুল ও শাওন এবং পলাতক ওবায়দুল কাদের তাওসীন, ইমদাদুল হক ও নূরে আলম লিমন রড ও লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে প্রহার করেছে। ডিবির কর্মকর্তা গ্রেফতারকৃতদের তথ্য, অনুসন্ধানে ও ভিডিও ফুটেজ নিশ্চিত হয় যে, সরাসরি হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতারকৃত শাকিল, নাহিদ, শাওন ও সাইফুল এবং পলাতক রাজন তালুকদার, ইমদাদুল হক, তাওসীন ও লিমন অংশগ্রহণ করেছে। গ্রেফতারকৃত সকলে ছাত্রলীগ কর্মী বলে তারা জানায়। বিশ্বজিতের ঘাতকরা ছাত্রলীগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি শরীফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম গ্রুপের সদস্য। তাদের কাজ হলো আশপাশের ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা আদায়, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসায়ের লাখ লাখ টাকার ভাগ ঐ সব নেতাদের দেয়া হয়ে থাকে। সাবেক নেতারা ভাগ পায়। শাকিলকে একই বিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কমিটির সাবেক নেতা বাবর বর্তমান নেতাদের হাতে তুলে দিয়ে যায় বলে শাকিল জানায়। শাকিলের পুরা পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার ভাই শফিকুল ইসলাম শাহীন পটুয়াখালী যুব দলের নেতা বলে জানায়। উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি দক্ষিণ) মনিরুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতারকৃত ৬ জনকে ডিবি হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তারা বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে তথ্য দিচ্ছে। এদের মধ্যে ৫ জনের প্রত্যেককে ৮দিন করে রিমান্ডে আনা হয়েছে বলে তিনি জানান।